অভিযুক্ত শিক্ষক তাসনিম সিরাজ মাহবুব © টিডিসি সম্পাদিত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইংরেজি বিভাগের ক্লাসে নেকাব পরে আসায় এক ছাত্রীকে ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ (মৌলবাদী) ও ‘সন্ত্রাসী’ বলে কটাক্ষ করার অভিযোগ উঠেছে বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও শিক্ষক নেটওয়ার্কের নেত্রী তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ওই শিক্ষার্থী বোমা হামলা করতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন ক্লাসে। পরে এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিক ক্লাস বর্জন করেন।
আজ বুধবার (৭ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১৫তম ব্যাচের (২০১৯-২০ সেশন) ক্লাসে এই ঘটনা ঘটে। পরে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি বিভাগীয় চেয়ারম্যানকে জানান। এর প্রেক্ষিতে ওই শিক্ষককে আর ক্লাস করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিভাগটি।
বিভাগের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষক তাসমিন সিরাজ মাহবুব সম্প্রতি ডাকসুর উদ্যোগে চালু হওয়া ডিইউ টিচার্স ইভাল্যুয়েশনে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে ৫ এ পেয়েছেন ১.১৮। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ক্লাস নিতে না পারা, ক্লাসে নিজের পরিবারের গল্প বলা, টপিক ভুলে যাওয়া এবং অল্পতেই রেগে যাওয়াসহ নানা অভিযোগের কথা বলছেন শিক্ষার্থীরা।
ক্লাসে যা ঘটেছিল, যা বলছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও সহপাঠীরা
ঘটনার বিবরণ দিয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মল্লিকা বলেন, আমাদের আজকে একটি কোর্সের ক্লাস ছিল তাসনিম সিরাজ ম্যামের সাথে। উনি ক্লাস শুরু করার একটা পর্যায়ে, আমি ওনার ডেস্কের বামে বসেছি—ওনার সঙ্গে আমার দুইবার আই কন্ট্যাক্ট হয়েছে। আমাদের আই কন্ট্যাক্ট হওয়ার পরে আমি একটু আনইজি ফিল করেছি, কারণ উনার সাথে আমার কিছু হিস্ট্রি আছে হিজাব-নিকাব সম্পর্কিত।
একটা স্টেজে আমাকে বলেন যে, ‘তুমি এখানে বসে থাকলে আমার আনকমফোর্টেবল ফিল হচ্ছে, আমার আনসেফ ফিল হইতেছে। আমি চাচ্ছি যে তুমি ক্রাউডের মধ্যে গিয়ে বসো।’ এখন আমার কথা হচ্ছে আমি যদি বামে থেকেও উনাকে আনসেফ ফিল করাইতে পারি, ডান থেকেও আনসেফ ফিল করাইতে পারি, তাহলে ক্রাউডের মধ্যে গিয়ে বসলেও তো উনি আনসেফ ফিল করতে পারেন। এরপরে আমি যখন... উনি আমাকে এই অফার করার পরে আমি ক্লাস থেকে বের হয়ে চলে আসি— ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী
তিনি বলেন, থার্ড টাইম উনি যখন আমার দিকে তাকায়, সরাসরি এড্রেস করে উনি বলা শুরু করেন যে, ‘মা, তোমাকে দেখে আমার আনকমফোর্টেবল ফিল হচ্ছে।’ এরপরে উনি গ্র্যাজুয়ালি মুভ করেন যে আমি কেন এভাবে ড্রেসআপ করলাম, এটা কোন ফিকহে আছে, এটা ইসলামের কোথায় আছে। উনি বারবার রেফারেন্স দেন যে উনি হজ করে আসছেন, উনি সব জানেন এবং হজ করে যেহেতু আসছেন, ওখানে তো মুখ খুলে রাখাই যায়।
তিনি বলেন, এরপরে উনি গ্র্যাজুয়ালি উনার কথাবার্তা মুভ করেন এবং করতে করতে একটা স্টেজে আমাকে বলেন যে, ‘তুমি এখানে বসে থাকলে আমার আনকমফোর্টেবল ফিল হচ্ছে, আমার আনসেফ ফিল হইতেছে। আমি চাচ্ছি যে তুমি ক্রাউডের মধ্যে গিয়ে বসো।’
