ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন © সংগৃহীত
দেশের কোথায়, কোন বিষয়ে এবং কী ধরনের গবেষণা হয়েছে, বর্তমানে কী গবেষণা প্রয়োজন এবং গবেষণার ফলাফল কীভাবে বাস্তবে কাজে লাগানো যায় এসব তথ্য এক জায়গায় সংরক্ষণে সমন্বিত গবেষণা রিপোজিটরি গড়ে তুলছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। এর মাধ্যমে গবেষণার পুনরাবৃত্তি কমানোর পাশাপাশি প্রয়োজনভিত্তিক গবেষণায় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে বলে জানিয়েছেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ।
আজ মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) ২৩তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বাজেটে গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ রয়েছে। তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের গবেষণা কার্যক্রম এবং অর্থ বরাদ্দের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি গবেষণায় বরাদ্দ অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
এই সমন্বয়হীনতা দূর করতে একটি সমন্বিত গবেষণা রিপোজিটরি গড়ে তোলার উদ্যোগ ইউজিসি নিয়েছে জানিয়ে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, দেশের কোথায়, কোন বিষয়ে এবং কী ধরনের গবেষণা প্রয়োজন, কোথায় কী ধরনের গবেষণা হয়েছে এবং গবেষণার ফলাফল কীভাবে বাস্তবে প্রয়োগ করা যেতে পারে এসব তথ্য এই রিপোজিটরিতে সংরক্ষণ করা হবে। এর মাধ্যমে গবেষণার পুনরাবৃত্তি কমানোর পাশাপাশি প্রয়োজনভিত্তিক গবেষণায় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
সমন্বিত এই গবেষণা তথ্যভান্ডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য বিশেষভাবে কার্যকর হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণার মাধ্যমে কার্যকর ও টেকসই সমাধান দিতে পারবে। গবেষণার ফলাফল যাতে শুধু গবেষণাপত্রে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাস্তব প্রয়োজনে কাজে লাগে, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
গবেষণা শুধু প্রকাশনা, সাইটেশন কিংবা ব্যক্তিগত গবেষণা-প্রোফাইল সমৃদ্ধ করার জন্য নয় উল্লেখ করে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, গবেষণার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন এবং দেশের বাস্তব সমস্যার সমাধান। দেশের ছোট-বড় সমস্যা চিহ্নিত করে গবেষণার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকদের এগিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইউজিসির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।
রুয়েটে গবেষণার সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি ওঠার বিষয়টির প্রশংসা করে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানোর দাবি বেশি শোনা যায়। কিন্তু রুয়েটে গবেষণার পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। গবেষণাগার স্থাপন, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন এবং গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণে ইউজিসি সহযোগিতা করবে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু শিক্ষার্থীদের সনদ দেওয়া নয়। তাদের জ্ঞান ও দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করে দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও একাডেমিক পরিবেশের সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও দায়িত্বশীল সম্পর্কেরও গভীর যোগসূত্র রয়েছে।
অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন বলতে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নকে বোঝায় না। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকদের জন্য পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও গবেষণাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একই সঙ্গে ‘ক্লিন ক্যাম্পাস’ ও ‘গ্রিন ক্যাম্পাস’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। রুয়েটের শান্ত ও সবুজ পরিবেশের কথা উল্লেখ করে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ক্যাম্পাসকে আরও পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি তুলে ধরে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্পর্ক ভালো ছিল, সেসব প্রতিষ্ঠানে তুলনামূলক দ্রুত একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তিপূর্ণ ও অনুকূল শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।
প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তির মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য কমানো এবং দেশের বাস্তব সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, শুধু জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করলেই হবে না; উচ্চ নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে উঠতে হবে। প্রযুক্তির জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে।
সভায় রুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুর রাজ্জাকের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য দেন রুয়েটের ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. রবিউল ইসলাম সরকার। এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন রুয়েটের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেন, মেকানিক্যাল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. নুরুল ইসলাম, সিভিল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. কামরুজ্জামান, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. বশির আহমেদ এবং অ্যাপ্লাইড সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আব্দুল কাদের জিলানী। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের প্রধান, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।