দেশের বাইরে পড়াশোনা করতে আগ্রহীরা জেনে নিন করণীয় কী কী জানা জরুরি © সংগৃহীত
বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য পড়তে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে চাইলে আগে থেকেই পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নথিপত্র ঠিক করা থেকে শুরু করে ভাষা পরীক্ষা, বাজেট পরিকল্পনা—সবকিছু ধাপে ধাপে সম্পন্ন করলে ভর্তি ও ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হয়।
শেখ সাইফুল ইসলামের পরামর্শ অনুযায়ী, বিদেশে পড়তে যাওয়ার আগে যেসব বিষয় খেয়াল রাখা উচিত—
১. সার্টিফিকেটের নাম
আপনার নাম ও পিতামাতার নামের সঙ্গে মিল রেখে সার্টিফিকেটে কোনো ভুল থাকলে তা সংশোধন করবেন। হতে পারে নামের বানানে ভুল বা অন্য কিছু। এসময় একটা জিনিস খেয়াল রাখবেন, আপনার পিতামাতার ভোটার আইডিতে যে নাম আছে, সেই নামের সঙ্গে আপনার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নথির তথ্যের সামঞ্জস্য থাকা ভালো। মোট কথা, আপনার জন্মসনদ, শিক্ষাগত সনদসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিতে নিজের ও বাবা-মায়ের নামের বানান ও তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা জরুরি।
২. পাসপোর্ট তৈরি
পাসপোর্ট তৈরির সময় পূর্বের সার্টিফিকেটের মতো নাম ও স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানার দিকে খেয়াল রাখবেন। এমন যেন না হয় জন্মসনদে আছে বর্তমান ঠিকানা বরিশাল কিন্তু পাসপোর্টে কোনোভাবে এসে গেছে নোয়াখালী।
(১ ও ২ নম্বর পয়েন্টে কোনোভাবে ভুল হলে এগুলো সংশোধন করে নিতে হবে। আপনি বিদেশ পড়তে যান বা না যান এমনিতেই এটি জরুরি এবং সংশোধনও একটু সময়সাপেক্ষ বিষয়)।
আরও পড়ুন: জেনে রাখুন বিশ্বসেরা ২৯ স্কলারশিপের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট
৩. সার্টিফিকেট
স্নাতক প্রোগ্রামে পড়তে যেতে চাইলে এসএসসি, এইচএসসির নম্বরপত্র ও সার্টিফিকেট বোর্ড থেকে সংগ্রহ করা এবং স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামে পড়তে যেতে চাইলে অনার্সের সার্টিফিকেট ও একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট নিজ সংগ্রহে রাখা।
৪. সার্টিফিকেট সত্যায়ন
সার্টিফিকেট সংগ্রহের পর যে দেশে পড়তে যেতে চান, সেই দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শিক্ষা সনদ যাচাই, সত্যায়ন, লিগ্যালাইজেশন বা অ্যাপোস্টিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। সব দেশের জন্য একই ধরনের সত্যায়ন প্রয়োজন হয় না। তাই সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের সরকারি নির্দেশনা আগে থেকে দেখে নেওয়া ভালো।
৫. আইইএলটিএসের প্রস্তুতি
আইইএলটিএস পরীক্ষার প্রিপারেশনটা একটু আগে থেকেই নেওয়া ভালো, কারণ অনেকের কাঙ্ক্ষিত স্কোর তুলতে অনেক বেশি সময় লেগে যায় এবং এই সময়ের কারণে অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশন মিস করে ফেলে, যার জন্য এডুকেশন গ্যাপ বেড়ে যেতে পারে। তবে সব বিশ্ববিদ্যালয় বা দেশে IELTS বাধ্যতামূলক নয়; বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামভেদে TOEFL, PTE, Duolingo বা অন্যান্য ইংরেজি ভাষা পরীক্ষাও গ্রহণ করা হতে পারে।
৬. অন্যান্য পরীক্ষা
স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা করার ইচ্ছা থাকলে আন্ডার-গ্র্যাজুয়েটের স্টুডেন্টদের জন্য SAT/ACT পরীক্ষা এবং স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের জন্য GRE/GMAT পরীক্ষার প্রস্তুতি আগে থেকে নেওয়া ভালো। তবে এসব পরীক্ষা সব বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রোগ্রামের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। তাই যে বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামে আবেদন করবেন, তাদের নির্দিষ্ট ভর্তি-যোগ্যতা আগে থেকে দেখে নেওয়া জরুরি।
আরও পড়ুন: জেনে নিন মধ্যপ্রাচ্যের ১১ স্কলারশিপ সম্পর্কে
৭. রেকমেন্ডেশন লেটার
আপনার পরিচিত বা যেসব শিক্ষক আপনাকে ভালো জানেন, সেসব শিক্ষকের মধ্য থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী দুইজন টিচারের রেকমেন্ডেশন লেটার সংগ্রহ করে রাখা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রোগ্রামভেদে রেকমেন্ডেশন লেটারের সংখ্যা ও ধরন ভিন্ন হতে পারে।
৮. SOP লেখার প্রিপারেশন
বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য SOP বা Personal Statement লেখা অনেক ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রিপারেশন অনেক আগে থেকেই নেওয়া ভালো। কীভাবে আপনি এটাকে লিখবেন, এর জন্য অভিজ্ঞ ভাইদের সহযোগিতা নেওয়া বা বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ বা অন্য কোথা থেকে সহযোগিতা নেওয়া এবং নিজের মতো করে এটাকে প্রস্তুতি নেওয়া, যাতে SOP-এর ভাষাটা নিজের মতো করে হয়। তবে SOP সব বিশ্ববিদ্যালয় বা দেশের স্টুডেন্ট ভিসার জন্য বাধ্যতামূলক নয়; এটি মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
৯. বিশ্ববিদ্যালয় খোঁজা
ব্যাকগ্রাউন্ডের সঙ্গে মিল রেখে আপনি যে দেশে পড়তে যেতে চাচ্ছেন ওই দেশের মিনিমাম পাঁচটা বিশ্ববিদ্যালয় খুঁজে বের করে রাখা এবং যে সাবজেক্টে পড়তে যেতে চাচ্ছেন ওই সাবজেক্টটা যেন আপনার পূর্বের পড়া সাবজেক্টের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। ধরেন আপনি সায়েন্স থেকে এইচএসসি পাশ করছেন, সুতরাং আপনাকে এমন কোন সাবজেক্টই পরবর্তীতে চয়েজ করতে হবে—এমন নয়; বরং যে প্রোগ্রামে আবেদন করবেন, সেটির নির্ধারিত academic background ও admission requirements পূরণ করছেন কি না, সেটি আগে যাচাই করতে হবে। একইভাবে ব্যবসা শিক্ষা বিষয় থেকে আগে পড়াশোনা করে থাকলে আপনার পূর্ববর্তী পড়াশোনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ্যতার শর্ত পূরণ করে এমন সাবজেক্ট পছন্দ করা ভালো।
আরও পড়ুন: জেনে নিন বিশ্বের সেরা ৫ স্কলারশিপ সম্পর্কে
১০. বাজেট
আপনার পছন্দের শহরসহ সব কিছু বিষয় মাথায় রেখে মিনিমাম পাঁচটা বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ আগে থেকে পছন্দ করে রাখা এবং স্কলারশিপ ব্যতীত বাইরের দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে চাইলে টিউশন ফি, বিমান ভাড়া, ভিসা ফি, আবাসন, জীবনযাত্রার খরচসহ অন্যান্য বিষয়সমূহ তালিকা করে একটি নিজস্ব বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। যে দেশে ব্লক মানি বা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের প্রমাণ দেখানোর নিয়ম রয়েছে, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের ভিসা নিয়ম অনুযায়ী সেই অর্থের বিষয়টিও বাজেটে রাখতে হবে।
১১. আবেদনের সময়
আপনি যেসব বিশ্ববিদ্যালয় পছন্দ করবেন সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদনের ডেডলাইনের দিকে খেয়াল রাখা ও সে অনুযায়ী আগে থেকেই আবেদন করা।
১২. ভলান্টিয়ার সংগঠনে যুক্ত
আপনি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন বা স্কলারশিপের জন্য নিজের প্রোফাইল আরও শক্তিশালী করতে চান, তাহলে কিছু ভলান্টিয়ার সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকা ও তার যথেষ্ট প্রমাণ সংগ্রহ করে রাখা ভালো। Volunteer ও extracurricular activities অনেক ক্ষেত্রে আপনার সামগ্রিক প্রোফাইলে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এগুলো থাকলেই যে সহজে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, স্কলারশিপ বা ভিসা পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
১৩. রান্না শিখে রাখা
বিদেশে গেলে বেশির ভাগ সময় আপনাকে নিজেকে নিজের রান্না করে খেতে হবে, সুতরাং আগে থেকেই দেশ থেকে রান্না শিখে যাওয়া ভালো।
১৪. ড্রাইভিং স্কিল
যদি সম্ভব হয় ড্রাইভিং শেখা, তাহলে শিখে ফেলুন, ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরি করে রাখুন এবং যদি আরও সম্ভব হয় তাহলে যে দেশে যাচ্ছেন, সেই দেশের নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজন হলে ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভিং পারমিট (IDP) তৈরি করে রাখতে পারেন। তবে বিদেশে গাড়ি চালানোর নিয়ম ও লাইসেন্সের গ্রহণযোগ্যতা দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে।
১৫. কম্পিউটার স্কিল
যদি সম্ভব হয় তাহলে কম্পিউটারে নিজের স্কিল দেশ থেকে আপগ্রেড করে যান, যেমন Microsoft Office, মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, মাইক্রোসফট পাওয়ারপয়েন্টের কাজ শেখা এবং সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে রাখতে পারেন—এটা বিদেশে আপনাকে অনেক সাপোর্ট দিবে।