রাকসু ভবন © সংগৃহীত
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) প্রথম অধিবেশনে এক বছরের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে রাকসুর ভিপি, জিএস, এজিএস ও বিভিন্ন সম্পাদকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে এ পর্যন্ত প্রায় ৬৪ লাখ টাকা খরচ করেছেন রাকসু নেতৃবৃন্দ।
রাকসুর সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর বরাদ্দ ও ব্যয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন পদ ও বিভাগের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের একটি অংশের কার্যক্রম ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। অন্যদিকে কয়েকটি খাতে কার্যক্রম চলমান থাকায় কিছু অর্থের ভাউচার এখনো জমা দেওয়া হয়নি। ফলে উত্তোলিত অর্থের পুরোটা ব্যয় হয়েছে—এমনটি নয়; সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৬৪ লাখ টাকা।
সম্প্রতি ‘রাকসুর সোয়া কোটি টাকা ও আম্মারদের ভাউচার সংকট’ শিরোনামে একটি নিউজ প্রকাশিত হয় একটি গণমাধ্যমে। যার ফলে এ নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, রাকসুর তহবিল থেকে মোট ১ কোটি ২৯ লাখ ১৪ হাজার ৬৮৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬১ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৬ টাকার বিল-ভাউচার জমা দেওয়া হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার সংগঠনের তহবিল থেকে প্রায় ২৪ লাখ টাকা নিয়েছেন বলে দাবি করা হয়। এর মধ্যে তিনি ৫ লাখ ৪৯ হাজার টাকার বিল-ভাউচার জমা দিয়েছেন এবং প্রায় ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকার খরচের ভাউচার জমা দেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, রাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ তহবিল থেকে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে তিনি ৯৯ হাজার ৯২৪ টাকার ভাউচার জমা দিয়েছেন বলে দাবি করা হয়। একই সঙ্গে হিসাব না দেওয়ার তালিকায় এজিএসসহ আরও আটজন সম্পাদক রয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে রাকসুর কোষাধ্যক্ষের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাকসুর প্রথম অধিবেশনে ১ বছরের জন্য ১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে এখন পর্যন্ত রাকসু ভিপি, জিএসসহ অন্যান্য সম্পাদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে ৯১ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। যার মধ্যে এ পর্যন্ত ৬৪ লাখের মতো খরচ করেছেন তারা।
রাকসু কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ভিপির দাপ্তরিক খাতে বরাদ্দ ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং একই পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। ভিপির সামগ্রিক খাতে বরাদ্দ ৯ লাখ ৯০ হাজার ৩২৪ টাকা এবং উত্তোলনও হয়েছে ৯ লাখ ৯০ হাজার ৩২৪ টাকা। সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এর অর্ধেক অর্থের ভাউচার জমা হয়েছে এবং বাকি অর্থের কাজ চলমান রয়েছে।
জিএসের দাপ্তরিক খাতে বরাদ্দ ও উত্তোলন করা হয়েছে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা। জিএসের সামগ্রিক খাতে বরাদ্দ ও উত্তোলন হয়েছে ৯ লাখ ২৭ হাজার টাকা। এ ছাড়া এজিএস খাতে ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ ও উত্তোলন করা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
রাকসুর ক্রীড়া বিভাগে বরাদ্দ ১৬ লাখ ৪২ হাজার ৬১০ টাকা হলেও উত্তোলন করা হয়েছে ৭ লাখ ৫৩ হাজার ৩৭০ টাকা। নথিতে বলা হয়েছে, কার্যক্রম চলমান থাকায় বাকি অর্থের ভাউচার জমা হয়নি।
বিতর্ক ও সাহিত্য বিভাগে বরাদ্দ ১২ লাখ ৫০ হাজার ৭৬৫ টাকা এবং উত্তোলন করা হয়েছে ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭৬৫ টাকা। নথি অনুযায়ী, কার্যক্রম চলমান থাকায় বাকি অর্থের ভাউচার জমা হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং শেষ হওয়া কাজের উদ্বৃত্ত অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে।
সংস্কৃতি বিভাগে বরাদ্দ করা হয়েছে ১১ লাখ ৫ হাজার টাকা, যার মধ্যে ১০ লাখ ৮০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এ খাতেও জমা ও উদ্বৃত্ত অর্থ ফেরতের কথা নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
মহিলা বিভাগে বরাদ্দ ও উত্তোলন করা হয়েছে ৩ লাখ ৫৩ হাজার ২৭৬ টাকা। তথ্য ও গবেষণা বিভাগে বরাদ্দ ৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকা হলেও উত্তোলন করা হয়েছে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। সংশ্লিষ্ট নথিতে কার্যক্রম চলমান এবং শেষ হওয়া কার্যক্রমের উদ্বৃত্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগে বরাদ্দ ও উত্তোলন ২ লাখ ৭ হাজার টাকা, মিডিয়া ও প্রকাশনা বিভাগে বরাদ্দ ৮ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪৮ টাকা এবং উত্তোলন ২ লাখ ৮ হাজার ৪৪৮ টাকা, পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ বিভাগে বরাদ্দ ও উত্তোলন ৮২ হাজার টাকা এবং কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ে বরাদ্দ ও উত্তোলন ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