ভুক্তভোগী নারী শিক্ষার্থী বলেন, এখন আমার কথা হচ্ছে আমি যদি বামে থেকেও উনাকে আনসেফ ফিল করাইতে পারি, ডান থেকেও আনসেফ ফিল করাইতে পারি, তাহলে ক্রাউডের মধ্যে গিয়ে বসলেও তো উনি আনসেফ ফিল করতে পারেন। এরপরে আমি যখন... উনি আমাকে এই অফার করার পরে আমি ক্লাস থেকে বের হয়ে চলে আসি।
তবে বুধবারই প্রথম নয়, এর আগেও এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন ওই শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, লাস্ট আরেকটা ক্লাসে উনি আমাকে বলছিলেন, আমি যদি এভাবে মুখ ঢেকে চলি, তাহলে নিকাবটি খুলে দেওয়া হবে। উনি ডিরেক্ট এভাবে বলছেন। তার মানে উনি বোঝাইতে চেয়েছেন যে উনার ক্লাসে উনি এটাই করতে চান, যেটা উনি করতে পারেন নাই ইভেনচুয়ালি।
তিনি বলেন, এখন কথা হচ্ছে উনি টিচার হিসেবে যদি সামনে বসে ক্লাস নিতে পারেন, তাহলে আমি স্টুডেন্ট হিসেবে কেন ওখানে বসতে পারব না? ডিপার্টমেন্টে কোন ভেরিফিকেশন, আইডেন্টিফিকেশনের কোনো ইস্যু নাই, তাহলে ওনার এতো প্রবলেম কিসের? উনি এর আগেও আমাকে বলেছেন যে, ‘তোমাকে আমি জানি না তুমি কে।’ আমি উনাকে রিকুয়েস্ট করেছি, ‘ম্যাম, আমি আপনার অফিস আওয়ারে আপনার সাথে দেখা করি, কথা বলি এবং আমি এটলিস্ট ফেস দেখাই, সমস্যা নাই তো। আমার কার্ড আছে আপনি দেখেন। রেকগনাইজ করেন। আমার ক্লাসমেটরাও আমাকে চেনে, ভাইবা বোর্ডেও আমাকে কোনো প্রবলেম করে না, সবাই আমাকে চেনে। তাহলে আপনার কিসের প্রবলেম?’
উনি তখন রেগে গিয়ে বলছেন যে, ‘না, এটা সম্ভব না, আমি প্রতিদিন তোমাকে চেক করতে পারব না’—বলেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, এখানে বিষয়টা আসলে কোনো ইস্যু না যে উনি সাডেনলি এরকম ফিল করতেছেন, এটা একটা কন্টিনিউয়াস প্রসেস। বাংলাদেশে ইসলামোফোবিয়ার যে কন্টিনিউয়াস একটা প্রসেস দাঁড়ায়ে আছে, ওইটার উপরে দাঁড়ায়ে এসে ওনার বিজয়ী ঝান্ডা আর কি গেড়ে দিয়ে বলতেছেন যে, ‘আমি আমার ক্লাসে এটা প্রেফার করব না।’
তিনি বলেন, ইউনিভার্সিটি থেকে, ডিপার্টমেন্ট থেকে কোথাও থেকেই এটার কোনো ব্যাখ্যা নাই। যে তাদের তো ডিমান্ড নাই যে এরকম ড্রেসআপ করা যাবে না। কিন্তু প্রত্যেক বারই ওনার ক্লাসে এটা ইস্যু। যদি আমি ওনার চোখের সামনে থাকি, যেটা উনি ক্লিয়ারলি আমাকে আইডেন্টিফাই করতে পারতেছেন যে আমি এভাবে কাভার করে বসে আছি, তাহলেও ওনার ইস্যু হয় যে কেন আমি এভাবে কাভার করব, কেন চোখ কাভার করব, কেন হাত কাভার করব, কেন পা কাভার করব।
ইংরেজি বিভাগের ১৪তম ব্যাচের রাইসা মণি সুমি বলেন, ম্যাম আসলে ইসলামবিরোধী কথাবার্তা রেগুলার ওয়েতে, মাঝে মাঝেই ক্লাসে বলেন। আমরা প্রতিনিয়ত ক্লাসে খেয়াল করি, সবসময় সূক্ষ্ম একটা ইসলাম বিরোধী মনোভাব ওনার থাকে। উনি নিজেকে ঈমানদার দাবি করেন, আবার একইভাবে প্রতিনিয়ত ইসলাম নিয়ে অনেক কটূক্তি করেন। যেমন পর্দা এরকম হওয়া উচিত না, ওইরকম হওয়া উচিত না, মাযহাব মানা উচিত না। আজকে যখন উনি ওনাকে (ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে) বলছিল, তখন আমি ম্যামকে বললাম, ‘ম্যাম, ও তো মাযহাব মানে, এজন্য ও একটা নির্দিষ্ট মাযহাবের অধীন এভাবে পর্দা দিচ্ছে।’
একটি অভিযোগ মৌখিকভাবে বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আগামীকাল শিক্ষার্থীরা লিখিত অভিযোগ জানাবে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব। আগামীকাল জরুরি একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় এ নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে— অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
