ভালবাসা তবুও আর্জেন্টিনা ব্রাজিলে

১০ জুলাই ২০১৮, ০৮:৪২ PM

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখে গিয়েছেন, ‘‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি/তোমার সেবার মহান দুঃখ সহিবারে দাও ভকতি’’ পতাকা ওড়ানো, জার্সি গায়ে চড়ানো, চায়ের কাপে, ভার্চুয়াল জগতে লড়াইয়ে মত্ত আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সমর্থকদের লড়াই কী শেষ হয়েছে? সেটাই খুঁজে দেখার চেষ্টা।

ফুটবলের সোনালি অতীত আছে আমাদের। অতীত হওয়ায় তা কষ্টের। তবে সুখের কথা এদেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা প্রতি চার বছর পরপর বড় বেশি ফুটবল জ্বরে ভোগেন। মধ্যের সময়টাতে তারা অপেক্ষা করেন। কখন সবুজ চত্বরে গড়াগড়ি খাবে চর্মগোলক। যখন তা খায় আমাদের মাথা খারাপের মতো হয়ে যায়। বাড়ি বেচে ভিনদেশের পতাকা বানান অজপাঁড়াগায়ের আমজাদ আলী। তার ওই দেশের ফুটবলের প্রতি গভীর ভালোবাসা। স্বামী-স্ত্রী দুই ভাগ হয়ে যান দলের সমর্থনে। প্রিয় দলের খেলা দেখার সময় হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যায় আমাদের। এমনকি মৃত্যুর মতো ঘটনাও ঘটে। এভাবেই চলছে। এর মাঝেই প্রিয় দল ভালো করে। আমরা খুশি হই। কখনও প্রিয় দল ভাবনার চেয়েও খারাপ করে। তখন আমরা কষ্টে মুষড়ে পড়ি। কিন্তু দল ছাড়ি না।


এতসব প্রস্তাবনা রাশিয়া বিশ্বকাপ থেকে এদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রিয় একাধিক দলের বিদায় হয়ে যাওয়ায়। বাস্তবতা ও পরিসংখ্যান বলে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সমর্থক আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের। ইতোমধ্যেই দল দুটি রাশিয়া থেকে দেশের পথ ধরেছে। আমাদের দেশের সমর্থকরা দারুণ মনোকষ্টে পড়েছে। তবুও তারা দল দুটির সঙ্গেই আছেন। চার বছর এভাবেই যাবে। আবার নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়বে সমর্থনে। গাছের মগডালে পতাকা বাঁধবে কোনো কিশোর। নগরের রাস্তায় ফেরি হবে প্রিয় দলের নানা স্যুভেনির। হবে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের প্রীতি ম্যাচ। গ্রামে জবাই হবে কোনো পশু। কেটেকুটে খাওয়া হবে তা। অফিসে তর্কাতর্কি হবে কে ভালো, কে মন্দ? আবার হেরে গেলে খোঁচা দেওয়াও হবে। তীব্র আঘাত করবে একে-অপরকে। প্রিয় দল হেরে গেলে অন্যটির হারও কামনা করবেন তারা! এর মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসাও থাকবে। মজা কখনও জিঘাংসায় রূপ নেবে। তবুও নিজ সন্তানের মতো প্রিয় দলকেই আগলে রাখি আমরা। কখনও তা পর হয়ে যায় না। এভাবেই আমরা সাম্বা ও আকাশি শুভ্রতার ভালোবাসায় পড়ে যাই। পেলে কিংবা ম্যারাডোনা প্রাণের মানুষ হয়ে যান। মেসির বিমর্ষতা আমাদের ছুঁয়ে যায়। নেইমারের কান্নায় আমাদের কান্না পায়। কিন্তু আমরা ভালোবাসার জায়গাটিতে অনড় থাকি। আমাদের প্রিয় দল প্রিয় দলই থাকে। যদিও ইতিহাসের জঘন্য কাণ্ড তারা ঘটান। তবুও ভালোবাসার নড়চড় হয় না। কখনও-সখনও মন খারাপ হয়। আচমকা সব ভালোবাসার স্মারক লুকিয়ে রাখি। সবুজ ও আকাশি-সাদার প্রিয় দলের পতাকা নামিয়ে রাখি। ভরে রাখি আলমিরায়। আবার যে উড়বে এসব।


এদেশে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের উন্মাদনার রূপ কেমন হতে পারে তা বোঝা যায় বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, লেখক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের সম্প্রতি লেখা ‘বিশ্বকাপ’ থেকে। লেখাটিতে তিনি লেখেন, তিনি টিভি দেখেন না। তবুও বিশ্বকাপের উন্মাদনা তার কানে পৌঁছে। পৌঁছার স্বরূপটা মজাদার, এমনকি হৃদয়বিদারকও। শেষ ষোলোর ম্যাচ ছিল সেটি। খেলা চলছিল আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের মধ্যে। তিনি মেয়েদের হল থেকে চিৎকার শুনছিলেন। তিন-দফা ভয়ানক চিৎকার আসে। তিনি বুঝে যান, আর্জেন্টিনা ফ্রান্সকে ৩ গোল দিয়েছে। তার স্ত্রী অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হককে তিনি বলেন, আর্জেন্টিনা ফ্রান্সকে ৩ গোল দিয়েছে। আর্জেন্টিনা ৩-০-তে জিতেছে বলেও তার মনে হয়। অন্তর্জালে যখন তারা খোঁজ নেন তখন দেখেন ৪-৩ গোলে হেরেছে আর্জেন্টিনা। অথচ ওই সময়গুলোতে কোনো চিৎকার আসেনি। এদেশের মানুষের আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থন কতটা অন্ধ, ভালোবাসারও গভীর হতে পারে এই উদাহরণ থেকেই বোঝা যায়। আর বেশি কিছু বলার প্রয়োজন নেই। এ দল দুটির সবকিছু আমাদের কেমন ছুঁয়ে যায় এই একটি উদাহরণই তা বুঝিয়ে দেয়।


আমরা কিছু ত্রুটি-বিচ্চুতি ব্যতিরেকে প্রিয় দলের সমর্থনে অনেক বেশি আন্তরিক, অনেক বেশি সৎ! এভাবেই আমরা আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের হয়ে যাই। তাদের প্রতি সমর্থন দেখাতে গিয়ে ভুলে যায় প্রেয়সীকেও। ভুলে যায় দেশের সামগ্রিক অবস্থা। ভুলে যায় সোনার ছেলেরা হাতুড়িপেটা করছে প্রিয় কোনো শিক্ষার্থীকে। তারা হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে কোনো বোনের ওপর। আমাদের এসব খবর রাখা হয় না।

আমাদের এমন ভালোবাসার খবর পৌঁছে যায় মেসি-নেইমারদের কানে। বৈশ্বিক সময়ের দ্রুততা তাদের জানান দেয় বাংলাদেশ নামক একটি দেশ আছে। যারা ফিফা র‌্যাংকিংয়ে ১৯৪ নম্বরে থেকেও এমন ফুটবল জ¦রে ভোগে। খোদ নিজের দেশেও মেসি-নেইমার এমন বীর কি না, তাতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়ে যায়। দেশটা বাংলাদেশ। ভালোবাসার তীর্থস্থান।

পেনাল্টিই কাল আর্জেন্টিনার
ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের মাত্র ১১ মিনিটে ডি-বক্সের ভেতরে কিলিয়ান এমবাপেকে ফাউল করেন আর্জেন্টিনার শেষ ষোলোতে ওঠার নায়ক মার্কোস রোহো। আর তাতেই পেনাল্টি পেয়ে যায় ফ্রান্স। নিখুঁত শটে আর্জেন্টিনার জালে বল পাঠিয়ে দেন আঁতোয়া গ্রিজমান।
তবে ম্যাচের ৪১ মিনিটে এসে আর্জেন্টাইনদের আশাবাদী করে তোলেন অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া। মেসির কর্নার থেকে দারুণ দক্ষতায় ফ্রান্সের জালে বল পাঠান তিনি। ফলে প্রথমার্ধ ১-১ গোলে সমতা নিয়ে বিরতিতে যায় উভয় দল। দ্বিতীয়ার্ধে এসে তৃতীয় মিনিটেই ডি-বক্স থেকে শট নিয়েছিলেন লিওনেল মেসি। গাব্রিয়েল মের্কাদোর পায়ে লেগে বল চলে যায় ফ্রান্সের জালে।


