খাল সাঁতরে স্কুলে যাচ্ছে শিশুরা, ভেজা শরীরে ক্লাস করতে হয় তাদের। © টিডিসি ফটো
ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়তেই বই-খাতা বুকে নিয়ে বের হয় ছোট্ট শিশুরা। তাদের গন্তব্য স্কুল, কিন্তু পথটা একেবারেই ভিন্ন। নেই কোনো রাস্তা, নেই সেতু, নেই নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা। বরং প্রতিদিনই তাদের পার হতে হয় একের পর এক খাল কখনো সাঁতরে, কখনো বুকসমান পানিতে হেঁটে। এভাবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যায় পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার সদর ইউনিয়নের দুর্গম চরকারফার্মার শিশুরা।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, পটুয়াখালীর গলাচিপা সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের একটি বিচ্ছিন্ন অংশ চরকারফার্মা। আগুনমুখার মোহনার কোলে গড়ে ওঠা এই দ্বীপটি দূর থেকে দেখতে দারুণ মনোরম। চারপাশে নদী, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পাশে ম্যানগ্রোভ বন। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এলাকা। পশ্চিমে রামনাবাদ, পূর্বে তেঁতুলিয়া নদী এবং উত্তরে উত্তাল আগুনমুখার মোহনা।
তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে কঠিন বাস্তবতা। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা আর অবর্ণনীয় দুর্ভোগে প্রতিদিন টিকে থাকার লড়াই করছে এখানকার মানুষ। নদীঘেরা বিচ্ছিন্ন এই চরে নেই কোনো পাকা রাস্তা, নেই সেতু বা নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। জোয়ারের পানিতে ডুবে যায় রাস্তাঘাট, এমনকি স্কুলের মাঠও। ফলে শিশুদের জন্য স্কুলে যাওয়া হয়ে দাঁড়ায় একপ্রকার সংগ্রাম। একই দুর্ভোগ পোহাতে হয় শিক্ষকদেরও।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, চরকারফার্মায় প্রায় ৮০টি জেলে ও কৃষক পরিবার বসবাস করে, যেখানে প্রায় ৫ শতাধিক মানুষের বসতি। তাদের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চরকারফার্মা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৫১ জন শিক্ষার্থী ও ৩ জন শিক্ষক রয়েছেন। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে দিন দিন বাড়ছে ঝরে পড়ার হার।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন জানান, গলাচিপা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে বোয়ালিয়া স্লুইসগেট পর্যন্ত গাড়িতে যেতে হয়। এরপর আধা কিলোমিটার হেঁটে আগুনমুখা নদীর তীরে পৌঁছে খেয়া নৌকায় নদী পার হতে হয়। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর নদী পার হলেও শেষ হয় না দুর্ভোগ। স্কুলে পৌঁছাতে অন্তত পাঁচটি খাল পার হতে হয় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের।
তিনি আরও জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুদের সাঁতরে বা পানির ভেতর দিয়ে হেঁটেই যেতে হয়। এতে বই-খাতা ভিজে যায়, নষ্ট হয় পড়াশোনার সামগ্রী। ফলে অনেক সময় শিশুদের অতিরিক্ত পোশাক সঙ্গে নিয়ে স্কুলে যেতে হয়। খাল পার হয়ে ভেজা কাপড় বদলে তারপর ক্লাসে বসে তারা। এ কারণে অভিভাবকদের মধ্যেও রয়েছে নিরাপত্তাহীনতা, যা শিশুদের স্কুলমুখী হতে নিরুৎসাহিত করছে।
দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র জহিরুলের সাথে কথা হলে, সে বলে, ‘আমরা কয়েকজন একসাথে খাল সাঁতরে স্কুলে যাই। অনেক সময় বই-খাতা ভিজে যায়। পরে ভেজা জামা বদলে ক্লাস করতে হয়।’
বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি শাহিদা বেগম বলেন, ‘আমি নিজের জমি দিয়ে স্কুল করেছি। কিন্তু রাস্তা করার মতো সামর্থ্য নেই। অন্তত একটি চলাচলের রাস্তা দরকার। চরটিতে চলাচল উপযোগী কোনো রাস্তা নেই।’
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন টুটু সমস্যার কথা স্বীকার করে জানান, বরাদ্দ পেলে নতুন রাস্তা নির্মাণ করা হবে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম সগীর বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমে যাচ্ছে। বিষয়টি ইউএনও ও প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর মহোদয়কে জানিয়ে, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. ইজাজুল হকও আশ্বাস দিয়ে বলেন, নতুন বরাদ্দ থেকে স্কুলে যাওয়ার উপযোগী রাস্তা ও সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।