ঢাবির ভর্তি পরীক্ষায় যে স্ট্র্যাটেজিতে পড়ে নবম হয়েছিলেন, একই প্রক্রিয়ায় এবার জজ হলেন শুভ

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৪ PM , আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪১ PM
  শুভ আহম্মেদ

শুভ আহম্মেদ © টিডিসি সম্পাদিত

‎​ময়মনসিংহের নেত্রকোণা জেলার হাওরবেষ্টিত উপজেলা খালিয়াজুরীর প্রত্যন্ত গ্রাম জগন্নাথপুর। গ্রামের চারপাশে জমে থাকে পানি ও গ্রামগুলো দেখতে দ্বীপের মতো। ট্রলার বা নৌকা ছাড়া নেই যোগাযোগের অন্য রাস্তা। এমন দুর্গম এলাকা থেকে উঠে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় নবম স্থান অর্জন করেছিলেন শুভ আহম্মেদ। এবার ভর্তি পরীক্ষা প্রস্তুতির সেই একই কৌশল অনুসরণ করে ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় ৮০তম হয়ে সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।  

বিজেএস পরীক্ষায় নিজের সাফল্য, জীবনসংগ্রাম, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ভবিষ্যতে যারা জজ হতে চায় তাদের জন্য কিছু টিপস নিয়ে তিনি মুখোমুখি হয়েছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের। তার কথাগুলো শুনেছেন— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মো. আরাফাত রহমান উদয়।

আপনাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আপনার শৈশব সম্পর্কে একটু জানতে চাই।
‎ধন্যবাদ। আমার শৈশব কেটেছে নেত্রকোণা জেলার হাওরবেষ্টিত উপজেলা খালিয়াজুরীর প্রত্যন্ত গ্রাম জগন্নাথপুরে। দশম শ্রেণি পর্যন্ত ওখানেই পড়াশোনা করেছি। এসএসসি পাসের পর ময়মনসিংহ শহরের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম কলেজে ভর্তি হই। আমাদের এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় শৈশবটা বেশ সংগ্রামেই কেটেছে। বছরে অন্তত ছয় মাস আমাদের পানিবন্দী অবস্থায় থাকতে হতো। তখন ট্রলার ছাড়া চলাফেরার আর কোনো উপায় ছিল না।  

বিজেএসের ফল প্রকাশের মুহূর্তের অনুভূতি কেমন ছিল? খবরটি প্রথম কাকে জানিয়েছিলেন?
‎আসলে মুহূর্তটা ছিলো আমার জীবনের সেরা একটা মুহূর্ত। প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। পরে এক বন্ধু রোজাল্টের স্ক্রিনশট দিয়ে নিশ্চিত করার পর আনন্দে ভাষা হারিয়ে ফেলি। সর্বপ্রথম আল্লাহর কাছে শুকরানা নামাজ আদায় করি। তারপর বাবা-মা ও মামাকে ফোন দিয়ে জানাই। সবাই আনন্দে কেঁদে দিয়েছিল। মুহূর্তটা অনেকটা ‘টুয়েলভথ ফেইল’ মুভির সেই আইকনিক দৃশ্যের মতোই ছিল।

জজ হওয়ার স্বপ্নটা কবে থেকে বুনছিলেন? স্বপ্নদ্রষ্টা কে ছিলেন?
‎সত্যি বলতে, আমাদের এলাকায় এমন কেউ ছিল না যাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে জজ হব। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তির পর যখন দেখলাম বিভাগের সিনিয়র ভাইরা জজ হচ্ছেন, তখন থেকেই জেদ চাপে- প্রথম জুডিশিয়ারিতেই আমাকে জজ হতে হবে। পাশাপাশি বাবা-মায়েরও একটা সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা ছিল এই পেশাকে ঘিরে।

হাওরের পানিবন্দী জীবন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে আজকের এই পর্যায়ে আসার যাত্রাটা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?
‎চ্যালেঞ্জিং তো ছিলই, কিন্তু হাওরের সন্তান বলে পিছিয়ে থাকব- এমনটা কখনো ভাবিনি। আমাদের  মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল গ্রামের মাঝখানে একটা পুকুরের ওপর। বর্ষায় বাঁশের সাঁকো পার হয়ে, বা কখনো হাঁটু পানি ভেঙে বিদ্যালয়ে যেতে হতো। ব্যাচে কম শিক্ষার্থী ছিল, কোনো বিজ্ঞান বিভাগও ছিল না। পঞ্চম-ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই আমার মধ্যে অন্যরকম এক জীবনবোধ কাজ করত। আমি ভাবতাম আমাকে পড়াশোনা দিয়েই জীবনে কিছু একটা করতে হবে। গ্রামের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আমিই প্রথম জিপিএ-৫ পেয়েছিলাম।

এই দীর্ঘ যাত্রায় পরিবারের আত্মত্যাগ বা অবদান কেমন ছিল?
সফলতার পেছনে পরিবারের আত্মত্যাগ অবশ্যই ছিলো। বাবা-মায়ের পাশাপাশি আমার সফলতার পেছনে বড় অবদান আমার মামার। পড়াশোনার ক্ষেত্রে তিনি আমাকে অনেক আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। আমি সবসময় চেষ্টা করেছি, মামার কষ্টার্জিত টাকাটা যেন বৃথা না যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর তাই অন্যকোনো দিকে সময় নষ্ট করিনি।

‎বিজেএস প্রস্তুতিকালীন আপনার পড়াশোনার স্ট্র্যাটেজি কেমন ছিল? দৈনিক কত ঘণ্টা পড়তেন বা কোনো বিশেষ রুটিন মেনে চলতেন কি?

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার সময় যে স্ট্র্যাটেজি অনুসরণ করেছিলাম, বিজেএস প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও আমি সেই একই কৌশল কাজে লাগিয়েছি। আমার মূলত মাসিক একটা প্ল্যান থাকত। যেমন—প্রথমে ৯০ দিনের একটা প্ল্যান তৈরি করে সেটিকে ৩০ দিন করে তিন ভাগে ভাগ করে নিতাম, যেন নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট সাবজেক্টগুলো শেষ করা যায়।

আমার রুটিন করার জন্য আলাদা একটা বড় খাতা ছিল। সেখানে 'ডে-১', 'ডে-২' করে তারিখ ও বার উল্লেখ করে পড়ার টার্গেট লিখতাম। তবে পড়ার টেবিলের সামনে আমি কোনো ধরাবাঁধা বা স্ট্রিক্ট রুটিন টানিয়ে রাখিনি যে শনিবারে এটা পড়তেই হবে, বা রবিবারে ওটা। আমার মূল লক্ষ্য ছিল পড়াটা শেষ করা।

সময় ব্যবস্থাপনা কীভাবে করতেন?
‎সাধারণত সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার দিকে রিডিং রুমে যেতাম আর সারাদিন পড়তাম। রাত ১২টা বা সাড়ে ১২টার দিকে রুমে ফিরতাম। এর মাঝে শুধু খাওয়া-দাওয়া ও প্রয়োজনীয় কাজের জন্যই যা একটু বিরতি নিতাম। পড়ার পাশাপাশি আমি প্রতিদিন নিয়ম করে ঘুমাতাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষাতেও ‘বি ইউনিটে’ মেধা তালিকায় নবম হয়েছিলেন। সেই গল্পটা কেমন?
‎এটা আমার জীবনের এক ‘ম্যাজিক্যাল জার্নি’। ভর্তি পরীক্ষার ঠিক এক মাস আগে আমার অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশন হয়। হতাশ হয়ে পড়েছিলাম, ভেবেছিলাম কোনোমতে চান্স পেলেই হবে। পরীক্ষার পর যখন দেখলাম আমি নবম হয়েছি, সেটা সত্যিই অবিশ্বাস্য ছিল! আমি একটি কোচিংয়ে যুক্ত থাকলেও কোচিং নির্ভশীল ছিলাম না। নিজের স্ট্র্যাটেজিতে নিজে নোট করে পড়েছি। নিজেই নিজেকে গাইডলাইন দিতাম।

যারা নতুন জজ হতে চায়, তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী থাকবে?
‎সফলতার কোনো শর্টকাট পথ নেই। শুধু সাজেশন বা ওপর-ওপর পড়ে জজ হওয়া যাবে না; বিস্তারিত ও গভীরভাবে পড়তে হবে। আমার সবসময় সুনির্দিষ্ট রুটিন থাকত। ৯০ দিনের একটা প্ল্যান করে খাতায় লিখে রাখতাম কবে কী পড়ব। পড়া বার বার রিভিশন দিতে হবে। ​আরেকটা বিষয় হলো পর্যাপ্ত ঘুম। আমি প্রতিদিন নিশ্চিন্তে ৭ ঘণ্টা ঘুমাতাম। অনেকেই না ঘুমিয়ে পড়ে, এটা খুব বাজে অভ্যাস। আর কোনোভাবেই হতাশ হওয়া যাবে না।

বিচারক হিসেবে দেশের জন্য এবং বিশেষ করে নিজ এলাকার জন্য কী পরিকল্পনা রয়েছে?
‎বিচার বিভাগে মানুষ অনেক সময় হয়রানি ও বিলম্বের শিকার হয়। আমি চেষ্টা করব আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্য থেকে জুডিশিয়াল মাইন্ড অ্যাপ্লাই করে দ্রুততম সময়ে মানুষকে ন্যায়বিচার দেওয়ার। অনেক সময় আইনজীবীদের অসৎ পরামর্শেও মামলা দীর্ঘায়িত হয়, আমি এই বিষয়গুলোতেও সচেতন থাকব।

আর নিজ এলাকার জন্য আমার দুটি বিশেষ পরিকল্পনা আছে। প্রথমত, এলাকার কোনো দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থী পড়াশোনায় মনোযোগী হলে, তাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব। দ্বিতীয়ত, হাওর এলাকায় গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড রোদ থাকে, কোনো ছায়া থাকে না। আমি বেতনের একটা অংশ দিয়ে হাওরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপকভাবে গাছ রোপণ করতে চাই। এতে মানুষ প্রশান্তি পাবে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা হবে এবং এটি সুন্দর পর্যটন এলাকায় পরিণত হবে। মানুষ এই গাছের ছায়ায় বসলে অন্তত আমি এর সদকায়ে জারিয়া পাব।

আমরণ অনশনে বসার ঘোষণা জামালপুর নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থীদের
  • ২৫ অক্টোবর ২০২৬
ইবতেয়াদী মাদ্রাসা শিক্ষকদের এমপিও নিয়ে বড় সুখবর দিলেন বিএনপ…
  • ২৫ অক্টোবর ২০২৬
জামালপুরে ধর্ষণ মামলায় ইমামের যাবজ্জীবন
  • ২৫ অক্টোবর ২০২৬
‘নিজেদের কতটা ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলেন, সেটাই সবচ…
  • ২৫ অক্টোবর ২০২৬
রাতে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী—আলোচনায় ৮ সমঝোতা, ১৩৮ বিলি…
  • ২৫ অক্টোবর ২০২৬
এইচএসসির ফল: কাল সোমবার যা জানা যাবে
  • ২৫ অক্টোবর ২০২৬