বিপাকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী © টিডিসি সম্পাদিত
‘‘বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া পরীক্ষার্থীদের জন্য হলগুলোতে বই প্রদান করা হয়েছে, কিন্তু আমরা বই পড়তে পারি না। বইয়ের জ্ঞানের আলো আমাদেরকে স্পর্শ করে না। বই পড়তে আমাদেরকে ব্রেইল পদ্ধতি বা এরকম কিছুই দেওয়া হয়নি। আমরা জানি ব্রেইল পদ্ধতিতে অনেক খরচ হয়, তবে সেটি না দিলেও অন্তত কম্পিউটার দোকান থেকে অনলাইন পিডিএফ বানিয়ে দিতে পারতো। অথচ এগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব। চাকসুর (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) সমাজসেবা বিভাগের ইশতাহারেও বিষয়টি উল্লেখ ছিল। ১১ মাস পরেও ব্রেইল পদ্ধতির বই পাইনি’’—আবেগ জড়িত কণ্ঠে আক্ষেপ নিয়ে এসব কথা বলেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) দৃষ্টিহীন নারী শিক্ষার্থী আয়েশা আক্তার তন্নী।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এই নারী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় ২৪ হল ছাত্রসংসদের কার্যনির্বাহী সদস্য। শুধু তন্নীই নন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান শতাধিক দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীও এই সমস্যায় ভুগছেন। তন্নীর অভিযোগ, প্রশাসন ও চাকসু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন। চাকসুর সমাজসেবা ও পরিবেশ সম্পাদক তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেন নি। এসব বিষয়ে তার কোনো সাড়া পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ করেন তন্নী।
শৈশবেই নিজের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন বলে জানিয়ে আয়েশা আক্তার তন্নী বলেন, আমার বয়স যখন ৪ বছর। তখন চোখে বালি গিয়ে দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। এরপর থেকে আজও চোখে দেখতে পারিনা। একসময় এটি নিয়ে মন খারাপ করতাম, কিন্তু এখন করি না। হয়তো এটি আমার ভাগ্যে ছিল।
তন্নী আরও বলেন, কিছুদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকসুর পক্ষ থেকে একটি জার্মান ভাষা শেখার ক্লাস দিয়েছিল। টাকা দিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম, সেখানে তিনটির বেশি ক্লাস করতে পারিনি। তবে আমার জন্য স্যার অনেক খেঁটেছেন কিন্তু অডিও রেকর্ডিং না থাকায় কিছুই শিখতে পারিনি। যে নোট প্রোভাইড করা হতো, তা আমি পড়তে পারতাম না।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল কোনো বিলাসিতা নয় উল্লেখ করে চবির সমাজতত্ত্ব বিভাগের ২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মাহবুব জামান বলেন, অডিও বই ও স্ক্রিন রিডার আমাদের শেখার সুযোগ তৈরি করলেও বানান, শব্দের গঠন, বিরামচিহ্ন ও লিখিত ভাষার দক্ষতা অর্জনে ব্রেইলের বিকল্প নেই। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল কোনো বিলাসিতা নয়, এটি শিক্ষার মৌলিক অধিকার ও প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, তাই চবিতে বিদ্যমান প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার ল্যাবকে আধুনিকায়ন করে একটি ‘ব্রেইল ও অ্যাক্সেসিবিলিটি কর্নার’ প্রতিষ্ঠার দাবি জানাই। সেখানে ব্রেইল প্রিন্টার, রিফ্রেশেবল ব্রেইল ডিসপ্লে ও প্রয়োজনীয় সহায়ক প্রযুক্তির পাশাপাশি পাঠ্যসামগ্রী ব্রেইলে রূপান্তরের ব্যবস্থা থাকতে হবে। আমরা বিশেষ কোনো সুবিধা চাই না, চাই সমানভাবে শেখার সুযোগ। একটি ব্রেইল প্রিন্টার হয়তো ছোট উদ্যোগ, কিন্তু একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য এটি শিক্ষার নতুন দরজা খুলে দিতে পারে।
চবির বিজয় ২৪ হলে বসবাসরত দৃষ্টিহীন নারী শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে হল কেন্দ্রীক টিম লাইট হাউজ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন হলটির দপ্তর সম্পাদক আবিদা সুলতানা। তিনি বলেন, বিষয়টি যদি ক্যাম্পাসজুড়ে করা হতো তাহলে অনেক ভালো হতো, কেননা আমাদের হল, ডিপার্টমেন্ট এবং ফ্যাকাল্টিতে অধ্যয়নরত অনেকেই এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এক প্রশ্নের জবাবে আবিদা সুলতানা জানান, এ বিষয়টির দায়িত্বে চাকসুর সমাজসেবা ও পরিবেশ বিভাগ থেকে কোনো আর্থিক কিংবা পরামর্শমূলক সহযোগিতা পায়নি তার হল।
