ঢাবি অনিয়মের দ্বিতীয় পর্ব

রুটিন কাজকে ওভার টাইম, বিল উধাও—ঢাবি আইবিএতে ৩৩ কোটি টাকার অনিয়ম

১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫৪ PM , আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৫৩ PM
ঢাবি আইবিএ

ঢাবি আইবিএ © ফাইল ছবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে (আইবিএ) কর্মরতদের রুটিন কাজকে ওভারলোড দেখিয়ে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শুধু তাই নয়, লিফট মেরামত ও সাজসজ্জার নামে একাধিকবার অর্থ ব্যয় করা হলেও বিল গায়েব করার ঘটনাও ঘটেছে। এসব অনিয়মের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৩ কোটি ৫৭ লাখ ৭৭ হাজার ৩০২ টাকার অনিয়ম বা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

সম্প্রতি ঢাবির ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরের অডিট কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। নিরীক্ষায়  সাজানো কোটেশনে লিফট ও ভবন মেরামত, ওভারলোড কোর্সের নামে অর্থ বিতরণ, ব্যাংকে সঞ্চিত আয় বাজেটে না দেখানো, ওভারহেড চার্জ জমা না দেওয়া এবং ক্রয় সংক্রান্ত একাধিক অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে।

এসব আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাবির আইবিএর পরিচালক অধ্যাপক শাকিল হুদা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘যে সময়কার অডিট আপত্তি এসেছে, তখন আমি আইবিএতে ছিলাম না। ফলে অনিয়মগুলো কীভাবে সংগঠিত হয়েছে সেটি আমি বলতে পারছি না। তবে যেহেতু অডিট আপত্তি এসেছে, সেহেতু আমরা এর জবাব দিয়েছি। আমাদের জবাব পাওয়ার পর অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হবে কি না সে বিষয়ে অডিট অধিদপ্তর ভালো বলতে পারবে।

জানতে চাইলে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. কামরুল আলম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিট আপত্তিগুলো নিয়ে কাজ চলছে। পুরো কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’ 

শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইবিএর বিবিএ ও এমবিএ প্রোগ্রামের নিয়মিত পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, ইনভিজিলেশন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের মতো রুটিন একাডেমিক কাজের জন্য কোনো অনুমোদিত নীতিমালা ছাড়াই ২২ লাখ ৮০ হাজার ৭৮৭ টাকা সম্মানী দেওয়া হয়েছে। অথচ শিক্ষকদের ক্লাস নেওয়া, পরীক্ষা গ্রহণ, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়মিত দায়িত্বে অন্তর্ভুক্ত। জেনারেল ফিন্যান্সিয়াল রুলস (জিএফআর)-১০ ও ১১ অনুযায়ী সরকারি তহবিল ব্যয়ে আর্থিক শৃঙ্খলা ও মিতব্যয়িতা অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা পরিপালন করা হয়নি বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়।

‘যে সময়কার অডিট আপত্তি এসেছে, তখন আমি আইবিএতে ছিলাম না। ফলে অনিয়মগুলো কীভাবে সংগঠিত হয়েছে সেটি আমি বলতে পারছি না। তবে যেহেতু অডিট আপত্তি এসেছে, সেহেতু আমরা এর জবাব দিয়েছি। আমাদের জবাব পাওয়ার পর অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হবে কি না সে বিষয়ে অডিট অধিদপ্তর ভালো বলতে পারবে।-অধ্যাপক শাকিল হুদা, আইবিএ পরিচালক

আইবিএ’র এমবিএ ও বিবিএ স্প্রিং, ফল ও সেমিস্টার কোর্সে নিয়মিত শিক্ষকরা ওভারলোড কোর্স গ্রহণের নামে প্রতি কোর্সে ১ লাখ ১১ হাজার ১১১ টাকা হারে সম্মানী নিয়েছেন। এ খাতে মোট ব্যয় হয়েছে ৩৪ লাখ ৭ হাজার ৭৭৫ টাকা। নিরীক্ষায় দেখা যায়, নিয়মিত শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও কোন নীতিমালা বা মানদণ্ডের ভিত্তিতে ওভারলোড কোর্স নির্ধারণ করা হয়েছে, তার কোনো কাগজপত্র উপস্থাপন করা হয়নি। জিএফআর অনুযায়ী একে অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিরীক্ষায় দেখা যায়, আইবিএ ভবনে একটি নতুন লিফট স্থাপনের জন্য আরএফকিউ (RFQ) পদ্ধতিতে একই ঠিকাদারকে ভেঙে ভেঙে কার্যাদেশ দিয়ে ১৮ লাখ ৭১ হাজার ৭০৩ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এমবিএ ও বিবিএ প্রোগ্রামের অর্থ থেকে লিফট স্থাপনের জন্য একাধিক ধাপে বিল পরিশোধের তথ্য পাওয়া গেলেও প্রথম ও চতুর্থ ধাপের বিল নিরীক্ষাকে দেখানো হয়নি। ফলে লিফট স্থাপনে মোট কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায়নি। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন লিফট স্থাপনের ক্ষেত্রে আরএফকিউ নয়, ওপেন টেন্ডার মেথড (ওটিএম) অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক ছিল।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আইবিএ ভবনের ছাদ মেরামত কাজেও অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। একই ঠিকাদারকে একাধিকবার আরএফকিউ পদ্ধতিতে কার্যাদেশ দিয়ে ১৪ লাখ ৯৬ হাজার ১০০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। ছয় ধাপে কাজ দেখানো হলেও তিন ধাপের কোনো বিল-ভাউচার পাওয়া যায়নি। এছাড়া কাজের কোনো স্পেসিফিকেশন, দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্য বা প্রকৌশল অনুমোদনের নথিও নিরীক্ষাকে সরবরাহ করা হয়নি। পিপিএ-২০০৬ ও পিপিআর-২০০৮ অনুযায়ী এসব বাধ্যতামূলক হলেও তা মানা হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়।