তবে ৫৭ মিনিটে ডিফেন্ডার লুকা এরনদেজের কাছ থেকে বল পেয়ে বেঞ্জামিন পাভার্ড স্কোরলাইন আবারও ২-২ গোলে সমতা ফেরান। ৬৪ মিনিটে কিলিয়ান এমবাপের গোলে স্কোরলাইন হয়ে যায় ৩-২। ৪ মিনিট পর নিজের দ্বিতীয় গোল করে পরিসংখ্যান ৪-২ গোলে নিয়ে যান এমবাপে। অলিভিয়ে জিরুদের পাস থেকে দারুণ দক্ষতায় ডি-বক্স থেকে বাঁ পায়ের কোনাকুনি শটে বল জালে পাঠান পিএসজির এই স্ট্রাইকার। ইনজুরি সময়ের তৃতীয় মিনিটে আর্জেন্টিনাকে আবারও এগিয়ে দেন সার্জিও আগুয়েরো। শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনা আরেকটি শট নিলেও ম্যাচ শেষ হয় ৪-৩ ব্যবধানে।


ম্যাচ শেষে সে কারণে আর্জেন্টাইন ভক্তরা বলেন, পেনাল্টিই কাল হলো আর্জেন্টিনার। সেই পেনাল্টি না হলে ৩-৩ গোলে সমতায় ম্যাচ অন্যদিকে ঘুরে যেত। সেক্ষেত্রে সম্ভাবনা থেকে যেত আর্জেন্টিনার।

ব্রাজিল হেরেছে ৫ কারণে
বেলজিয়ামের গোলরক্ষক কুর্তোয়া অসাধারণ খেললেন। বারবার আটকে দিলেন ব্রাজিলের আক্রমণ। নেইমার, কুটিনহো, ডগলাস কোস্তারা যেভাবেই আক্রমণ গড়–ন না, শেষে কুর্তোয়াকে একবার ছাড়া হার মানানো যায়নি। অবশ্য বেলজিয়াম রক্ষণেও নির্ভরতা দিলেন ভিনেসন্ট কোম্পানিরা।


ব্রাজিল মানেই সাম্বা। মানেই স্কিলের ঝলকানি। বল পায়ে যাদুকরি। যা দেখাই গেল না বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে। নেইমার বারবার পড়ে গিয়ে পেনাল্টি আদায়ের চেষ্টা করে গেলেন। যা ‘ভিএআর’ চালু হওয়ায় পাত্তাই পেল না রেফারির কাছে। তিতের দল বিকল্প কোনো স্ট্র্যাটেজিও দেখাতে পারল না। ব্রাজিলের রক্ষণ নিয়ে অনেক কথা বলা হচ্ছিল। এই ম্যাচের আগে পর্যন্ত মাত্র একটা গোল খেয়েছিলেন থিয়াগো সিলভা, মিরান্ডাদের নিয়ে গড়া রক্ষণ। কিন্তু বেলজিয়াম ম্যাচে দেখা গেল রক্ষণের ভঙ্গুরতা। বারবার অ্যাজার-লুকাকুকে সামলাতে হিমশিম খেলো সেলেকাওদের রক্ষণ।


মেক্সিকোর বিরুদ্ধে ২ গোলে জেতা ছাড়া ব্রাজিলের আক্রমণ কখনই ছন্দবদ্ধ দেখায় নি। স্ট্রাইকার গ্যাব্রিয়েল জেসুস গোল করতে পারেন নি পুরো প্রতিযোগিতায়। নেইমারের পা থেকে এসেছে একটা গোল। ফাইনাল থার্ডে বারবার বলের দখল হারানোয় সেলেকাওদের কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।


কার্ড সমস্যায় খেলতে পারেন নি কাজিমিরো। আক্রমণ ও রক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেন তিনি। তিনি খেলতে না পারায় মাঝমাঠে বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হয়। কাজিমিরোর পরিবর্তে আসা ফার্নান্দিনহো সেই অভাব ঢাকতে পারেন নি। তার আত্মঘাতী গোল হয়ে ওঠে প্রথম ধাক্কা। দ্বিতীয় গোলের ক্ষেত্রেও দায় অস্বীকার করতে পারেন না তিনি।

নেপালের রাষ্ট্রপতি-স্পিকারসহ ৩৬০ বিশিষ্টজনকে আম উপহার দিল ব…
  • ১২ জুন ২০২৬
পিরোজপুরে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের আনন্দ র‌্যালি
  • ১২ জুন ২০২৬
পানিতে চুবিয়ে নির্যাতন, যুবকের মৃত্যুর পর পানিতে ঝাপিয়েও রক…
  • ১২ জুন ২০২৬
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলে এনডিএফের উদ্বেগ
  • ১২ জুন ২০২৬
কক্সবাজারে সাফ বিচ গেমস আয়োজনের ঘোষণা যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্…
  • ১২ জুন ২০২৬
বিশ্বজুড়ে ফেসবুক বিভ্রাট, খুলছে না ম্যাসেঞ্জারও
  • ১২ জুন ২০২৬
×