প্রতিবন্ধী ছাত্রসমাজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (ডিস্কো) সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা অভিযোগ করে বলেন, চাকসু নির্বাচনের আগে বিভিন্ন প্রার্থীর ইশতেহারে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল প্রিন্টারসহ নানা সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনের পরেও আমরা বিষয়টি নিয়ে নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছি এবং জানতে পেরেছি, ব্রেইল প্রিন্টারের জন্য বাজেট ও বিল পাস হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রিন্টারটি আমরা পাইনি। বিশ্ববিদ্যালয় দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর সংখ্যা প্রায় শতাধিক।
তিনি আরও বলেন, এমনকি এ বিষয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চাকসুর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগও করা হয়নি। সমাজসেবা ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত কার্যক্রম দেখা যায়নি। যদিও তিনি সম্প্রতি জানিয়েছেন, বিলটি এখনো তাঁর হাতে পৌঁছায়নি।
আমরা মনে করি, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের স্বার্থে চাকসু ও ডিস্কোর মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় ও নিয়মিত যোগাযোগ থাকা জরুরি। তবে চাকসু কার্যালয়ে গিয়ে অন্যান্য দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে আমরা আন্তরিক সহযোগিতামূলক আচরণ পেয়েছি, বলেন সোহেল রানা।
চাকসুর পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ বলেন, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য অডিও বুক তৈরিতে একটি স্বেচ্ছাসেবী টিম গঠন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে পরীক্ষার সময় প্রয়োজনীয় বই ও শিট রেকর্ড করে তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
চাকসুর সমাজসেবা ও পরিবেশ সম্পাদক তাহসিনা রহমান বলেন, আমার বিভাগের জন্য মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। এরমধ্যে ব্রেইল পদ্ধতির জন্য বরাদ্দের ৫ লাখ টাকা এখনো হাতে পাইনি। টাকা আমার হাতে নাই, আমাকে ফান্ড দেওয়া হয় নাই। ব্রেইল ইস্যুতে চবি প্রশাসনকে আবেদন জানিয়েছি তারা যেন উপকরণগুলো কিনে আমাকে দিয়ে দেয়, তাহলে আমি এগুলো বণ্টন করে দিতে পারবো।
শিক্ষার্থীদের মেসেজ এবং তাদের প্রয়োজনে ফোন করলে তাতে সাড়া না দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সমাজসেবা সম্পাদক বলেন, ব্যক্তিগত প্রবলেম থাকতে পারে। ঢালাওভাবে এমন অভিযোগ ঠিক নয়। ফোন দিয়ে পেয়েছে, অনেকে পায়নি। সব হিস্ট্রিগুলো আমার কাছে আছে। কল দিয়ে পেয়েছে, এই সংখ্যাটাই বেশি। আমি ছাত্রী হলগুলোর মেসেজের রিপ্লে দিই নাই, এটা সত্য।
চাকসু জিএস সাইদ বিন হাবিব বলেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য শুরুতেই চেষ্টা করেছিলাম, বেশ কিছু জায়গায় কথা বলেছিলাম। এখন চাকসুর বাজেট হাতে পাওয়ার পর তাদেরকে পৌঁছে দিবো।আমাদের সমাজসেবা সম্পাদকের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যা থাকার কারণে তাকে প্রত্যাশা অনুযায়ী পাওয়া যাচ্ছে না। যার ফলে মেশিনটি কিনতে কিছুটা ধীরগতি হচ্ছে। আমরা আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ক্রয় কমিটি রয়েছে অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের মাধ্যমে দেখে ভালোভাবে আমাদের দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থী ভাই-বোনের জন্য ব্রেইল মেশিন সরবরাহ করতে পারব।
চাকসু ভিপি ইব্রাহিম হোসেন রনি বলেন, চাকসুতে যারা নির্বাচিত হয়ে এসেছে তারা প্রত্যেকেই শিক্ষার্থীদের কাজের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে বাধ্য। যদি কোনো সম্পাদকের কাজে গড়িমসি থাকে এবং কাজ না করে তাহলে বারবার তাদের দৃষ্টি আকর্ষণী দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সম্পাদকদের বরাদ্দের ২টি অংশ রয়েছে, একটি অংশ দিয়ে ইতোমধ্যে কাজ করে ফেলেছে, আর বাকি অংশ উত্তোলন করতে পারবে না। প্রশাসনের ক্রয় কমিটির মাধ্যমে কার্য পরিকল্পনা করতে হবে।
এ বিষয়ে চবি উপাচার্য ও চাকসু সভাপতি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকানকে মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।