তিনি বলেন, ম্যাম তখন রেগে বলল এভাবে এক্সপ্রেশন দিয়ে অনেক জোরে জোরে যে ‘কোনো মাযহাব আমরা মানি না। কেন মানব? আমরা বেসিক পালন করব, জাস্ট ফলো হজ, নামাজ, রোজা, যাকাত। আমাদের আর কিছু মানার দরকার নাই।’ উনি এস্টাবলিশ করে দিচ্ছে যে আমরা কতটুক মানব। তারপর পোশাক নিয়ে আবারও বলল কতটুক মানব। তারপর আমি পোশাক নিয়ে ম্যামকে আবারও বললাম যে, ‘ম্যাম, ও যদি কমফোর্টেবল থাকে তাহলে সমস্যা কী?’ এখন ম্যাম আরো রেগে গেল, ‘তুমি কিভাবে ওকে সাপোর্ট করতে পারো? তুমি কিভাবে ওকে সাপোর্ট করতে পারো?’ এভাবে বলে আবারও পোশাক নিয়ে বলল।
এক পর্যায়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে জঙ্গি এবং বোমা মারতে পারেন বলেও মন্তব্য করেন অভিযুক্ত শিক্ষক। সুমি বলেন, তারপর আবার আমি বললাম, ‘ম্যাম, আফগানিস্তানরা একভাবে পর্দা করে, ফিলিস্তিনরা আরেকভাবে পর্দা করে। এগুলোর তো লাইফস্টাইলের ভ্যারাইটি থাকতে পারে, এটা তো মানা উচিত।’ ম্যাম আমাকে আর কথা বলার সুযোগ দিলেন না। বললেন, ‘ও যদি জঙ্গি হয়, ও যদি বোমা মারে, তুমি কীভাবে ওকে সাপোর্ট করতে পারো?’ মানে ম্যাম আমাদেরকে আরো উস্কে দিচ্ছিল, যেন আমরা যেন ওকে সাপোর্ট না করি, ও যেন আলাদা কেউ এবং আমরা আলাদা কেউ।
তিনি আর বলেন, ম্যাম এটাও বলেছে, ‘তোমার পর্দা কই?’ আমি নিজেই ওর মতো পর্দা করতে চাই বা পছন্দ করি, কিন্তু সবাই তো সবরকম ইস্যুর জন্য সব করতে পারে না। আমি নিজেই এরকম করি এবং করতে চাই। সবারই নিয়ত থাকে যেন আরও ভালোভাবে পর্দা করি। কিন্তু ম্যাম এখানে একটা ইস্যু দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে, আমরা এতটুকু করতে পারব, অতটুকু করতে পারব না, মুখ দেখা যেতে হবে, হাত দেখা যেতে হবে। যখন ম্যাম এভাবে সফেস্টিকেটেড কথা বললেন, ধীরে ধীরে অনেকেই বেরিয়ে গেলাম।
অভিযুক্ত শিক্ষক ক্লাসে শিক্ষার্থীদের হুমকি দেন বলেও অভিযোগ করেন সুমি। তিনি বলেন, উনি এখানে পলিটিক্যালি পাওয়ারফুল, এটা উনি ক্লাসে বলেছেন। ওনার কেউ কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, কেউ কিছু করতে পারবে না, এটাও উনি ক্লাসে বলেছেন। উনি আমাদেরকে কন্টিনিউয়াসলি থ্রেট দিয়েছেন। থ্রেট দেওয়ার কারণ এটাই যে উনি অনেক বেশি নার্সিসিস্ট। উনি ক্লাসের ৫০ মিনিটের মধ্যে ৪০ মিনিট ওনার ফ্যামিলির কথা বলে।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত শিক্ষক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি এখন হাসপাতালে আছি। এখন কথা বলতে পারবো না। কিছু জানার থাকলে আপনি আমার সাথে ডিপার্টমেন্টে দেখা করবেন। আমি ফোনে কিছু বলব না।
জানতে চাইলে কলা অনুষদের ডিন ড. আবুল কালাম সরকার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাকে বিভাগীয় চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমার কাছে আসেনি। যখন আসবে, নিশ্চয়ই এটি কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করে আমরা ব্যবস্থা নেব।
সবারই পছন্দমতো পর্দা করার অধিকার আছে উল্লেখ করে ডিন বলেন, কোনো শিক্ষক যদি আসলেই এমন কিছু বলে থাকেন, সেটি উচিত হয়নি।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এ ধরনের একটি অভিযোগ মৌখিকভাবে বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আগামীকাল শিক্ষার্থীরা লিখিত অভিযোগ জানাবে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব। আগামীকাল জরুরি একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় এ নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে।