মো. শাহ পরান শুভ © সংগৃহীত
টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি (বিএমবি) বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. শাহ পরান শুভ জাপান সরকারের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ মেক্সট (মনবুকাগাকুশো) স্কলারশিপ অর্জন করেছেন। এই বৃত্তির আওতায় তিনি জাপানের চিবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণায় অংশগ্রহণ করবেন।
মেক্সট (মনবুকাগাকুশো) স্কলারশিপ জাপান সরকারের প্রদত্ত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি মর্যাদাপূর্ণ বৃত্তি। এর আওতায় নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি, ভর্তি ফি, গবেষণা-সংক্রান্ত একাডেমিক ব্যয়, মাসিক উপবৃত্তি, বিমান ভাড়া এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা প্রদান করা হয়।
নিজের এই অর্জন সম্পর্কে শাহ পরান শুভ বলেন, ‘সব প্রশংসা মহান আল্লাহর। এই অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার বাবা-মায়ের। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তারা আমাদের ছয় ভাইবোনের শিক্ষার জন্য অসংখ্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তাদের দোয়া, ত্যাগ ও ভালোবাসাই আমাকে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার বড় ভাইদের এবং বর্তমানে আমার সহধর্মিণীর উৎসাহ আমাকে সব সময় অনুপ্রাণিত করেছে। পাশাপাশি আমার শিক্ষকদের প্রতি আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। স্কুলজীবনে ফারুক স্যার এবং সানাউল্লাহ আনসারী স্যার আমাকে বড় স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগের সব শিক্ষক-শিক্ষিকার কাছ থেকে গবেষণার প্রতি ভালোবাসা ও একজন ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা পেয়েছি। বিশেষ করে আমার অনার্স ও মাস্টার্স গবেষণার সুপারভাইজার অধ্যাপক ড. খাইরুল ইসলাম স্যারের দিকনির্দেশনা গবেষণার প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ ছাড়া গবেষণার শুরুতে সিনিয়র সোহেল ভাই, ইফতি ভাই এবং বন্ধু রিফাত সরকার, শহিদুল ইসলাম সানভি, সাব্বির খান, দিব্যেন্দু ও নাহিদসহ অনেকের সহযোগিতা আমার পথচলাকে সহজ করেছে।’
শাহ পরান শুভ জানান, ছোটবেলায় তিনি কখনো শ্রেণির প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় স্থান অর্জন করতে পারেননি। তবে বাবা-মায়ের বিশ্বাস, শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা এবং নিজের অধ্যবসায় তাকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বিভিন্ন সেমিস্টারে একাধিকবার প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হওয়ার সুযোগ পান। তার ভাষায়, ‘ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের ফল একদিন অবশ্যই আসে।’
পড়াশোনার কৌশল সম্পর্কে শুভ বলেন, ‘আমি কখনো ঘণ্টা গুনে পড়াশোনা করিনি। সবসময় লক্ষ্যভিত্তিক পড়াশোনা করেছি। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে তা সম্পন্ন করার চেষ্টা করেছি। পাশাপাশি নিয়মিত গবেষণাপত্র পড়া, বিষয় বুঝে শেখা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মহান আল্লাহর ওপর ভরসা—এই বিষয়গুলো সবসময় অনুসরণ করেছি।’
গবেষণায়ও রয়েছে শুভর উল্লেখযোগ্য সাফল্য। এখন পর্যন্ত তার ৮টি আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে ২টি প্রথম লেখক হিসেবে। তার গবেষণাপত্র নেচার সায়েন্টিফিক রিপোর্টস এবং ওয়াইলি প্রকাশনা সংস্থার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকটি গবেষণাকাজ চলমান এবং কিছু আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে পর্যালোচনাধীন । বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা উপস্থাপনায় একাধিকবার প্রথম হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন একাডেমিক বৃত্তিও অর্জন করেছেন। অনার্সে তিনি ৩.৮৭ সিজিপিএ নিয়ে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। বর্তমানে মাস্টার্সের থিসিস সম্পন্ন করছেন এবং এখন পর্যন্ত তাঁর সিজিপিএ ৩.৯৫।
শাহ পরান শুভর জন্ম নারায়ণগঞ্জ জেলায়। শিক্ষাজীবনের শুরু স্থানীয় একটি মসজিদের মক্তবে। পরে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত আলিয়া মাদ্রাসায় এবং তা'মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা থেকে এসএসসি ও এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগে ভর্তি হন।
পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও ছিলেন সক্রিয়। ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন ও টেবিল টেনিস তাঁর প্রিয় খেলা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাডমিন্টনে বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন এবং টেবিল টেনিসে দুইবার রানার-আপ হওয়ার কৃতিত্ব রয়েছে তাঁর। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে শুভ বলেন, ‘জাপানে পিএইচডি সম্পন্ন করে একজন আন্তর্জাতিক মানের গবেষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। বিশেষ করে ক্যান্সার গবেষণা, মলিকুলার বায়োলজি এবং ফাইটোকেমিক্যালভিত্তিক নতুন ওষুধ উন্নয়ন নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে। পাশাপাশি দেশের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে গবেষণা ও শিক্ষার মাধ্যমে দেশের জন্য অবদান রাখতে চাই। বিদেশে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের গবেষণা উন্নয়নে কাজে লাগানোই আমার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।’
উল্লেখ্য, ১৯৫৪ সাল থেকে শুরু করে বিশ্বের ১৬০টির মতো দেশ থেকে আসা ছাত্রদের জন্য এ বৃত্তি দেয় জাপান সরকার। জাপান সরকার প্রদত্ত বৃত্তিগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে খ্যাতনামা আর সবচেয়ে সম্মানিত। এ বৃত্তির জন্য ভিসা পেলে ভিসায় লেখা থাকে ‘গভট. স্কলার’। জাপানের গবেষণার মাধ্যমে বৃত্তি প্রাপ্তির দেশ এবং জাপানের মধ্যে বন্ধুত্বের সেতু হয়ে ওঠা মানবসম্পদকে উৎসাহিত করা এবং উভয় দেশ ও বৃহত্তর বিশ্বের উন্নয়নে অবদান রাখার লক্ষ্যেই দেওয়া হয় এ বৃত্তি।