শিশুর ভাষা বিকাশে ডিভাইস স্ক্রিনের প্রভাব কেমন, যা বলছে ঢাবির গবেষণা

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৫ PM
শিশুদের মোবাইল আসক্তি, প্রতীকী ছবি

শিশুদের মোবাইল আসক্তি, প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত ছবি

একটি শিশু মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে কার্টুন দেখছে। পর্দায় চরিত্রগুলো কথা বলছে, গান গাইছে, গল্প এগিয়ে যাচ্ছে। শিশুটি চুপচাপ তাকিয়ে আছে। তার চোখে আগ্রহ, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ নেই।

অন্য ঘরে আরেকটি শিশু একইভাবে স্ক্রিনের সামনে বসে। সেও কার্টুন বা কোনো ভিডিও দেখছে। তবে তার গল্পটা একটু ভিন্ন। পর্দায় নতুন কোনো শব্দ শুনলে সে তা বলার চেষ্টা করছে। প্রশ্ন আসছে—‘এটা কী?’ ‘কেন এমন হলো?’ শিশুকে পাশে থাকা মা উত্তর দিচ্ছেন। শিশুটিও আবার নিজের মতো করে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছে।

দুই শিশুর হাতেই স্ক্রিন। দুজনই হয়তো একই সময় ধরে স্ক্রিন দেখছে। কিন্তু ভাষা শেখার অভিজ্ঞতা কি তাদের একই রকম? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা বলছে, না।

শিশুর ভাষা বিকাশে শুধু সে দিনে কত ঘণ্টা স্ক্রিনের সামনে থাকছে, সেটিই শেষ কথা নয়। বরং স্ক্রিনে সে কী দেখছে, কীভাবে দেখছে এবং সেই কনটেন্টের সঙ্গে কতটা সক্রিয়ভাবে যুক্ত হচ্ছে—ভাষা শেখার ক্ষেত্রে এসব বিষয়ই হয়ে উঠতে পারে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু স্ক্রিনের সময় নয়, গুরুত্বপূর্ণ কী দেখছে শিশু
‘ইফেক্ট অব ইউজিং স্ক্রিন টাইম ইন ডেভেলপিং চিলড্রেন’স স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ: বাংলাদেশ কনটেক্সট’ শীর্ষক গবেষণাটি পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগের শিক্ষার্থী মো. জাহিদ হোসেন খান। গবেষণাটির তত্ত্বাবধানে ছিলেন একই বিভাগের অধ্যাপক হাকিম আরিফ।

ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও টাঙ্গাইলের ৩ থেকে ৮ বছর বয়সী ৫০ শিশু এবং তাদের অভিভাবকদের ওপর গবেষণাটি চালানো হয়। প্রশ্নমালার পাশাপাশি প্রত্যেক শিশুর ৩০ মিনিটের স্ক্রিন ব্যবহারের সময় সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা। সেখানেই উঠে আসে শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের একটি চিত্র।

গবেষণায় দেখা যায়, ৪০ শতাংশ শিশু প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহার করে। আরও ২০ শতাংশ শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারের সময় চার ঘণ্টার বেশি। ডিভাইসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ৯০ শতাংশ শিশু মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। ৭০ শতাংশের সঙ্গী টেলিভিশন। আর ৫০ শতাংশ শিশু ট্যাব ব্যবহার করে।

কিন্তু স্ক্রিনে কী চলছে? উত্তরটা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের বড় অংশজুড়েই রয়েছে বিনোদন। ৮০ শতাংশ শিশু কার্টুন বা অন্যান্য বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখে। আর ৬০ শতাংশ শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারকে গবেষকেরা ‘নিষ্ক্রিয়’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ শিশু দেখছে। কিন্তু সব সময় শেখার জন্য দেখছে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—সে যা দেখছে, তা নিয়ে কথা বলছে না, প্রশ্ন করছে না কিংবা কোনো প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে না।

গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি সম্ভবত এখানেই। স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা আর স্ক্রিনের মাধ্যমে শেখা—দুটিকে এক করে দেখছেন না গবেষকেরা। যেসব শিশু শিক্ষামূলক ও পারস্পরিক অংশগ্রহণমূলক অ্যাপ ব্যবহার করেছে, তাদের মধ্যে নতুন শব্দ শেখা, প্রশ্ন করা এবং নতুন বাক্য তৈরির চেষ্টা করার প্রবণতা দেখা গেছে। অর্থাৎ স্ক্রিন তাদের জন্য শুধু দেখার জায়গা হয়ে থাকেনি; কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেটি হয়ে উঠেছে ভাষা চর্চার একটি মাধ্যম।

অন্যদিকে, যারা প্রধানত কার্টুন বা ইউটিউব ভিডিও দেখেছে, তাদের মধ্যে কথা বলার আগ্রহ তুলনামূলক কম ছিল। শুধু তাই নয়, কয়েকজন শিশুকে স্ক্রিন বন্ধ করতে বলা হলে তারা জেদ করেছে বা কান্না করেছে বলেও পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। ৬ থেকে ৮ বছর বয়সী শিশুরা অবশ্য তারা যে অনুষ্ঠান দেখেছে, সে বিষয়ে দীর্ঘ সময় কথা বলতে পেরেছে। তবে তাদের বাক্য গঠনে কিছু দুর্বলতা বা অসঙ্গতিও দেখা গেছে।

