অধ্যাপক ড. আসাদুজ্জামান © টিডিসি সম্পাদিত
দেশের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে ২০২৩ সালে হায়ার এডুকেশন অ্যাকসেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্প শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। চার হাজার ১৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) নিয়োগ নিয়ে শুরুতেই বিতর্কে জলঘোলা হয়। অবশেষে আড়াই বছর পর আওয়ামীপন্থী পিডি অধ্যাপক ড. আসাদুজ্জামানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
আজ সোমবার (২৬ অক্টোবর) আগারগাঁওয়ে কপিরাইট অফিস ভবনে হিট প্রকল্পের কার্যালয়ে বিদায়ী প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. আসাদুজ্জামানের কাছ থেকে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস (এমআইএস) বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রাকিবুল হক।
এর আগে গত ১৯ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক অফিস আদেশে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না দেওয়া পর্যন্ত অধ্যাপক ড. মো. রাকিবুল হককে প্রেষণে এ দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই আদেশে অধ্যাপক ড. আসাদুজ্জামানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: হিট প্রকল্প পরিচালক আসাদুজ্জামানের নিয়োগ স্থগিত
পাঁচ বছর মেয়াদি হিট প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের জুলাইয়ে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৫০ দশমিক ৯৬ শতাংশ অর্থায়ন করবে বাংলাদেশ সরকার এবং বাকি ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ দেবে বিশ্বব্যাংক।
কে ছিলেন এই আওয়ামীপন্থী পিডি?
২০২৪ সালে হিট প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) নিয়োগ পরীক্ষায় ৩২ প্রার্থীর মধ্যে প্রথম হয়েছিলেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মুহাম্মদ সোলায়মান। পরে ওই বছরের ১৪ মার্চ ইউজিসি তাকে নিয়োগ দেয়। কিন্তু ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের মৌখিক নির্দেশে মাত্র এক দিনের মাথায় তার নিয়োগ বাতিল করে মন্ত্রণালয়।
আরও পড়ুন: অন্তর্বর্তী সরকারকালীন ইউজিসি: সমালোচনার শীর্ষে ছিল ৪ হাজার কোটি টাকার ‘হিট প্রজেক্ট’
পরে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) আওয়ামী লীগপন্থী অধ্যাপক আসাদুজ্জামানকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। পিডি হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের আড়াই বছরে ‘জলঘোলা’ কম হয়নি।
লিখিত পরীক্ষায় প্রথম হয়েও নিয়োগ পাননি ড. সোলায়মান
হিট প্রকল্পের পরিচালক নিয়োগের জন্য অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় ৩২ জন প্রার্থীর মধ্যে প্রথম হয়েছিলেন শেকৃবির অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মুহাম্মদ সোলায়মান। তাকে নিয়োগ দেওয়ার একদিনের মাথায় সেই নিয়োগ বাতিল করে চুয়েটের অধ্যাপক আসাদুজ্জামানকে প্রকল্প পরিচালক করা হয়। এ ঘটনায় নিয়োগপ্রক্রিয়ায় মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
অধ্যাপক সোলায়মানকে বাদ দিয়ে আসাদুজ্জামানকে নিয়োগ দেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করেছে বলে অভিযোগ করেছিলেন ভুক্তভোগী এই শিক্ষক। তার অভিযোগ ছিল, ‘তিনি বিএনপি-সংশ্লিষ্ট সাদা দলের সঙ্গে যুক্ত এবং বিএনপির সময়ে নিয়োগ পেয়েছিলেন বলে তার নিয়োগ বাতিল করা হয়।’
অন্যদিকে, আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে তাকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।
পিডি নিয়োগ নিয়ে গড়ায় আদালত পর্যন্ত
নিয়োগ নিয়ে বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। অধ্যাপক সোলায়মানের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগ হিট প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে অধ্যাপক আসাদুজ্জামানের নিয়োগ স্থগিতের আদেশ দেন।
নিয়োগ স্থগিতের ওই আদেশের পরও প্রকল্পটির পরিচালকের দায়িত্বে থাকা আসাদুজ্জামানকে এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন আদেশে অব্যাহতি দেওয়া হলো। তার স্থলে অধ্যাপক রাকিবুল হককে প্রেষণে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে নতুন আদেশে আসাদুজ্জামানকে অব্যাহতি দেওয়ার কারণ বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি।
আরও পড়ুন: হিট প্রকল্প থেকে ছিটকে পড়া কয়েকজন আপিল ছাড়াই ফের প্রেজেন্টেশনের সুযোগ পাচ্ছেন
হিট প্রকল্পটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি উন্নয়ন প্রকল্প, যা বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং উচ্চশিক্ষার আধুনিকীকরণ কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করা।
উচ্চশিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন ও রূপান্তরের লক্ষ্যে পরিচালিত হিট প্রকল্পের শীর্ষ পদে নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের পর পরিচালক পরিবর্তনের ঘটনায় নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে। পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত অধ্যাপক রাকিবুল হক এ দায়িত্ব পালন করবেন।
অন্তর্বর্তী সরকার পিডি সরাতে পারেনি কেন?
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর নানান সময় পিডি অধ্যাপক ড. আসাদুজ্জামানকে সরিয়ে দিতে দাবি তোলা হয়েছিল। তবে সেই সময় ইউজিসির প্রভাবশালী এক সদস্যের কারণে তাকে সরানো যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এমনকি ২০২৫ সালের আগস্টে হিট প্রকল্পে ভয়াবহ স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ করেছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) একদল শিক্ষক। তারা সংবাদ সম্মেলন করে তিনটি দাবিও উত্থাপন করেছিলেন। তখন প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. আসাদুজ্জামানকেও জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসার দাবি করেছিলেন তারা।