১৯৮৩ এর বিশ্বকাপ আয়োজনের মধ্য দিয়ে টানা তৃতীয়বারের মত স্বাগতিক হয় ইংলিশরা। এ বিশ্বকাপে বেড়েছিল আয়োজক শহর ও ম্যাচ ভেন্যুর সংখ্যা। নয় থেকে পঁচিশে জুন পর্যন্ত চলে ক্রিকেটের এ মহাযজ্ঞ। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে এ বিশ্বকাপ স্মরণীয় হয়ে থাকবে মাঠের খেলার অঘটনগুলোর জন্য।
বিশ্বকাপে আটটি দেশের জাতীয় ক্রিকেট দল অংশগ্রহণ করে। প্রাথমিক পর্বের খেলাগুলো দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে চারটি দল একে-অপরের বিরুদ্ধে দুইবার করে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়। গ্রুপ এ থেকে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের পাশাপাশি পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলংকা অংশ নেয় অপরদিকে গ্রুপ বি থেকে অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভারত এবং প্রথমবারের মত জিম্বাবুয়ে বিশ্বকাপ খেলতে আসে। প্রতি গ্রুপের শীর্ষস্থানীয় দু'টি দল সেমি-ফাইনালে পৌঁছায়। সেমি-ফাইনালের বিজয়ী দলগুলো ফাইনালে লড়ে। প্রতিটি দল ৬০ ওভারব্যাপী ইনিংসে অংশ নেয়। ফ্লাড লাইটের অভাবে এ বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোও ছিল সকালে। জার্সি হিসেবে ছিল আগের দুই বিশ্বকাপের মত সাদা পোশাক এবং টুর্নামেন্টের খেলাগুলো হয় লাল বলে।
বিশ্বকাপটি বেশ নাটকীয়তায় পরিপূর্ণ ছিল। এ বিশ্বকাপেই প্রথমবারের মত ব্যবহৃত হয় নীট রান রেট। নীট রান রেটের মার প্যাচে গ্রুপ এ থেকে সমান সংখ্যক পয়েন্ট নিয়েও ছিটকে যায় নিউজিল্যান্ড। রান রেটে এগিয়ে থেকে এই গ্রুপ থেকে ইংল্যান্ডের সঙ্গী হয়ে সেমি নিশ্চিত করে পাকিস্তান। অপরদিকে গ্রুপ বি ছিল অঘটনে ভরপুর। ভারত এবং জিম্বাবুয়ের ন্যায় দেশগুলো ঐ সময় তেমন ভাল দল ছিল না। কিন্তু গ্রুপ পর্বে তারা যথাক্রমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে সকলকে অবাক করেছিল। এমনকি জিম্বাবুয়ের কাছে ১৩ রানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল ফেভারিট অস্ট্রেলিয়াকে। এ গ্রুপ থেকে সেমিফাইনালে ওঠে ওয়েস্টইন্ডিজ ও আন্ডারডগ ভারত।
ম্যানচেস্টারে প্রথম সেমিতে মুখোমুখি হয় স্বাগতিক ইংল্যান্ড ও এ বিশ্বকাপের চমক ভারত। ভারতের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ইংলিশরা নির্ধারিত ওভার শেষে করে মাত্র ২১৩ রান। যা ছয় উইকেট হাতে রেখে সহজেই টপকে যায় ভারত। অপরদিকে ওভালে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে আট উইকেটের বিশাল ব্যবধানে ক্যারিবীয়রা পরাজিত করে উপমহাদেশের আরেক প্রতিনিধি পাকিস্তানকে।
লর্ডসের ফাইনালে টসে জিতে ভারতকে ব্যাটিংয়ে পাঠায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ক্যারিবীয়দের বিশ্বসেরা বোলিং আক্রমণের তোপে পড়ে ভারত মাত্র ১৮৩ রানেই গুটিয়ে যায়। কৃষ্ণমাচারী শ্রীকান্ত, মহিন্দর অমরনাথ কিছুটা অ্যান্ডি রবার্টস, ম্যালকম মার্শাল, জোয়েল গার্নার এবং মাইকেল হোল্ডিংয়ের বোলিং আক্রমণ আটকাতে পেরেছিলেন। নীচের সারির ব্যাটসম্যানের অংশগ্রহণে ৫৮.৪ ওভার পর্যন্ত খেলতে পেরেছিল ভারত। ভারতীয় ইনিংসে শ্রীকান্ত ৩৮ রান করেন। পরবর্তীতে অনুকূল কন্ডিশন ও পীচের সুবিধা নিয়ে দারুণ বোলিংয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিশ্বখ্যাত ব্যাটিং লাইন-আপ ধসিয়ে দেয় ভারত। গত দুইবারের বিশ্বকাপ জয়ী ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল মাত্র ১৪০ রানে অল-আউট হয়ে যায়। ফলে ভারত ৪৩ রানে বিজয়ী হয় এবং ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অঘটন ঘটায়।
অমরনাথ এবং মদন লাল উভয়েই ৩টি করে উইকেট নেন। ভারতের অধিনায়ক কপিল দেবের প্রায় ২০ গজ দূর থেকে দৌড়ে এসে ভিভ রিচার্ডসের ক্যাচ লুফে নেয়া ছিল ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। মহিন্দর অমরনাথ সুনিয়ন্ত্রিত বোলিং করে ৭ ওভারে মাত্র ১২ রান দেন। তার অল-রাউন্ড নৈপুণ্যে তাকে ম্যান অফ দ্যা ফাইনাল করা হয়।
এ বিশ্বকাপেও ছিল না ম্যান অফ দ্যা টুর্নামেন্টের পুরস্কার। সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন ইংলিশ ব্যাটসম্যান ডেভিড গাওয়ার (৩৮৪) এবং সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি ছিলেন ভারতীয় ফাস্ট বোলার রজার বিনি (১৮)। আগের দুটি বিশ্বকাপের মতই এর সম্প্রচার স্বত্ব ছিল আ্যাসুরেন্স প্রুডেন্সিয়াল কোম্পানির।