প্রতারণার ফাঁদ
ঢাবি শিক্ষার্থীদের পরিবার টার্গেটে © এআই সম্পাদিত প্রতীকী ছবি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে তাদের পরিবারের সদস্যদের টার্গেট করে প্রতারণা করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। শিক্ষার্থীকে মাদকসহ আটক, অপহরণ কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী-ডিবির হেফাজতে থাকার কথা বলে পরিবারের সদস্যদের আতঙ্কিত করা হচ্ছে। কখনো পুলিশ, কখনো গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্য পরিচয়ে ফোন করে দ্রুত বিকাশে টাকা পাঠাতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো ঘটনায় শিক্ষার্থীর কণ্ঠস্বর নকল করে পরিবারের সদস্যদের বিশ্বাস করানোর অভিযোগও রয়েছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে সম্প্রতি এমন প্রতারণার শিকার ২০টির বেশি পরিবারের তথ্য পাওয়া গেছে। একটি ঘটনায় দেড় লাখ টাকা এবং অন্য ঘটনায় ৬০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রতারকদের হাতে যাচ্ছে কীভাবে।
ভুক্তভোগীদের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রতারণার কৌশল প্রায় একই। শিক্ষার্থী যখন ক্লাস, পরীক্ষা, টিউশন, ঘুম কিংবা অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত থাকেন এবং ফোনে পাওয়া যায় না, তখন পরিবারের সদস্যদের ফোন করা হয়। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে নিজেদের কখনো পুলিশ, কখনো ডিবির সদস্য পরিচয় দিয়ে বলা হয়, তাদের সন্তানকে আটক করা হয়েছে। তার কাছে ইয়াবা বা অন্য মাদক পাওয়া গেছে, তিনি কোনো অপরাধে জড়িত কিংবা তাকে অপহরণ করা হয়েছে—এমন নানা কথা বলা হয়। এরপর দ্রুত টাকা না পাঠালে আদালতে চালান, রিমান্ড কিংবা জেলে পাঠানোর ভয় দেখানো হয়। নির্দিষ্ট বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠানোর জন্য দেওয়া হয় সময়ের চাপ।
‘‘আমার মামার মোবাইলে কল আসে। পুলিশ পরিচয়ে কথা বলে বলা হয়, তার ছেলেকে পুলিশ ধরেছে। তার কাছে নাকি মাদকদ্রব্য পাওয়া গেছে। এখনই বিকাশে ২০ হাজার টাকা পাঠাতে হবে এবং কল কাটা যাবে না।’’
বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার দা সূর্য সেন হলের শিক্ষার্থী নেসার উদ্দিন জিহাদের পরিবারও এমন প্রতারণার শিকার হয়েছে। তার বাড়ি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায়। ঘটনার সময় তিনি ঘুমিয়েছিলেন। ঘুম থেকে উঠে দেখেন, তার বাবা-মা ও মামাসহ পরিবারের কয়েকজন তাকে ফোন করেছেন।
নেসার উদ্দিন জিহাদ বলেন, আমি ঘুমাচ্ছিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি, আব্বু-আম্মু ও মামাসহ কয়েকজনের কল উঠে আছে। ব্যাক করে জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে। শুনলাম, আমি নাকি আমার দুই বন্ধুর সঙ্গে ইয়াবাসহ ধরা পড়েছি।
তিনি জানান, প্রতারকেরা তার বাবার কাছে ৩০ হাজার টাকা দাবি করে। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারায় টাকা পাঠানোর আগেই বিষয়টি ধরা পড়ে। তিনি বলেন, চিন্তায় আব্বু-আম্মুর বেহাল অবস্থা। প্রতারক চক্র আমার আব্বুর কাছে ৩০ হাজার টাকা দাবি করে। তৎক্ষণাৎ আব্বু টাকা না দিয়ে সবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আমি হয়তো ঘুম থেকে একটু দেরিতে উঠলে আরও অনেক কিছু হয়ে যেত।
একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী মুদাচ্ছির আবির। তার অভিযোগ, একটি চক্র তার মায়ের নম্বরে ফোন করে জানায়, তাকে ডিবি অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে তার কণ্ঠস্বর নকল করে পরিবারের সদস্যদের বিশ্বাস করানো হয় যে তিনি ফোনের অপর প্রান্তেই রয়েছেন। একপর্যায়ে তার পরিবারের কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা নেয় প্রতারকেরা বলে অভিযোগ করেন তিনি। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি জানিয়ে অন্যদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
প্রতারণার কৌশল প্রায় একই। শিক্ষার্থী যখন ক্লাস, পরীক্ষা, টিউশন, ঘুম কিংবা অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত থাকেন এবং ফোনে পাওয়া যায় না, তখন পরিবারের সদস্যদের ফোন করা হয়। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে নিজেদের কখনো পুলিশ, কখনো ডিবির সদস্য পরিচয় দিয়ে বলা হয়, তাদের সন্তানকে আটক করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারাহ্ শাহারিন জানান, তার দুই কাজিনও একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, আমার মামার মোবাইলে কল আসে। পুলিশ পরিচয়ে কথা বলে বলা হয়, তার ছেলেকে পুলিশ ধরেছে। তার কাছে নাকি মাদকদ্রব্য পাওয়া গেছে। এখনই বিকাশে ২০ হাজার টাকা পাঠাতে হবে এবং কল কাটা যাবে না।
ফারাহ্ জানান, তার মামাতো ভাই মোহাম্মদপুরের একটি স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ে। প্রতারকেরা একটি কণ্ঠস্বর শোনায়, যেটিকে তার মামাতো ভাইয়ের কণ্ঠ বলে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করা হয়। অন্য একটি ঘটনায় যশোরে তার আরেক মামাকেও একইভাবে ফোন করা হয়। বলা হয়, তার ছেলেকে পুলিশ ধরেছে এবং টাকা দিতে হবে। টাকা দেওয়ার পর বাসায় ফিরে তিনি দেখতে পান, তার ছেলে বাসাতেই রয়েছে।
গত ২১ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর বাবার কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগও ওঠে একই ধরনের একটি প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে। প্রতারণার শিকার হন সাতক্ষীরার ঘোনা ইউনিয়ন বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোস্তফা রুহুল কুদ্দুস। তার ছেলে মোস্তফা আরিফুজ্জামান আরিফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে থাকেন।
‘‘শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এ ধরনের প্রতারণার বেশ কয়েকটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারা যখন ক্লাসে, টিউশনে কিংবা ঘুমিয়ে থাকে, তখন তাদের পরিবারের কাছে ফোন দিয়ে কখনো ডিবি, কখনো পুলিশ পরিচয়ে বলা হচ্ছে, আপনার ছেলেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কিংবা তার কাছে কোনো অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু পাওয়া গেছে। এরপর বিভিন্নভাবে টাকা হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে—ঢাবি প্রক্টর
রুহুল কুদ্দুসের ভাষ্য, একটি মুঠোফোন নম্বর থেকে তাকে ফোন করে প্রথমে জানতে চাওয়া হয় তার কতজন ছেলে এবং তারা কী করেন। এরপর তার ছোট ছেলে কোথায় থাকেন, কী করেন এবং কার সঙ্গে চলাফেরা করেন এসব তথ্য জানতে চাওয়া হয়। একপর্যায়ে ফোনকারী নিজেকে ডিবির সদস্য পরিচয় দিয়ে দাবি করেন, তার ছেলে আরও তিনজনের সঙ্গে মাদকসহ আটক হয়েছেন। তাকে আদালতে চালান করে দেওয়া হবে বলেও ভয় দেখানো হয়।
এরপর ছেলের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেওয়ার কথা বলে একটি কণ্ঠস্বর শোনানো হয়। সেটি তার ছেলের কণ্ঠের মতো শোনাচ্ছিল বলে জানান রুহুল কুদ্দুস। ওই কণ্ঠে কান্নাকাটি করে তাকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করতে বলা হয়। প্রথমে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ছেলেকে রিমান্ডে নেয়া হবে এবং মাদক মামলায় জেলে পাঠানো হবে বলে ভয় দেখানো হয়। ছেলেকে বাঁচানোর আশায় এক লাখ টাকা পাঠান তিনি।
টাকা পাওয়ার পরও প্রতারণা থামেনি। তাকে বলা হয়, টাকা দিতে দেরি হওয়ায় সেখানে সাংবাদিকেরা জড়ো হয়েছেন। এরপর আরও এক লাখ টাকা দাবি করা হলে তিনি ৫০ হাজার টাকা পাঠান। পরে পরিবারের সদস্যরা তাঁর ছেলের স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানতে পারেন, আরিফুজ্জামান স্বাভাবিকভাবেই আছেন এবং আটক হননি। এরই মধ্যে প্রতারকদের হাতে চলে যায় দেড় লাখ টাকা।
শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য ঠিক কোন উৎস থেকে প্রতারকদের হাতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, তথ্যভাণ্ডার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কিংবা পরিচিতজনের মাধ্যমে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। কোনো নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ীয় তথ্যভাণ্ডার থেকে তথ্য ফাঁস হয়েছে এমন প্রমাণও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে সাতক্ষীরা সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন রুহুল কুদ্দুস। সাতক্ষীরা সদর থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-পরিদর্শক (এসআই) সৈকত জানান, প্রতারণার অভিযোগে একটি জিডি হয়েছে। তবে জিডিতে টাকা কখন ও কোথা থেকে পাঠানো হয়েছে—এমন কিছু প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। এসব তথ্য পাওয়া গেলে তদন্ত শুরু করা হবে।
তিনি বলেন, এ ধরনের প্রতারণায় অনেক সময় অন্য ব্যক্তির পরিচয়পত্র ব্যবহার করে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করা হয়। ফলে ব্যবহৃত নম্বরের প্রকৃত ব্যবহারকারী শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। টাকা একবার প্রতারকদের হাতে চলে গেলে তা উদ্ধার করাও সবসময় সম্ভব হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের বলেন, গত কয়েক মাসে এ ধরনের প্রতারণার ঘটনা বাড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর পরিবারের কাছে পুলিশ বা ডিবি পরিচয়ে ফোন করে তাঁদের সন্তানকে আটক করার কথা জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এ ধরনের কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। আমরা শিক্ষার্থীদের সতর্ক করছি কোনো পরিচয়েই কেউ ফোন করে টাকা চাইলে আগে টাকা পাঠাবেন না। পরিবারের সদস্যদেরও বিষয়টি জানিয়ে রাখবেন। প্রয়োজনে ডাকসুর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।
তবে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য ঠিক কোন উৎস থেকে প্রতারকদের হাতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, তথ্যভাণ্ডার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কিংবা পরিচিতজনের মাধ্যমে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। কোনো নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ীয় তথ্যভাণ্ডার থেকে তথ্য ফাঁস হয়েছে এমন প্রমাণও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর মো. ইসরাফিল রতন বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এ ধরনের প্রতারণার বেশ কয়েকটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন করে শিক্ষার্থীদের পরিবারের সঙ্গে প্রতারণার চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যখন ক্লাসে, টিউশনে কিংবা ঘুমিয়ে থাকে, তখন তাদের পরিবারের কাছে ফোন দিয়ে কখনো ডিবি, কখনো পুলিশ পরিচয়ে বলা হচ্ছে, আপনার ছেলেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কিংবা তার কাছে কোনো অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু পাওয়া গেছে। এরপর বিভিন্নভাবে টাকা হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কয়েক দিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকও এ ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে জানান তিনি। এমনকি প্রক্টোরিয়াল টিমের প্রধানকেও একইভাবে ফোন করা হয়েছে।
বিষয়টি পুলিশকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা পুলিশকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। কীভাবে এই সমস্যারোধ করা যায়, সেটি এখন ভাবনার বিষয়। এর করণীয় নির্ধারণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব করছি।