বায়োইনফরমেটিক্সে দক্ষতা গড়ে দিচ্ছে নোবিপ্রবির প্রাক্তন শিক্ষার্থীর ‘বায়োল্যাব’ © সংগৃহীত
২০২২ সালের শেষে কয়েকজন তরুণ গবেষককে সঙ্গে নিয়ে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) প্রাক্তন শিক্ষার্থী নইমুল হাসান সিদ্দিকী শুরু করেন গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘বায়োল্যাব’। বায়োইনফরমেটিক্স ও ডেটা অ্যানালাইসিসভিত্তিক গবেষণাকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসাই ছিল প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য। প্রায় চার বছরের পথচলায় গবেষণা প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা, গবেষণা প্রকল্প এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিতেও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
এখন পর্যন্ত বায়োল্যাবের তত্ত্বাবধানে ২৮টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি কিউ-ওয়ান (Q1), ১৪টি কিউ-টু (Q2) এবং ৩টি কিউ-থ্রি (Q3) জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া আরও ২২টি গবেষণাপত্র বর্তমানে সাবমিশন প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং ১৪টি গবেষণাপত্রের কাজ চলমান। নইমুল হাসান সিদ্দিকীর দাবি, বর্তমানে ১৯১টি গবেষণাপত্রে তাঁর নাম লেখক হিসেবে রয়েছে। পাশাপাশি নোবিপ্রবিসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮২ জন শিক্ষক-শিক্ষার্থী বায়োল্যাবের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন।
গবেষণাভিত্তিক প্রশিক্ষণ
নইমুল হাসান সিদ্দিকী জানান, প্রতিষ্ঠার পর থেকে বায়োল্যাব এখন পর্যন্ত ১৩টি কোর্স পরিচালনা করেছে। এসব কোর্সের মাধ্যমে শিক্ষার্থী, গবেষক ও শিক্ষকদের বায়োইনফরমেটিক্সভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি গবেষণার বিভিন্ন বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ড্রাগ ডিজাইন ও মলিকুলার ডিজাইনিং বিষয়ে ছয় মাস মেয়াদি দুটি ইন্টার্নশিপও নিয়মিত পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, অনেকের ধারণা গবেষণা করতে হলে ব্যয়বহুল ল্যাব দরকার। কিন্তু বায়োইনফরমেটিক্সে বিশ্বের বিভিন্ন ডেটাবেজে বিপুল পরিমাণ গবেষণা তথ্য উন্মুক্ত থাকে। প্রয়োজন শুধু সেগুলো বিশ্লেষণের দক্ষতা। একটি কম্পিউটার ও প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার থাকলেই অনেক গবেষণা করা সম্ভব।
গবেষণা থেকে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি
গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার পথও সুগম করার চেষ্টা করছে বায়োল্যাব। নইমুল হাসান সিদ্দিকীর দাবি, গত তিন বছরে তাঁদের মাধ্যমে গবেষণার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ৫০০-এর বেশি শিক্ষার্থী বিভিন্ন দেশের স্কলারশিপ অর্জন করেছেন।
শুধু ২০২৬ সালেই ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ১৩ জন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন মর্যাদাপূর্ণ ইরাসমাস মুন্ডুস স্কলারশিপ লাভ করেছেন।
চলমান ৫১ গবেষণা প্রকল্প
বর্তমানে বায়োল্যাবের অধীনে ৫১টি গবেষণা প্রকল্প চলমান রয়েছে। নইমুল হাসান সিদ্দিকীর পাশাপাশি নোবিপ্রবির প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বর্তমানে নটরডেম ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রভাষক আহমেদ আব্দুল্লাহ মাহাদীন কো-সুপারভাইজর হিসেবে কাজ করছেন।
এছাড়া নোবিপ্রবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রাম (আইআইইউসি)-এর শিক্ষক ও গবেষকেরা বায়োল্যাবের বিভিন্ন কোর্সে প্রশিক্ষক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক সহায়তা
শুধু প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় সীমাবদ্ধ নয় বায়োল্যাব। প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন শিক্ষার্থী বর্তমানে রিসার্চ অফিসার হিসেবে কাজ করছেন। সম্মানীর মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের শিক্ষাজীবনের ব্যয় বহন করছেন।
এছাড়া আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে সম্পূর্ণ ফি মওকুফ, আংশিক ফি ছাড় এবং কিস্তিতে ফি পরিশোধের সুযোগ। ফলে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে যেন কোনো শিক্ষার্থী গবেষণা থেকে পিছিয়ে না পড়েন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
নোবিপ্রবিকে নিয়ে আক্ষেপ
নিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে কিছুটা আক্ষেপও রয়েছে নইমুল হাসান সিদ্দিকীর। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠান গবেষণা ও প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের সঙ্গে কাজ করেছে। কিন্তু নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা মেলা বা গবেষণাবিষয়ক বিভিন্ন আয়োজন হলেও আমাদের সঙ্গে কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করা হয়নি। সুযোগ পেলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারতাম।
তবে আক্ষেপের চেয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশাই বেশি তাঁর। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করার মাধ্যমে আমরা মূলত নোবিপ্রবিকেই প্রতিনিধিত্ব করছি। ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে আরও বড় পরিসরে গবেষণার পরিবেশ গড়ে তুলতে চাই।
রাজধানীতে আধুনিক ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা
বর্তমানে নোয়াখালী থেকে পরিচালিত হলেও ঢাকায় একটি শাখা চালুর প্রস্তুতি চলছে বায়োল্যাবের। সেখানে ইন-ভিট্রো ও ইন-ভিভো গবেষণার জন্য একটি আধুনিক ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
গবেষণাকে ব্যয়বহুল ও জটিল একটি বিষয় হিসেবে না দেখে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য সহজলভ্য করে তোলাই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বায়োইনফরমেটিক্স, গবেষণা প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিতে শিক্ষার্থীদের আরও বড় পরিসরে যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নোবিপ্রবির প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘বায়োল্যাব’।