এখানেই গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—শিশু কতক্ষণ স্ক্রিন দেখছে, সেই হিসাবের পাশাপাশি স্ক্রিন দেখার সময় সে আসলে কী করছে? পাশে কেউ আছে কি? শিশুর হাতে মোবাইল দিয়ে অভিভাবক যদি মনে করেন, ‘ও তো চুপচাপ আছে, সমস্যা কী’—গবেষণার ফল সেই ধারণাকে কিছুটা নতুন করে ভাবতে বলছে।

কারণ শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারের সময় অভিভাবকের উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ২০ শতাংশ অভিভাবক শিশু স্ক্রিন ব্যবহারের সময় নিয়মিত পাশে থাকেন। আর ৩০ শতাংশ অভিভাবক সক্রিয়ভাবে শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের সময় নিয়ন্ত্রণ করেন। অর্থাৎ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিশু এবং স্ক্রিনের মধ্যে থাকা সম্পর্কটিতে বড়দের উপস্থিতি খুব সীমিত। কিন্তু শিশুর ভাষা শেখার ক্ষেত্রে এই উপস্থিতিই বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

গবেষক মো. জাহিদ হোসেন খান জানান, ভাষা শেখার মূল শর্ত হলো দুই পক্ষের মধ্যে কথোপকথন। স্ক্রিন সাধারণত সেখানে একমুখী যোগাযোগ তৈরি করে। তবে পরিস্থিতি বদলাতে পারে, যদি বাবা-মা শিশুর পাশে বসেন। একই অনুষ্ঠান দেখার সময় পর্দায় কী ঘটছে তা নিয়ে শিশুর সঙ্গে কথা বলা, তাকে প্রশ্ন করা, তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কিংবা নতুন কোনো শব্দের অর্থ বোঝানো—এসবের মাধ্যমে স্ক্রিন দেখার সময়টিই হয়ে উঠতে পারে শেখার সুযোগ। অর্থাৎ সমস্যাটা সব সময় ‘স্ক্রিন’ নয়; অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে স্ক্রিন ব্যবহারের ধরন।

শিশুর ভাষা বিকাশ নিয়ে অভিভাবকদের অভিজ্ঞতাতেও উঠে এসেছে উদ্বেগের ছবি। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৫০ শতাংশ অভিভাবক ও পরিচর্যাকারী মনে করেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুর ভাষা বিকাশে ক্ষতি করছে। ৬০ শতাংশ জানিয়েছেন, শিশুদের শব্দভান্ডার কমে গেছে।

তবে একই গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। ৬০ শতাংশ অভিভাবক মনে করেন, সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে স্ক্রিন শিশুদের ভাষা শেখায় সহায়তা করতে পারে।

অর্থাৎ অভিভাবকদের ধারণাতেও একটি দ্বৈততা রয়েছে—স্ক্রিন ক্ষতির কারণ হতে পারে, আবার সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে সেটিই শেখার উপকরণও হতে পারে।

তাহলে কি শিশুকে স্ক্রিন থেকে দূরে রাখতে হবে?
গবেষণাটি এমন কোনো সরল সিদ্ধান্ত দেয়নি যে শিশুদের স্ক্রিন থেকে পুরোপুরি দূরে রাখতে হবে। বরং গবেষণার ফল বলছে, শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে শুধু ‘কতক্ষণ’ প্রশ্নটি যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে আরও কয়েকটি প্রশ্ন—কী দেখছে? কেন দেখছে? কীভাবে দেখছে? আর দেখার সময় তার সঙ্গে কেউ কথা বলছে কি না?

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, শিশুদের বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি বাংলায় মানসম্মত শিক্ষামূলক কনটেন্ট তৈরি করা জরুরি। এ বিষয়ে বাবা-মা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। 

গবেষণায় শিশুদের ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে সরকারি উদ্যোগ নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে। শিশুদের জীবনে স্ক্রিনের উপস্থিতি এখন আর নতুন কোনো বিষয় নয়। পড়াশোনা, বিনোদন, গান, কার্টুন—সবকিছুর সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে গেছে ডিজিটাল ডিভাইস।

কিন্তু এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিশুর ভাষা ও সামাজিক বিকাশের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখনও সীমিত।

গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক হাকিম আরিফ মনে করেন, শিশুদের জীবনে স্ক্রিনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এটি এখন তাদের সুস্থ বিকাশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক গবেষণাও খুব সীমিত। তাই শিশুর হাতে থাকা স্ক্রিনকে শুধু ‘সময় নষ্টের যন্ত্র’ হিসেবে দেখা হয়তো ঠিক নয়। আবার একে শুধু ‘শেখার উপকরণ’ হিসেবেও ছেড়ে দেওয়া যাবে না।

কারণ একই স্ক্রিন এক শিশুর জন্য হতে পারে নিঃশব্দ বিনোদন, আর অন্য শিশুর জন্য হতে পারে নতুন শব্দ শেখার দরজা। পার্থক্যটা তৈরি হয় শিশু কী দেখছে, কতটা অংশ নিচ্ছে এবং স্ক্রিনের এপাশে থাকা বড়রা তার সঙ্গে কতটা কথা বলছেন—সেখানে।

বনানীর সেতু ভবনের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ
  • ০৮ নভেম্বর ২০২৬
কুয়াকাটায় ঘুরতে গিয়ে প্রাণ হারালেন সলিমুল্লাহ মেডিকেলের চিক…
  • ০৮ নভেম্বর ২০২৬
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে হলে গ্যাস লিকেজ থেকে আগুন, আহত শিক্ষার…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
‎জাবিতে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে,…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলা-ভাঙচুর, গ্রেফতার ১৪
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
মেডিসিন ক্লাবের ‘সংবিধান’ লঙ্ঘন করে পদ পেলেন ছাত্রদল ও নিষি…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950