এডিস মশা আগেভাগে শনাক্ত করবে ঢাবি গবেষকদের তৈরি ‘স্মার্ট ফাঁদ’ © সংগৃহীত
ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা শনাক্তের লক্ষ্যে একটি স্বয়ংক্রিয় ও ইন্টারনেট-সংযুক্ত মশার ফাঁদ তৈরি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) একদল গবেষক। MAST-CloudNet নামের ফাঁদটি শব্দ দিয়ে মশা টেনে আনে এবং ক্যামেরায় তার ছবি তোলে। এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে দ্রুত জানিয়ে দেয়, ধরা পড়া মশাটি এডিস কিনা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের মাইক্রোসিস্টেমস অ্যান্ড ন্যানোইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাব এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মুঈদ রিসার্চ গ্রুপ (জিনোম গাইডেড ভেক্টর কন্ট্রোল অ্যান্ড ইনোভেশন ল্যাব) যৌথভাবে যন্ত্রটি তৈরি করেছে। গবেষণাটি গত ৮ অক্টোবর আন্তর্জাতিক সাময়িকী আইইইই ট্রানজেকশনস অন ইনস্ট্রুমেন্টেশন অ্যান্ড মেজারমেন্টে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণাপত্রটির শিরোনাম ‘MAST-CloudNet: IoT-Enabled Acoustic Trap With Real-Time AI Surveillance of Aedes’। এর লেখকরা হলেন: অধ্যাপক ড. সাইয়েদ মাহমুদ উল্লাহ (ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ), সহযোগী অধ্যাপক ড. খন্দকার আশফাকুল মুঈদ (প্রাণিবিদ্যা বিভাগ), সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীব (ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ), প্রভাষক আতিয়া সানজিদা শর্মী (প্রাণিবিদ্যা বিভাগ), এ এম এম মুনিফ খান (ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ), মো. সিয়াম সরকার (প্রাণিবিদ্যা বিভাগ), নিলয় হাওলাদার (প্রাণিবিদ্যা বিভাগ), ফাহাদ আরেফিন (ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ), আসিফ রহমান দীপ্ত (ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ) এবং আতিক বিন জাকির (ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা তহবিলের অর্থায়নে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।
যন্ত্রটি যেভাবে কাজ করে
ওড়ার সময় স্ত্রী এডিস মশার ডানা থেকে এক ধরনের শব্দ তৈরি হয়। এই শব্দ শুনে পুরুষ এডিস মশা স্ত্রী মশার দিকে ছুটে যায়। ফাঁদটি মশার এই স্বভাবকেই কাজে লাগায়। এটি ৩৫০ থেকে ৫০০ হার্জ কম্পাঙ্কের এমন একটি শব্দ বাজায়, যা শুনতে স্ত্রী এডিস মশার ডানার শব্দের মতো। শব্দে আকৃষ্ট হয়ে পুরুষ এডিস মশা কাছে এলে ফাঁদের ভেতরের একটি ফ্যান সেগুলোকে টেনে নিয়ে হলুদ আঠালো কাগজে আটকে ফেলে।
এরপর ফাঁদের ভেতরে বসানো ক্যামেরা ধরা পড়া মশার ছবি তুলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ক্লাউড সার্ভারে পাঠায়। সেখানে একটি এআই মডেল ছবি দেখে মশার প্রজাতি শনাক্ত করে এবং সংখ্যা গুনে রাখে। ফলাফল সঙ্গে সঙ্গে একটি ওয়েব ড্যাশবোর্ডে দেখা যায়। ফলে ফাঁদের কাছে না গিয়েও দূর থেকে জানা যায়, কোন এলাকায় কতগুলো এডিস মশা ধরা পড়ছে।
গবেষকরা জানান, মানুষকে কামড়ায় স্ত্রী মশা, পুরুষ মশা কামড়ায় না। তবে গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, পুরুষ মশা স্ত্রী মশার আগে পূর্ণবয়স্ক হয় এবং মশার প্রজননস্থলের কাছাকাছি থাকে। তাই কোনো এলাকায় পুরুষ এডিস মশার সংখ্যা বাড়তে থাকলে বোঝা যায়, সেখানে নতুন করে এডিস মশা জন্ম নিচ্ছে। এটি ডেঙ্গুর ঝুঁকির আগাম সংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে।
পরীক্ষায় পাওয়া তথ্য
গবেষণাগারে খাঁচার ভেতরে পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, শব্দযুক্ত ফাঁদটি একই ধরনের শব্দহীন ফাঁদের তুলনায় গড়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি এডিস মশা ধরেছে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে খোলা জায়গায় টানা তিনদিন ফাঁদটি পরীক্ষা করা হয়। ওই সময় ভারী বৃষ্টি, ঝোড়ো বাতাস ও শহুরে কোলাহল থাকলেও যন্ত্রটি বন্ধ হয়নি। এই তিন দিনে ফাঁদে ৪৯টি এডিস মশা ধরা পড়ে।
গবেষকরা জানান, যন্ত্রাংশ মিলিয়ে প্রতিটি ফাঁদ তৈরিতে খরচ পড়ে প্রায় ১২ হাজার টাকা। অথচ মশা জরিপে প্রচলিত সিডিসি লাইট ট্র্যাপের দাম প্রায় ২৫ হাজার টাকা এবং বিজি-সেন্টিনেল ট্র্যাপের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা। একটি কেন্দ্রীয় সার্ভার একসঙ্গে অনেকগুলো ফাঁদের তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে। তাই ফাঁদের সংখ্যা যত বাড়বে, প্রতিটি ফাঁদ চালানোর খরচ তত কমবে। বিদ্যুৎ চলে গেলেও ব্যাটারির সাহায্যে ফাঁদটি প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা চালু থাকতে পারে।
গবেষকদের মতে, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল পাওয়া গেছে। তবে বড় পরিসরে ব্যবহারের আগে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন। এ জন্য ২০২৭ সালের জুন-জুলাই মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি ফাঁদ বসানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কোন এলাকায় এডিস মশা বাড়ছে, তার একটি আগাম মানচিত্র তৈরি করা যাবে।
ভবিষ্যতে ফাঁদটিকে সৌরশক্তিতে চালানোর বিষয়ে গবেষকদের পরিকল্পনা রয়েছে। ওয়াই-ফাই ছাড়াই দূর পর্যন্ত তথ্য পাঠাতে এতে দীর্ঘ-পরিসরের রেডিও তরঙ্গভিত্তিক সংযোগ (LoRaWAN) যুক্ত করা হবে। এছাড়া ফাঁদটিকে রোদ-বৃষ্টি সহনশীল করার কাজও চলছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এডিস মশা শনাক্তের যন্ত্র তৈরির জন্য গবেষক দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কোন কোন এলাকায় ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা বাড়ছে- সেটি জানা গেলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হয়। এডিস মশা শনাক্তকরণ যন্ত্রটি এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। তিনি যন্ত্রটির আরও উন্নয়ন ও কার্যকরভাবে ব্যবহারের উপর গুরুত্বারোপ করেন। উপাচার্য জীবন ঘনিষ্ঠ গবেষণার মাধ্যমে মানুষের জীবন-মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার জন্য গবেষকদের প্রতি আহ্বান জানান।