মতিঝিল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ

শিক্ষক নিয়োগের আগেই অনুমোদন-জালিয়াতি, ২৮ বছর পর মামলা

ফেরত চাওয়া হয়েছে বেতনসহ গৃহীত সুযোগ-সুবিধা
১৭ অক্টোবর ২০২৩, ০৫:১২ PM , আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৫, ০২:৩৮ PM
মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ

মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ © সম্পাদিত

অধ্যক্ষ ও সভাপতির জালিয়াতি এবং প্রতারণার মাধ্যমে রাজধানীর মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন মানিকনগর শাখায় এবং বর্তমান বাসাবো শাখায় নিয়োগপ্রাপ্ত ওই তিন শিক্ষকসহ ১৯৯৫ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত মোট ২৫ জন শিক্ষকের নিয়োগ অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়েছে জানিয়েছেন মামলার বাদী এবং প্রতিষ্ঠানের সাবেক ওই কর্মকর্তা। মামলার আর্জিতে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়োগপত্র ‘ভুয়া’ উল্লেখ করে ফেরত চাওয়া হয়েছে তাদের চাকরিকালীন সময়ে গৃহীত বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। গত ২৭ আগস্ট ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে এ মামলার আবেদন জানানো হয়। এরপর বাদী পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালতের বিচারক চলতি মাসের ৪ তারিখে মামলাটি আমলে নিয়ে আগামী ২৯ অক্টোবর শুনানির দিন ধার্য করেছেন।

মতিঝিল মডেল স্কুল এন্ড কলেজের অভিভাবক সদস্য সাবেক কর্মকর্তা এম এ হাসানের দায়ের করা এ মামলায় আসামি করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বাংলা বিষয়ের শিক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেন, একই বিষয়ের আরেক শিক্ষক জেবুন নেছা এবং গণিত বিষয়ের শিক্ষক মো. এনামুল হক এবং ১৯৯৫ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত বাকী ২২ জন শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্টদের। আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা চলমান রয়েছে জানিয়ে বিবাদীগণের মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তদন্তের স্বার্থে তাদের সিনিয়র স্কেল ও এমপিও স্থগিত চেয়ে আবেদন জানানো হয়েছে ঢাকা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে। 

নিয়োগ সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সরকারি সেবাদান করেন তৎকালীন মাউশির কর্মকর্তা মো. যোবদুল হক। ২৫ জন শিক্ষকের এ নিয়োগ-কর্ম সম্পন্ন করতে করা হয়েছে ভুয়া নিয়োগ কমিটি, নাম ও স্বাক্ষর জালিয়াতি, কমিটির বৈঠকের আগে স্বাক্ষরসহ নিয়োগের আগেই নিয়োগ বৈধকরণসহ নানা জালিয়াতি ও ছলচাতুরীর

এছাড়াও মামলার এজহারে নাম উল্লেখ করা হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তৎকালীন পরিচালক মো. যোবদুল হককে। তিনি তার ভাইয়ের মেয়েকে ওই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগদানের মাধ্যমে মোট ২৫ জন শিক্ষকের এ নিয়োগ, এমপিওভুক্তি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তিতে সহায়তা করেন বলে অভিযোগ জানানো হয়েছে। 

আরও পড়ুন: মতিঝিল মডেলে অতিরিক্ত শিক্ষক থাকলেও ফের বিজ্ঞপ্তি, নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শিক্ষকদের নিয়োগে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের বিনিময়ে এ নিয়োগ সম্পন্ন করেন তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ এয়াকুব আলী এবং মানিকনগর এলাকার স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনার ও মানিকনগর মডেল হাই স্কুলের (স্থানীয় আরেকটি ভিন্ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়) সভাপতি এ ডি এম মোস্তফা বাদশা। যদিও প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন সভাপতি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় কাউন্সিলর মেসবাহ উদ্দিন সাবু।

মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ বাসাবো শাখা

এ নিয়োগ সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সরকারি সেবাদান করেন তৎকালীন মাউশির কর্মকর্তা মো. যোবদুল হক। ২৫ জন শিক্ষকের এ নিয়োগ-কর্ম সম্পন্ন করতে করা হয়েছে ভুয়া নিয়োগ কমিটি, নাম ও স্বাক্ষর জালিয়াতি, কমিটির বৈঠকের আগে স্বাক্ষরসহ নিয়োগের আগেই নিয়োগ বৈধকরণসহ নানা জালিয়াতি ও ছলচাতুরীর। এছাড়াও জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রদানের ক্ষেত্রেও। অখ্যাত ‘দৈনিক ঘোষণা’ নামের একটি পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে দিয়ে বিষয়টি আড়াল করা হয়েছে সাধারণের থেকেও। 