সবচেয়ে বড় অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে আইবিএ কর্তৃক ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থ বাজেটে প্রদর্শন না করার বিষয়টি। নিরীক্ষায় দেখা যায়, আইবিএ’র বিভিন্ন ব্যাংকে সংরক্ষিত ১৫টি এফডিআর ও ব্যাংকের সমাপনী জের মিলিয়ে ২৬ কোটি ১৫ লাখ ৫৭ হাজার ৯৬৮ টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটে আয় হিসেবে দেখানো হয়নি। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২০২৪ সালের পরিপত্র অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আয় কেন্দ্রীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও আইবিএ তা অনুসরণ করেনি।

এছাড়া আইবিএ রিক্রুইটমেন্ট টেস্ট অ্যান্ড প্রজেক্ট এবং অন্যান্য কার্যক্রম থেকে ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ১৮ কোটি ৭৫ লাখ ৭৯ হাজার ২৯ টাকা আয় হলেও এর ওপর নির্ধারিত ৩০ শতাংশ ওভারহেড চার্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা দেওয়া হয়নি। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৫ কোটি ৬২ লাখ ৭৩ হাজার ৭০৮ টাকা। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত এবং ইউজিসির বাজেট ব্যবহারের নির্দেশনার লঙ্ঘন।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ক্রয় সংক্রান্ত আরেকটি অনিয়মে দেখা যায়, আইবিএ নির্ধারিত বাৎসরিক সীমা অতিক্রম করে কোটেশন (RFQ) পদ্ধতিতে ৫৪ লাখ ৮৯ হাজার ২৫১ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী বছরে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত এ পদ্ধতিতে ব্যয় করা গেলেও আইবিএ প্রায় ৮৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছে।

নিরীক্ষায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আইবিএতে ক্রয়কৃত ল্যাপটপ ও আসবাবপত্রের কোনো মজুদ রেজিস্টার, ডেডস্টক রেজিস্টার বা ফিক্সড অ্যাসেট রেজিস্টার সংরক্ষণ করা হয়নি। ১৮ জন শিক্ষকের জন্য কেনা ১৮টি ল্যাপটপের কোনো স্টক এন্ট্রি বা ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। এতে ৩৪ লাখ ১০ টাকা আর্থিক ক্ষতির দায় নির্ধারণ করা হয়েছে।

‘আমি স্পোকস পারসন না। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসিকে (প্রশাসন) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনিই আপনাদের সঙ্গে কথা বলবেন।’- ট্রেজারার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর জানিয়েছে, ধারাবাহিকভাবে জিএফআর, পিপিএ ও পিপিআর লঙ্ঘনের মাধ্যমে আইবিএতে আর্থিক শৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধানদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে তিনি লিখিত আবেদন করতে বলেন। বক্তব্য জানতে লিখিত আবেদনের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি স্পোকস পারসন না। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসিকে (প্রশাসন) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনিই আপনাদের সঙ্গে কথা বলবেন।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাবির প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

মাকে লাইফ ইন্সুরেন্স দিয়ে বলেছিল মুগ্ধ— ‘আমি কখনো মারা গেলে…
  • ২২ মার্চ ২০২৬
‘সালামি হিসেবে আট আনা পেলেই আমরা অনেক খুশি হয়ে যেতাম’
  • ২১ মার্চ ২০২৬
দাবি আদায়ে ঈদের দিনেই মাঠে নামলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ
  • ২১ মার্চ ২০২৬
ক্যাম্পাসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের ঈদ উপহার দিলো যবিপ্রবির …
  • ২১ মার্চ ২০২৬
হবিগঞ্জে ঈদের দিনে কাবাডি ম্যাচ ঘিরে আ.লীগ-বিএনপি মিলন মেলা
  • ২১ মার্চ ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন বন্ধে ব্রিকসের ‘জোরালো ভূমিকা’ চায় ত…
  • ২১ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence