চায়ের দোকানে কাজ, রিকশা চালিয়ে ভর্তি প্রস্তুতি নেওয়া কাউসার এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী © সংগৃহীত
কখনো চায়ের দোকানের কর্মচারী, কখনো কাঠমিস্ত্রির দোকানে দিনমজুর, আবার কখনো পেটের তাগিদে রিকশার প্যাডেলে পা রেখে জীবনের চাকা ঘোরানো এক কিশোর। কখনো রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে অন্যের জমিতে বর্গাচাষি হিসেবে ঘাম ঝরিয়েছে সে। অভাব-অনটনের কঠিন বাস্তবতায় জীবন তাকে বারবার থামিয়ে দিতে চাইলেও স্বপ্নপূরণের পথ থেকে এক মুহূর্তের জন্যও পিছু হটেনি সে। সব প্রতিকূলতাকে জয় করে শেষ পর্যন্ত সাফল্যের চূড়া স্পর্শ করেছে তিনি।
বলছিলাম নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের শিক্ষার্থী কাউসার আহমেদের কথা।
ময়মনসিংহের এক দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা কাউসারের। অল্প বয়সেই পরিবারের দারিদ্র্য তাকে কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। যে বয়সে অন্য শিশুরা বই-খাতা কিংবা খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সে বয়সে জীবিকার সন্ধানে কাউসারের হাতে উঠে আসে কাজের সরঞ্জাম। চায়ের দোকানে সামান্য পারিশ্রমিকে কাজ থেকে শুরু করে একটু বেশি আয়ের আশায় কাঠমিস্ত্রির দোকানে ভারী শ্রম দেওয়া; সবই করতে হয়েছে তাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংসারের খরচ আর নিজের পড়াশোনার দায়িত্ব কাঁধে চেপে বসলে সে রিকশার হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরে।
নিজের অতীতের এই কঠিন পথচলা নিয়ে কাউসার আহমেদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘জীবনে অনেক কাজ করেছি। চায়ের দোকানে কাজ করেছি, কাঠমিস্ত্রির দোকানে কাজ করেছি, মাটি কেটেছি, ধান কেটেছি, রাজমিস্ত্রির কাজ করেছি, টিউশনি করেছি, রিকশা চালিয়েছি। কোনো কাজকেই ছোট মনে হয়নি। কারণ তখন একটাই লক্ষ্য ছিল, নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানো।’
এইচএসসি পরীক্ষার পর যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে, তখন খরচের চাপ বাড়ে কয়েক গুণ। ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় এসে একদিকে কোচিং ও ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি, অন্যদিকে পরিবারের মুখে দু’মুঠো খাবার তুলে দিতে রিকশা চালানো। দুই বিপরীতমুখী চ্যালেঞ্জ একহাতে সামলেছে কাউসার।
স্মৃতিচারণ করে কাউসার বলেন, ‘ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় এসে রিকশা চালিয়েছি। একই সঙ্গে ভর্তি কোচিং করেছি। রিকশা চালিয়ে যে টাকা পেতাম, তা দিয়ে নিজের কোচিংয়ের খরচ চালিয়েছি, আবার বাড়িতেও টাকা দিয়েছি। তখন কষ্ট হতো, কিন্তু মনে হতো পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে হলে আমাকে এভাবেই করতে হবে।’
ক্লান্তির মাঝেও আত্মবিশ্বাসের গল্প শোনাতে গিয়ে কাউসার বলেন, ‘অনেক সময় কাজ করার পর পড়তে বসলে শরীর খুব ক্লান্ত থাকত। আবার কখনো পড়াশোনার জন্য কাজের সময় কমাতে হয়েছে। তখন পরিবারের চিন্তা থাকত। তারপরও মনে হতো, আমাকে পড়াশোনাটা শেষ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে। সেই স্বপ্নটাই আমাকে বারবার কাজ করার শক্তি দিয়েছে।’
তার এই হাড়ভাঙা পরিশ্রম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর স্বপ্নের প্রতি একাগ্রতার কাছে অবশেষে নতি স্বীকার করে সব প্রতিকূলতা। মেধার স্বাক্ষর রেখে সে সুযোগ পায় উপকূলীয় অক্সফোর্ড খ্যাত নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগে।
তবে সাফল্য ও আনন্দের সেই মুহূর্তেও ভাগ্য তার ওপর ছড়ায় বিষাদের ছায়া। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার কিছুদিন পরই কাউসার হারায় তার পরম ভালোবাসার জন্মদাত্রী মাকে। যে মা হয়তো সন্তানের এই সাফল্যের দিনে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন, সেই মা আজ নেই। বুকের ভেতর অসহনীয় শূন্যতা নিয়েই কাউসারকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে।
মায়ের স্মৃতি মনে করে আবেগাপ্লুত কাউসার বলেন, ‘মাকে হারানোর কষ্টটা সবচেয়ে বেশি। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, তখন মনে হয়েছিল মা খুব খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু তাকে বেশিদিন সেই আনন্দটা দিতে পারিনি। এখন কোনো ভালো কিছু হলে মাকে বলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু মা তো আর নেই।’
কাউসারের বাবা বেঁচে আছেন, কিন্তু কর্মক্ষম নন। ফলে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার পাশাপাশি পরিবারের পুরো ভার সামলানোর কঠিন দায়িত্ব আজও তার কাঁধেই।
অভাবকে যে কখনো লজ্জা মনে করেনি এবং হাজারও ঝড়ের মধ্যেও নিজের স্বপ্নকে মরতে দেয়নি, কাউসার আজ তাদের প্রতিনিধি। চায়ের দোকান আর রিকশার প্যাডেল থেকে নোবিপ্রবির ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বারান্দায় পৌঁছানোর এ পথ ছিলো কণ্টকাকীর্ণ। তাঁর এই অর্জন শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ নয়; এটি তার ঘাম, অশ্রু, ত্যাগ ও অদম্য সাহসের বিজয়ের গল্প।
ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে কাউসার দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘আমি চাই পড়াশোনা শেষ করে ভালো একটা অবস্থানে যেতে। নিজের পরিবারের দায়িত্ব নিতে। আমার মা যে স্বপ্ন দেখতেন, সেগুলো পূরণ করতে। আমি জানি, পথটা এখনো কঠিন। কিন্তু এতদূর যখন আসতে পেরেছি, সামনে আরও এগিয়ে যেতে চাই।’