অধ্যাপক ড. হাফিজ মোহাম্মদ হাসান বাবু © টিডিসি ছবি
রক্তের ক্যান্সার শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের সমন্বয়ে নতুন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাফিজ মোহাম্মদ হাসান বাবু। তাঁর নেতৃত্বে তৈরি ‘কোয়ান্ট-হিমোডিএক্স’ (QUANT-HemoDx) নামের এই পদ্ধতি পরীক্ষামূলকভাবে ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশ নির্ভুলতা, ৯৮.৭% সেনসিটিভিটি এবং ৯৫.২% স্পেসিফিসিটি অর্জন করেছে।
ঢাকার আহছানিয়া মিশন ক্যান্সার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের রোগীর নমুনা ব্যবহার করে পরীক্ষাতেও ৯৫ দশমিক ৩ শতাংশ নির্ভুলতা পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সম্মেলনেও উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে এই গবেষণা। আগামী ৬ থেকে ৮ অক্টোবর যুক্তরাজ্যের এডিনবরোতে অনুষ্ঠিত হবে ‘দ্য আর্লি ডিটেকশন অব ক্যান্সার কনফারেন্স ২০২৬’। সেখানে অধ্যাপক ড. হাফিজ মোহাম্মদ হাসান বাবু তাঁর এই গবেষণাপত্র উপস্থাপন করবেন।
রক্তের ক্যান্সার বা লিউকেমিয়া শিশুদের মধ্যে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। উন্নত দেশে রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ পান। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উন্নত ল্যাব, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও ব্যয়বহুল প্রযুক্তির সীমিত সুযোগের কারণে প্রাথমিক শনাক্তকরণ অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে। এই সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে কম খরচে রোগ শনাক্তের সম্ভাবনা তৈরি করতে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও এআইকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন গবেষকেরা।
অধ্যাপক ড. হাফিজ মোহাম্মদ হাসান বাবুর নেতৃত্বে তৈরি QUANT-HemoDx একটি বায়ো-কোয়ান্টাম ইন্টেলিজেন্স ফ্রেমওয়ার্ক। এতে রেসনেট-১৮ (ResNet-18) কনভল্যুশনাল নিউরাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে আট-কিউবিট ভ্যারিয়েশনাল কোয়ান্টাম সার্কিট (VQC) ব্যবহার করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে রক্তের কোষের আকার, আকৃতি, নিউক্লিয়াসের বৈশিষ্ট্য ও ক্রোমাটিনের গঠনের মতো সূক্ষ্ম বিষয় বিশ্লেষণ করে ক্যান্সার শনাক্ত করা হয়।
গবেষণায় QUANT-HemoDx মডেলটি পরীক্ষামূলক তথ্যে ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশ নির্ভুলতা অর্জন করেছে। এর রিসিভার অপারেটিং ক্যারেক্টারিস্টিক-অ্যারিয়া আন্ডার দ্য কার্ভ (আরওসি-এইউসি) ছিল শূন্য দশমিক ৯৯১। ঢাকার আহছানিয়া মিশন ক্যান্সার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের বাস্তব রোগীর নমুনা ব্যবহার করে পরীক্ষায় মডেলটি ৯৫ দশমিক ৩ শতাংশ নির্ভুলতা দেখিয়েছে।
এই প্রযুক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কম খরচে ও তুলনামূলক কম কম্পিউটিং সক্ষমতায় কাজ করার সুযোগ। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত রেসনেট-৫০ মডেলের তুলনায় QUANT-HemoDx ২৬৬ গুণ কম প্যারামিটার ব্যবহার করে। একই সঙ্গে এটি ১ দশমিক ৬৮ গুণ দ্রুত কাজ করে এবং প্রতি রোগীর নির্ণয়ে আনুমানিক ৮ সেন্ট খরচ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁর এই গবেষণা দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকার মতো স্বল্প সম্পদপূর্ণ অঞ্চলে ক্যান্সার প্রাথমিক শনাক্তকরণে বড় ভূমিকা রাখবে
অধ্যাপক ড. হাফিজ মোহাম্মদ হাসান বাবু বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবটিকস ও মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
জাপানের কিউশু ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে ইলেকট্রনিকস ও কম্পিউটার সায়েন্সে পিএইচডি করেছেন অধ্যাপক ড. হাফিজ। চেক প্রজাতন্ত্রের ব্রনো ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে তিনি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, রিভার্সিবল কম্পিউটিং ও ভিএলএসআইসহ কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা রয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলেন, গবেষণাটির ফলাফল ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে যাচাই করা হলে স্বল্প সম্পদের পরিবেশে রক্তের ক্যান্সার শনাক্তে এই প্রযুক্তির ব্যবহারিক সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হবে। অধ্যাপক ড. হাফিজ মোহাম্মদ হাসান বাবুর এই সাফল্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার গর্বিত।
বিশ্বখ্যাত Cancer Research UK-এর সম্মেলনে অধ্যাপক ড. হাফিজ মো. হাসান বাবুর গবেষণাপত্র
বিশ্বখ্যাত ক্যান্সার গবেষণা প্রতিষ্ঠান Cancer Research UK (CRUK) আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে রক্তের ক্যান্সার বা ব্লাড ক্যান্সার-সম্পর্কিত গবেষণাপত্র উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. হাফিজ মো. হাসান বাবু। গবেষণাপত্রটি সম্মেলনের জন্য গৃহীত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক গবেষকদের সামনে তা উপস্থাপন করেন তিনি।
তথ্যমতে, Cancer Research UK বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ক্যান্সার গবেষণা ও দাতব্য সংস্থা। প্রতিষ্ঠানটি নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বাধীনভাবে ক্যান্সার গবেষণায় অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দেয়। বিভিন্ন দেশে ক্যান্সার গবেষণায় অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি ক্যান্সার প্রতিরোধ, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা নিয়ে গবেষণায় প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম রয়েছে।
Cancer Research UK-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের ৩৯টি দেশে গবেষণায় অর্থায়ন করেছে। এছাড়া বর্তমানে ব্যবহৃত শীর্ষ ১০টি ক্যান্সার-প্রতিরোধী ওষুধের মধ্যে আটটির উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা ও অর্থায়নের অবদান রয়েছে।
ক্যান্সার গবেষণার ক্ষেত্রে CRUK-এর গবেষণা নির্বাচন ও অর্থায়ন প্রক্রিয়াও বেশ প্রতিযোগিতামূলক। গবেষণার বৈজ্ঞানিক মান, নতুনত্ব, পদ্ধতিগত দৃঢ়তা এবং সম্ভাব্য প্রভাবসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞদের peer review, expert panels ও committees-এর মাধ্যমে গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক উচ্চমানের গবেষণা প্রস্তাব সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে অর্থায়নের জন্য নির্বাচিত হয় না।
এমন একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্ল্যাটফর্মে অধ্যাপক ড. হাফিজ মো. হাসান বাবুর ব্লাড ক্যান্সার-সম্পর্কিত গবেষণাপত্র গৃহীত হওয়া এবং তা উপস্থাপনের সুযোগ পাওয়া তাঁর গবেষণাকর্মের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষ করে ব্লাড ক্যান্সারের মতো জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ রোগ নিয়ে পরিচালিত গবেষণা আন্তর্জাতিক গবেষকসমাজের সামনে উপস্থাপনের মাধ্যমে তাঁর গবেষণাকর্ম বৈশ্বিক একাডেমিক পরিসরে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক গবেষকদের সঙ্গে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং ভবিষ্যৎ গবেষণা সহযোগিতার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
গবেষণাপত্রের acceptance ও presentation অধ্যাপক ড. হাফিজ মো. হাসান বাবুর গবেষণা কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। Cancer Research UK-এর মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ক্যান্সার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সম্মেলনে গবেষণা উপস্থাপনের এই সুযোগ তাঁর গবেষণার আন্তর্জাতিক পরিসরে দৃশ্যমানতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের গবেষকদের বৈশ্বিক গবেষণা অঙ্গনে অংশগ্রহণের একটি উদাহরণও তৈরি করেছে।