রাকসু নেতৃবৃন্দের দাবি, বিভিন্ন কর্মসূচি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের জন্য অনুমোদিত অর্থ একবারে সম্পূর্ণ ব্যয় না হয়ে অনেক ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে ব্যয় হয়। কোনো কোনো কর্মসূচির কাজ চলমান থাকায় সংশ্লিষ্ট ভাউচার পরবর্তী সময়ে জমা দেওয়ার সুযোগ থাকে। আবার কাজ শেষে অব্যয়িত অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে উত্তোলিত অর্থের পুরোটা ব্যয় হয়েছে বা পুরোটা ব্যক্তিগতভাবে নেওয়া হয়েছে—এমন ধারণা করা সঠিক নয় বলে তারা দাবি করেন।
এ বিষয়ে রাকসুর নেতৃবৃন্দ গতকাল সংবাদ সম্মেলনে তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরেন। তারা বলেন, রাকসুর আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে তাদের কোনো আপত্তি নেই। বরং সংশ্লিষ্ট নথি ও অনুমোদনের ভিত্তিতে হিসাব যাচাই করা হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।
এ বিষয়ে রাকসু এজিএস সালমান সাব্বির বলেন, গত ১০ মাসে আমি শুধুমাত্র একবারই টাকা উত্তোলন করেছি; মাত্র ৬০ হাজার টাকা। রাকসুর অধিবেশনে আমার দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এই অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এই টাকা অফিস পরিচালনা ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজেই ব্যয় করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যেহেতু পুরো অর্থ এখনো খরচ হয়নি, তাই ভাউচার জমা দেওয়া হয়নি। আমার দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এই অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব ও প্রয়োজনীয় ভাউচার রাকসু অফিসে যথাযথভাবে জমা দেওয়া হবে। দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়ে আমি বরাবরই সচেতন।
রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ৮ লক্ষ টাকার এখতিয়ার থাকলেও উত্তোলন করেছি ৩ লক্ষ ৭০হাজার টাকা। যার ১ টাকারও ভাউচার আমার ২মাস আগে থেকে জমা দেওয়া। মানে ভাউচার সমন্বয় করিনি এটাও ভুল তথ্য। রাকসুর ৯০% ভাউচার সমন্বয় করা। পূর্বের ভাউচার সমন্বয় না করলে পরের বাজেট কোনো সম্পাদক বা ভিপি, জিএস কেউ পাবেওনা নিয়ম অনুযায়ী।
প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শব্দ সন্ত্রাসী করেছে তারা। যখন কোনো অ্যামাউন্টের কথা আসে তখন তার প্রোপার কাগজপত্র দেখে বলতে হয় কিন্তু সেটা তারা বলে নাই। এটা নিয়ে আমরা কাজ করব। তাদেরকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠাব।
রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, আমাদের নামে এত বড় একটি মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর কারণে আমরা ব্যাপকভাবে মানহানির শিকার হয়েছি। আমাদের পরিবারের সদস্যরাও হেয় হয়েছেন এবং সামাজিকভাবে আমাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ ধরনের অপপ্রচারের মাধ্যমে আমাদের মানসিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে।
আমরা আমাদের জায়গা থেকে সৎ, শক্ত ও দৃঢ় ছিলাম। কিন্তু আমাদের পরিবার ও সামাজিক অবস্থানের ওপর যে প্রভাব পড়েছে, তা আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক। এভাবে মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে কাউকে হেয়প্রতিপন্ন করা, মর্যাদাহানি করা এবং অপেশাদার আচরণের মাধ্যমে কারও নামে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে তাকে দোষী প্রমাণের চেষ্টা করা—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।
রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান বলেন, যে নিউজটা প্রকাশিত হয়েছে সেটা সম্পূর্ণ ভুল। প্রথম অধিবেশনে রাকসুর জন্য ১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে রাকসু ভিপি, জিএসসহ আরো সম্পাদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৯১ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে যার মধ্যে এ পর্যন্ত ৬৪ লাখের মতো খরচ করেছে তারা।
ভাউচার জমা দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, পূর্বের কাজের ভাউচার জমা না দিলে পরবর্তীতে তাকে টাকা দেওয়া হয়নি। তবে কিছু কাজ যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে চলবে সেগুলোর ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়েছে। চলমান কাজ শেষ হলে তারা ভাউচার দিবেন।