জাবির ফজিলাতুন্নেছা হল সংসদের ভিপি ঐশী সরকার © টিডিসি ফটো
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) চারুকলা বিভাগের ৪৯তম আবর্তনের শিক্ষার্থী ও ফজিলাতুন্নেছা হল সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) ঐশী সরকারের বিরুদ্ধে একটি বাণিজ্যিক ক্যাম্পেইনের ৬০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত ভেন্যু ফি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নগদে গ্রহণ করলেও সেই অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে জমা না দিয়ে পরে প্রশাসনের মাধ্যমে একই ফি মওকুফ করিয়ে নেন তিনি।
জানা যায়, ইস্পাহানি গ্রুপের পানীয় ব্র্যান্ড ‘ইসপি’র ‘ইস্পি জুস কার্ট ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পেইন-২৬’ পরিচালনার জন্য বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান এঢাপ কমিউনিকেশনস-এর পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আবেদন করেন ফজিলাতুন্নেছা হল সংসদের ভিপি ঐশী সরকার।
আবেদনের প্রেক্ষিতে ১৪ থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত মোট ছয় দিনের জন্য প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকায় ক্যাম্পেইন পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়। অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর করেন ডেপুটি রেজিস্ট্রার (সাধারণ প্রশাসন) মাহতাব-উজ-জাহিদ।
শিক্ষার্থীরা এ ধরনের বাণিজ্যিক ক্যাম্পেইনের জন্য আবেদন করতে পারেন কি-না, জানতে চাইলে মাহতাব-উজ-জাহিদ বলেন, এ বিষয়ে আমার ঠিক জানা নেই।
তবে ডেপুটি রেজিস্ট্রার (সাধারণ প্রশাসন) শাহনাজ হোসেন বলেন, এর আগেও বিভিন্ন ক্যাম্পেইনের জন্য শিক্ষার্থীরা আবেদন করেছেন। তাই এ ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ নেই। তবে একটি নির্দিষ্ট ফি নির্ধারণ করা আছে, যেটা ব্যাংকে জমা দিতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের নথি অনুযায়ী, আবেদনটি ক্যাম্পেইন শুরুর সাত কর্মদিবস আগে অনুমোদিত হওয়ায় প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা হিসেবে মোট ৬০ হাজার টাকা ভেন্যু ফি নির্ধারিত হয়। নিয়ম অনুযায়ী এ অর্থ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা অগ্রণী ব্যাংকের এলআর ফান্ডে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা জমা হয়নি।
ক্যাম্পেইনের দায়িত্বে থাকা বিজ্ঞাপনী সংস্থার মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধিরা দাবি করেছেন, তারা ৬০ হাজার টাকা সরাসরি ঐশী সরকারের হাতে তুলে দিয়েছেন।
এঢাপ কমিউনিকেশনের প্রোমোটার ও জাবি ক্যাম্পেইনের দায়িত্বপ্রাপ্ত জান্নাত বলেন, আমরা ৬০ হাজার টাকা ওই আপুর (ঐশী) কাছে অ্যাডভান্স দিয়েছি।
ব্যাংকে জমা না দিয়ে ব্যক্তির হাতে টাকা দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা আপুর কাছে টাকা জমা দিয়েছি। আমাদের যে ফি, সেটা তো দিতেই হবে। এখন সেই আপু কী করেছে, না করেছে, সেটা তার ব্যাপার।
এদিকে গত রবিবার (১৯ জুলাই) বটতলায় ক্যাম্পেইনের কার্ট থাকায় অন্য ব্যবসায়ীদের ব্যবসায় বিঘ্ন ঘটে এবং যানবাহন চলাচলেও সমস্যা সৃষ্টি হয়। বিষয়টি নিয়ে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে ক্যাম্পেইন সংশ্লিষ্টদের কথা কাটাকাটি হয়। পরে ওই শিক্ষার্থী বিষয়টি প্রক্টরকে জানালে নিরাপত্তা শাখার কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। এ সময় ঐশী সরকারও সেখানে উপস্থিত হয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিরাপত্তা শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, ঐশী সরকার দাবি করেছিলেন, প্রশাসনকে টাকা দিয়েই এখানে অনুমতি নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ক্যাম্পেইনের অনুমতির পাশাপাশি একই কার্যক্রমের ভেন্যু ফি মওকুফ চেয়ে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নজরুল ইসলামের কাছে পৃথক আবেদন করেন ঐশী সরকার।
রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, মূল অনুমতির আবেদন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় চললেও ফি মওকুফের আবেদনটি ঐশী সরকার সরাসরি উপ-উপাচার্যের কাছে নিয়ে যান। পরে সেই আবেদন অনুমোদন করা হয়।
জানা যায়, ইসপি কোম্পানি ক্যাম্পেইনের অনুমতির জন্য প্রথমে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তারা রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ঐশী সরকারের মাধ্যমে অনুমতির উদ্যোগ নেওয়া হয়। কারণ, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) একই সঙ্গে ফজিলাতুন্নেছা হলের প্রাধ্যক্ষ এবং ঐশী সরকার ওই হল সংসদের ভিপি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের ক্যাম্পেইনের অনুমোদনের সময় ক্ষেত্রবিশেষে বিভিন্ন দিক বিবেচনা করা হয়। আবেদন কিংবা নানা পরিপ্রেক্ষিতে ফি আংশিক বা সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়।
তিনি বলেন, ঐশী আমাকে জানিয়েছিল যে, সে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে চাকরি করে এবং অনুমোদন ফি মওকুফ হলে তার ক্যারিয়ারের জন্য তা সহায়ক হবে। শিক্ষার্থীর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই মূলত ফি মওকুফের অনুমোদন দিয়েছিলাম।
তবে পরবর্তীতে যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে, সে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে ফি-এর অর্থ নিজে গ্রহণ করেছে, তাহলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি যে অর্থ গ্রহণ করেছে বলে প্রমাণিত হবে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাগারে জমা দিতে হবে।
এ বিষয়ে ঐশীর সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
তবে ঐশী অভিযোগের বিষয়ে গণম্যাধমকে বলেন, এটা তো আমি আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করব না। প্রশাসন আমাকে অনুমতি দিয়েছে। কোম্পানির মাধ্যমে এখনো আমার কাজ চলছে। এ বিষয় নিয়ে হুট করে নাড়াচাড়া করার কারণ বুঝছি না।
এসময় তিনি ফি মওকুফের আবেদনের বিষয়টি স্বীকার করলেও ৬০ হাজার টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রাপ্য অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে জমা নেওয়া হবে।