ড. সুপ্রিয় চাকমা, ড. নিখিল চাকমা ও ড. তানজিম মাহমুদ © টিডিসি সম্পাদিত
রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবিপ্রবি) বিধি লঙ্ঘন করে ২০১৯ সালে তিনজনকে সহাকরী অধ্যাপক পদে নিয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রায় ৭ বছর চাকরিতে থাকা এসব শিক্ষকের দুজনই এখন সহযোগী অধ্যাপক পদে রয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর পত্রিকায় বিভিন্ন বিভাগের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) এবং ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস বিভাগে সরাসরি সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ হয়।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আবেদনের যোগ্যতায় সিএসই বিভাগের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে উভয় পরীক্ষায় ন্যূনতম জিপিএ ৪.৫০ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষাগত অভিজ্ঞতার শর্ত আরোপ করা হয়েছিল। আর ফরেস্ট্রির জন্য সর্বোচ্চ ৩৫ বছর বয়স, শিক্ষাজীবনে তিনটি প্রথম বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার শর্ত আরোপ করা হয়। কিন্তু এই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া তিন সহকারী অধ্যাপকের ক্ষেত্রেই এই বিধি অনুসরণ করা হয়নি। ২০২০ সালের ১৯ মার্চ এই তিন সহকারী অধ্যাপক রাবিপ্রবিতে যোগদান করেন।
তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট নিয়োগে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে ন্যূনতম জিপিএ ৪.৫০ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার শর্ত শর্ত থাকলেও সিএসই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে যোগ দেওয়া তানজিম মাহমুদের মাধ্যমিকে জিপিএ ছিল ৩.৫০। আর উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ ছিল আরও কম, ৩.৪০।
এদিকে ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করা ড. সুপ্রিয় চাকমার যোগদানের সময় বয়স ছিল ৪৩ বছরের বেশি। অথচ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, তার পদের জন্য সর্বোচ্চ বয়স ৩৫ বছর। একই সাথে শিক্ষাজীবনে তিনটি প্রথম বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার শর্ত থাকার কথা বলা হলেও সুপ্রিয় চাকমার উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতকে (সম্মানে) দ্বিতীয় বিভাগ অর্জন করেন। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পূর্বে শিক্ষকতার কোনো অভিজ্ঞতাও ছিল না সুপ্রিয় চাকমার।
একই বিভাগে সহকারী অধ্যাপক পদে যোগ দিয়ে বর্তমানে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাওয়া ড. নিখিল চাকমারও যোগদানের সময় বয়স বেশি পাওয়া গেছে। ওই সময়ে তার বয়স ছিল ৩৫ বছর ১০ মাস। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তারও শিক্ষকতার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট পদের জন্য স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর উভয় পর্যায়ে ন্যূনতম সিজিপিএ ৩.৫০-এর শর্ত আরোপ করা হলেও স্নাতকে (সম্মান) নিখিলের সিজিপিএ ছিল ৩.০০। আর স্নাতকোত্তর পর্যায়ে তিনি সিজিপিএ অর্জন করেন ৩.০৯।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ড. নিখিল চাকমা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমাদের সার্কুলারে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা ছিল। যারা পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দা, তাদের জন্য বিজ্ঞপ্তিতে আলাদা সুবিধা বা শর্তের বিধান রাখা হয়েছিল।’
বিজ্ঞপ্তি যাচাই করে দেখা গেছে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্তাবলী অংশে ১০ নম্বর শর্তে উল্লেখ করা হয়েছে, পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসী এবং বিভাগীয়/অভ্যন্তরীণ প্রার্থীর ক্ষেত্রে বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিলযোগ্য।
একই শর্তের কথা জানালেন ড. সুপ্রিয় চাকমাও। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, ‘পিএইচডি এবং স্থানীয় প্রার্থীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা শিথিল করা ছিল। এর আগের দুই ভিসিও করে গেছে এই জিনিসটা। ওনারা স্যাটিসফাইড ছিল। এসব ফাইল অনেকবার তদন্ত হয়েছে। আর এটা তো আমার বিষয় না, এটা বোর্ডের সিদ্ধান্ত। আমি বিধি মেনে আবেদন করেছি।’
তিনি বলেন, ‘ইন্টারভিউ বোর্ডে আমাকে বলছিল যে, আপনার তো ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর অভিজ্ঞতা নাই। আমি বলছিলাম সরাসরি আমাদের ইউনিভার্সিটিতে অভিজ্ঞতা নাই, কিন্তু আমার ব্যাকগ্রাউন্ড—আমি তো ইউনিভার্সিটি টিচার্সদেরও ট্রেনিং দিই, ইউনিভার্সিটি টিচার্সদেরও কোর্স পড়িয়েছি। তো ওই বোর্ড স্যাটিসফাইড হয়েছে।’
ড. তানজিম মাহমুদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমি সরকারি বিধি-বিধান এবং যে বিদ্যমান নীতিমালা ছিল, সেই অনুযায়ীই আবেদন করেছি এবং সবকিছু সেভাবেই হয়েছে। আপনাদের যদি এ বিষয়ে আরও অধিকতর কোনো তথ্য জানার থাকে, তবে কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বললে সবচেয়ে ভালো হয়। আর যে অভিযোগটির কথা বলা হচ্ছে, কীভাবে এসেছে জানি না; তবে এটি এক ধরণের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে আমি মনে করি।’
এদিকে স্থানীয় প্রার্থীদের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও বয়স শিথিলের কথা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ থাকলেও পিএইচডিধারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে কোনো যোগ্যতা শিথিলের তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া যোগ্যতা শিথিলের নিয়ম অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের অনুমোদনের প্রয়োজন হলেও তা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া কতটুকু যোগ্যতা শিথিল করা যাবে, তারও কোনো স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এসব শিক্ষকের নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শর্ত বা যোগ্যতা শিথিলের কথা বলা হলেও বিধি অনুযায়ী এগুলো পাস করা হয়নি। সিন্ডিকেটে এসব অনুমোদন করানোর কোনো ডকুমেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে নেই। ওই সময় যে প্রশাসন ছিল, তারা নিজেদের লোক নিয়োগ দিতে নিজের মতো করে এসব নিয়ম তৈরি করেছে।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে এসব নিয়োগের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক ড. প্রদানেন্দু বিকাশ চাকমা। ২০১৫ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে রাবিপ্রবির উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০২২ সালের ১৭ আগস্ট ৭০ বছর বয়সে তিনি পরলোকগমণ করেন।
নিয়োগের সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার পর অনেক বিশ্ববিদ্যলয়েই এ ধরনের সমস্যা হয়েছে। অনেক রিমোট ইউনিভার্সিটিতে যোগ্যতা বা সিজিপিএ যতটুকু চাওয়া হয় তা পাওয়া যায়নি। তখনকার ভিসি মহোদয় বা প্রশাসন বলতে পারবেন কীভাবে ওনাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আমরা ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি করেছি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হওয়ার পর আমরা এ বিষয়ে কথা বলতে পারব।’