প্রতি বছরই বন্যা ও জলাবদ্ধতার মতো বিভিন্ন দুর্যোগের কবলে পড়ে দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। চিত্র ব্যতিক্রম নয় এ বছরও। দেশের ১৯টি জেলায় বন্যায় প্রায় দেড় হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলোতে বর্তমানে পাঠদান ও সব শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়েছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে-বাহিরে পানি ঢুকে যাওয়ায় অবকাঠামো, আসবাবপত্র, বই-খাতাসহ বিভিন্ন জিনিসপত্রও নষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বন্যার কারণে পানিবন্দি হয়ে পড়ায় বিদ্যালয়ে যেতে পারছেন না শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। আবার কোথাও কোথাও ভাঙনে তলিয়ে যাচ্ছে খোদ বিদ্যালয় ভবনই।
এ অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণ না করতে পারলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আশঙ্কা শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের। এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী ‘দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস’কে বলেন, দেশে বন্যা-জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগ এখন নিয়মিত ঘটনা। যদিও দুঃখজনক বিষয় হলো- দুর্যোগ মোকাবেলায় অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই কোন ধরনের প্রস্তুতি থাকে না। এর ফলে ক্ষতির আকারটা বড় হয়। এছাড়া দুর্যোগ পরবর্তী সময়েও সংকট নিরসনে দ্রুত কোন উদ্যোগ নেয়া হয় না। ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পুনঃনির্মাণে দীর্ঘসূত্রিতা পরিলক্ষিত হয়। ফলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারও বেড়ে যায়।
এ পর্যন্ত তালিকা পাওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় ২৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের (ডিপিই’র) প্রাথমিক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন ডিপিই ও স্থানীয় শিক্ষা অফিসগুলো।
ডিপিইতে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারা দেশ থেকে পাঠানো তালিকা থেকে দেখা গেছে, একমাসের বন্যায় সারাদেশে প্রায় দেড় হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে। এগুলোতে পাঠদান ও শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। পানি ঢুকে যাওয়ায় অফিস কক্ষ ও নানা ধরনের জরুরি কাগজপত্রও নষ্ট হয়েছে। বন্যায় উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার বিদ্যালয়গুলোতে সব চাইতে বেশি ক্ষতি হয়েছে।
ডিপিইর দেয়া পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায ৮৭টি, কুড়িগ্রাম সদরে ৬০টি, চিলমারী ৩৫টি নাগেশ্বরী ২৫টি, ফুলবাড়ী ৩০টি, ভূরাঙ্গামারী ৩৫টি, রৌমারী ২৮টি চর রাজিবপুর ৫৯টি, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ ৬৫টি, সাদুল্লাপুর ২৯টি, লালমনিরহাটে আদিতমারী ২৭, সদর ৩৫, হাতীবান্ধা ৩৫টি, নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ ১৫টি, ডিমলা ২৮টি, ডিমলা ২৫টি, ডোমার ১৯টি, বগুড়ার ধুনট উপজেলায় ২৯টি, সারিয়াকান্দি ৭৯টি সিরাজগঞ্জ কাজিপুর ৩৭টি, বেলকুটি ১২টি, শাহজাদপুর ৫৫টি, সদরে ২৫টি, নওগাঁ আত্রাই উপজেলায় ৩৫টি সদরে ৮টি, মান্দা ২৯টি, পাবনা ফরিদপুর ৩৮টি, ভাঙ্গুড়া ২১টি, বেড়া ২৭টি মাদারীপুর শিবচর ২৬টি, সদর ১২টি, পাংশা ৫টি গোয়ালন্দ ৭টি, ফরিদপুর চরভদ্রাসন উপজেলায় ৫টি, কক্সবাজার চকরিয়া ১২৫, পেকুয়ায় ৩১টি, রাঙ্গামাটি সদরে ৭টি, কাউখালী ৯টি, বরকল ৮টি, জুরাছড়ি ৬টি, লংগদু ২টি, বাঘাইছড়ি ১৫টি, বিলাইছড়ি ৯টি, ফেনী ছাগলনাইয়া ২১টি, পরশুরাম ২টি, ফুলগাজী ২১টি, কুমিল্লা আদর্শ সদর ৫টি, বিবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলায় ১০টি, সুনামগঞ্জ ২৫টি ও বরগুনার আমতলী উপজেলায় ১৩টি প্রতিষ্ঠান পানির নিচে অথবা বুক সমান পানির নিচে। পাকা স্কুলঘরেও পানি ঢুকেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেছেন, বন্যা পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্তের পরিসংখ্যান প্রতিদিন বাড়ছে। বন্যার কারণে গত ৩০ দিন ধরে সারা দেশে বিভিন্ন জেলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কোথাও বন্যার পানিতে ডুবে যাচ্ছে, কোথাও বিদ্যালয়ের মেঝে জলাবদ্ধ হয়ে পড়ছে, কোথাও ক্লাসরুম, খেলার মাঠসহ অর্ধেক ভবন ডুবে গেছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যালয় এবং শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া হবে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরপরই এ কার্যক্রম শুরু হবে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবন মেরামতের পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ক্ষতি পুষিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু এই অতিরিক্ত ক্লাস কখন নেয়া হবে সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা এখন দেয়া হয়নি। বলা হয়েছে, স্থানীয় কর্মকর্তারা এই অতিরিক্ত ক্লাসের বিষয়টি নজরদারি করবেন।
ডিপিইর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার উপ-পরিচালক নুরুল আমিন বলেন, বন্যায় সাধারণত চর এলাকা ও উত্তরবঙ্গের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একারণে এসব এলাকায় ক্ষতির পরিমাণও বেশি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এজন্য এসব এলাকায় স্থায়ী ভবন নির্মাণের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। চর এলাকায় স্থায়ী ভবন নির্মাণের পরিবর্তে সহজেই স্থানাস্তরযোগ্য ভবন তৈরি করা হবে। সহজে স্থানান্তরযোগ্য ভবন নির্মাণে বেশি টাকা খরচ হবে না।
তিনি বলেন, প্রতিদিন মাঠপর্যায় থেকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা আসছে। এসব প্রতিষ্ঠান মেরামতের জন্য রাজস্ব্য ও উন্নয়ন খতে পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব পাওয়ার পর সেসব বিদ্যালয় মেরামতের কাজ শুরু করা হবে। গত বছরও এ বাবদ প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যায় করা হয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।