মামলার এজহারে জানানো হয়েছে, মতিঝিল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ এর শাখা-২, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত হয় ১৯৯৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী ও মানিক নগর মডেল হাইস্কুলের সভাপতি ও স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ ডি এম মোস্তফা বাদশার সাথে গোপন চুক্তির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেন। যাতে নকল স্বাক্ষর ও সিল ব্যবহার করা হয়েছে এবং যে বৈঠকের মাধ্যমে নিয়োগ দেখানো হয়েছে তাতে কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন না তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ইয়াকুব আলী ছাড়া। 

মতিঝিল মডেল স্কুল এন্ড কলেজের অভিভাবক সদস্য সাবেক কর্মকর্তা এম এ হাসানের দায়ের করা এ মামলায় আসামি করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বাংলার শিক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেন, একই বিষয়ের আরেক শিক্ষক জেবুন নেছা এবং গণিত বিষয়ের শিক্ষক মো. এনামুল হক এবং ১৯৯৫ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত বাকী ২২ জন শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্টদের।

সবুজবাগ থানাধীন মানিকনগরে মতিঝিল মডেল হাই স্কুলের অনুমতিপ্রাপ্ত শাখায় ১৯৯৫ সালে ০৯ জানুয়ারি শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত এক সভা অনুষ্ঠানের নামে তৎকালীন মতিঝিল মডেল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ এয়াকুব আলী গোপনে মানিকনগর এলাকার স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনার ও মানিকনগর মডেল হাই স্কুলের (স্থানীয় আরেকটি ভিন্ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়) সভাপতি এ ডি এম মোস্তফা বাদশার সাথে আঁতাত করে মতিঝিল মডেল হাই স্কুলের মানিকনগরস্থ শাখায় কতিপয় শিক্ষকদের নিয়োগ দেন। 

আরও পড়ুন: মতিঝিল মডেলে শিক্ষার্থী নেমেছে অর্ধেকে, নেপথ্যে সিন্ডিকেট-অনিয়ম

ওই শিক্ষকদের নিয়োগের জন্য একই বছরের ১৭ জানুয়ারি আরেকটি সভা হওয়ার কথা থাকলেও সেটি না করে তিন মাস পর ওই বছরের এপ্রিলের ২২ তারিখ আরেকটি একটি সভা দেখিয়ে এ শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ওই সভায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের তৎকালীন পরিচালক যোবদুল হককে উপস্থিত দেখানো হয়েছে; যদিও তিনি ওই সভায় ছিলেন না—জানানো হয়েছে মামলার এজহারে।

একসময় মতিঝিল আইডিয়ালের মতো প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিযোগিতা করা মতিঝিল মডেলের আজকের এই ভঙ্গুর অবস্থান, ফলাফল বিপর্যয়, শিক্ষার্থী কমে যাওয়া, শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হওয়াসহ অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাওয়ার কারণ অবৈধ নিয়োগ প্রাপ্ত এই শিক্ষকদের। প্রতিষ্ঠানটির অধঃপতন থামাতে বিবেকের তাড়নায় আদালতের দারস্থ হয়েছি—এম এ হাসান।

এজহারে আরও জানানো হয়েছে, মাউশির তৎকালীন কর্মকর্তা যোবদুল হক তার ভাইয়ের মেয়েকে ওই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগদানের শর্তে তিনি বৈধ করেন অভিযুক্ত শিক্ষকদের নিয়োগ। ওই বছরের এপ্রিলের ২২ তারিখের সভায় নিয়োগ পান বাংলার শিক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেন, একই বিষয়ের আরেক শিক্ষক জেবুন নেছা এবং গণিত বিষয়ের শিক্ষক মো. এনামুল হকসহ মোট ২৫ জন।

নিয়োগ সংক্রান্ত ওই সভায় মোট নয়জন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতির নাম জানানো হলেও তারা কেউই ওই সভায় ছিলেন না এবং ওই প্রতিষ্ঠানের সাথে কোনোভাবেই জড়িত ছিলেন না। অন্যদিকে মাউশির তৎকালীন কর্মকর্তা যোবদুল হকের ভাইয়ের মেয়ে এবং ওই তিন শিক্ষক বর্তমানে মতিঝিল মডেলের বাসাবো শাখায় কর্মরত রয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত ৪ শিক্ষক বাদে বাকিরা বদলিসহ নানা কারণে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছেন।

মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ বাসাবো শাখা

তবে মতিঝিল মডেলের বাসাবো শাখা বাংলার শিক্ষক শিক্ষক এবং মামলার অন্যতম অভিযুক্ত মো. দেলোয়ার হোসেন তোদের নিয়োগে অবৈধ প্রক্রিয়ায় হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনিসহ নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বৈধভাবে নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে এবং তার কাছে বৈধ নিয়োগপত্র রয়েছে বলেও দাবি করেছেন। এ বিষয়ে মামলার বাকী নামল্লোখিত অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন: মতিঝিল মডেল কেন্দ্র: ব্যবহারিক খাতায় নম্বর পেতে টাকা দিতে হলো শিক্ষার্থীদের

১৯৯৫ সালের এপ্রিলের ২২ তারিখ শিক্ষকদের নিয়োগ সম্পন্ন দেখানো হলেও তৎকালীন মাউশির পরিচালক যোবদুল হক ওই নিয়োগ অনুমোদন করেন তার এক সপ্তাহ আগে, ১৯৯৫ সালের ১৫ এপ্রিল। এছাড়াও এ নিয়োগ অনুমোদনের অভিযুক্ত এ ডি এম মোস্তফা বাদশার মানিকনগর মডেল হাই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর দেয়া হলেও তাতেও তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী ছাড়া কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। এছাড়াও ওই সভাটি ১৯৯৫ সালের মে মাসের ৬ তারিখে দেখানো হলেও স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে তার একদিন আগে, ৫ মে। অর্থাৎ সভা হওয়ার আগের দিন দেয়া হয়েছিল এসব স্বাক্ষর; যদিও স্বাক্ষরগুলো ভুয়া এবং জাল।

শিক্ষকদের নিয়োগে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের বিনিময়ে এ নিয়োগ সম্পন্ন করেন তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ এয়াকুব আলী এবং মানিকনগর এলাকার স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনার ও মানিকনগর মডেল হাই স্কুলের (স্থানীয় আরেকটি ভিন্ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়) সভাপতি এ ডি এম মোস্তফা বাদশা। যদিও প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন সভাপতি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় কাউন্সিলর মেসবাহ উদ্দিন সাবু।

এ নিয়ে মামলার বাদী এবং মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবক সদস্য এম এ হাসান জানিয়েছেন, মামলায় যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তার সত্যতা প্রমাণে আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে প্রয়োজনীয় সব নথি। বিচারক তার সব বক্তব্য শুনে মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ঠিক করেছেন। মামলায় অভিযুক্তদের গৃহীত বেতনসহ অন্যান্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ফেরত চাওয়া হয়েছে।

ঘটনার ২৮ বছর পার হওয়ার পর বিচারের উদ্যোগ বা অভিযোগ কেন— এমন প্রশ্নে মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক এই কর্মকর্তার সরল স্বীকারোক্তি, তার চোখের সামনেই সম্পন্ন হয়েছে এ নিয়োগ। একসময় মতিঝিল আইডিয়ালের মতো প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিযোগিতা করা মতিঝিল মডেলের আজকের এই ভঙ্গুর অবস্থান এমন নানা অপকর্মের কারণে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির অধঃপতন থামাতে তিনি বিবেকের তাড়নায় আদালতের দারস্থ হয়েছেন।

তার মতে, অবৈধ নিয়োগ প্রাপ্ত শিক্ষকরা অনেকাংশেই দায়ী মতিঝিল মডেলের ফলাফল বিপর্যয়, শিক্ষার্থী কমে যাওয়া, শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হওয়াসহ অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাওয়ার জন্য।

শ্রম অধিকার, শ্রমিক সুরক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা…
  • ৩১ মার্চ ২০২৬
খুব কঠিন পথে আছি, আপনারা আমাকে হেল্প করুন: চিকিৎসকদের সহযোগ…
  • ৩১ মার্চ ২০২৬
সাতক্ষীরায় তেল সংকটে মোটরসাইকেল বাজারে ধস, বাড়ছে ব্যাটারিচা…
  • ৩১ মার্চ ২০২৬
গাইড বই বাণিজ্যের অভিযোগ শিক্ষক সমিতির বিরুদ্ধে, তদন্তে ‘ধী…
  • ৩১ মার্চ ২০২৬
মিরসরাই বসতঘর থেকে অজগর উদ্ধার
  • ৩১ মার্চ ২০২৬
৯ মাস বয়সী শিশু রাইয়ানের চিকিৎসায় পাশে দাঁড়ালেন প্রধানমন্ত্…
  • ৩১ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence