ফারহানা সুলতানা ঐশি © সংগৃহীত
শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপেই অসাধারণ সাফল্যের নজির গড়েছেন যশোরের মেধাবী শিক্ষার্থী ফারহানা সুলতানা ঐশি। তিন বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃতিত্ব দেখানোর পর গুচ্ছভুক্ত (জিএসটি) ভর্তি পরীক্ষায় ‘সি’ ইউনিটে প্রথম স্থান অর্জন করলেও, একসময় অর্থাভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া নিয়েই অনিশ্চয়তায় ছিলেন তিনি।
ঐশি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বি’ ইউনিটের পরীক্ষার আগে টাকা-পয়সার বেশ সংকট ছিল, ভেবেছিলাম পরীক্ষা দেব না। কিন্তু আমাদের কলেজের এক বড়ভাই কীভাবে যেন জানতে পারেন এবং তিনি আমার বিকাশে টাকা পাঠিয়ে দেন। আসলে টাকা-পয়সার সংকট থাকলেও পড়াশোনার ক্ষেত্রে কীভাবে যেন সব জোগাড় হয়ে গেছে।
পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বি’ ইউনিটে ১৬তম এবং ‘সি’ ইউনিটে ৮০তম স্থান অর্জন করে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দেন। এছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ই’ ইউনিটে তৃতীয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বি’ ইউনিটে প্রথম স্থান অধিকার করেন।
গুচ্ছের ফলাফল প্রকাশের পর মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) কথা হয় ঐশির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি অ্যাকাউন্টিংয়ে, সেখানেই পড়তে চাই। ভবিষ্যতে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট-(সিএ) হয়ে দেশসেবা করার ইচ্ছে আমার।’
লেখাপড়াকেই ধ্যান-জ্ঞান করা ঐশি তার শিক্ষাজীবনে ধারাবাহিকভাবে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। ২০১৭ সালে নিজ এলাকার আইইডিবি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে পিইসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন তিনি। এরপর শেখহাটি শফিয়ার রহমান মডেল অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হন। ২০২৩ সালে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই এসএসসিতে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পাশাপাশি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করেন। এরপর ভর্তি হন যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ে। এইচএসসি পরীক্ষায় এখান থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে যশোর শিক্ষাবোর্ডে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। পরবর্তীতে ফলাফলের ভিত্তিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করেন।
এইচএসসি পাস করার পর শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযুদ্ধ। সেই যুদ্ধে ঐশিকে সর্বপ্রকার রসদ সরবরাহ করেন যশোর শহরের প্যারাগন কোচিং সেন্টারের পরিচালক বাকী বিল্লাহ।
ঐশির ভাষায়, ‘বাকী বিল্লাহ স্যার আমাকে একটা বইও কিনতে দেননি, টাকা-পয়সাও নিতেন না। এমনকি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্যে রেজিস্ট্রেশন করার সময়ও বলতেন, ‘তোমার আসা লাগবে না।’
জানা গেছে, যশোর সদরের নওয়াপড়া ইউনিয়নের শেখহাটি তরফ নওয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মেহেদী হাসান ও রাফেজা খাতুন দম্পতির একমাত্র সন্তান ফারহানা সুলতানা ঐশি। তার বাবা যশোর শহরের একটি কাপড়ের দোকানের কর্মী, মা গৃহিণী। তাদের যৌথ পরিবার।
ঐশি জানান, তার এই সাফল্যের পেছনে যাদের সবচেয়ে বেশি অবদান- তারা হলেন তার মা, দাদি, খালা, কাকা। তাছাড়া, শিক্ষকদের মধ্যে এমএম কলেজের বাংলা বিভাগের রেহমান আজিজ তাকে অনেক সহযোগিতা ও আত্মবিশ্বাসী করেছেন। তাছাড়া বিএএফ শাহীন কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক সাইমিনা খাতুনও অনেক সহযোগিতা করেছেন।
তিনি বলেন, ‘যেসব দরিদ্র ছেলে-মেয়ে পড়াশুনা করতে চায়, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়- তাদের জন্যে ভবিষ্যতে কিছু করার একটা ইচ্ছা আমি লালন করি। আপনারা শুধু দোয়া করবেন।’
ঐশির বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর সরকারি এমএম কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক রেহমান আজিজ বলেন, ‘সে খুবই মেধাবী। এই মেয়েটা যেখানে পরীক্ষা দিয়েছে, সেখানেই কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। আমি তার সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ ও সফলতা কামনা করছি।’