জহুরুল ইসলাম © সংগৃহীত
আদালতের নির্দেশে জেলহাজতে যাওয়ায় সরকারি বিধি মোতাবেক সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। কিন্তু সেই আদেশ তোয়াক্কা না করে নিয়মিত বিদ্যালয়ে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করছেন এবং দাপ্তরিক কাজকর্মও চালিয়ে যাচ্ছেন মো. জহুরুল ইসলাম নামের এক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।
পাবনা সদর উপজেলার দড়িভাউডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটেছে।
অভিযোগ উঠেছে, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টারের সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পরোক্ষ যোগসাজশেই আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘন করে এ অনিয়ম করা হচ্ছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকেরা।
প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও মামলা সূত্রে জানা যায়, পাবনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত-১-এ করা একটি ফৌজদারি মামলায় (জিআর-২৪৩/২৬) গত ৩ জুন জামিন নামঞ্জুর হলে জহুরুল ইসলামকে জেলহাজতে পাঠানো হয়। তিনি দড়িভাউডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৯ জুন পাবনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আশরাফুল কবীর স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে ওই শিক্ষককে ৩ জুন থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী, সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতে পারেন না। বরখাস্তকালীন তিনি বিধি অনুযায়ী কেবল খোরপোশ ভাতা বা খোরাকি ভাতা পাবেন। এই ভাতা উত্তোলনের জন্য তাকে নির্দিষ্ট সদর দপ্তরে উপস্থিতির প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হয়; মূল বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় প্রতিদিন সই করার কোনো আইনি সুযোগ নেই। ফলে তার এই স্বাক্ষর বেআইনি এবং গুরুতর বিভাগীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য।
আরও পড়ুন: সংসদে বিরোধী দলের এমপি কি বাড়ছে, নাকি নতুন নির্বাচন—কী বলছে জামায়াত ও আইনজীবীরা
সরকারি এই আদেশের তিন সপ্তাহ পর মঙ্গলবার (৩০ জুন) জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর এই অনিয়মের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মো. মুনসুর আলম নামের এক স্থানীয় ব্যক্তি। অভিযোগে বলা হয়েছে, বরখাস্ত হওয়া শিক্ষক জহুরুল ইসলাম সরকারি চাকরি আইনের ৩৯ (২) ধারা অমান্য করে স্কুলের সব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। আর এই কাজে তাকে সরাসরি মদদ দিচ্ছেন পাবনা সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং ওই স্কুলের দায়িত্বে থাকা সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, অফিস আদেশ জারি হওয়ার পরপরই বিদ্যালয়ের সব দাপ্তরিক কার্যক্রম থেকে ওই শিক্ষকের নাম সাময়িকভাবে স্থগিত করার কথা। কিন্তু অভিযুক্ত নিজেই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হওয়ায় এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ থাকায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষক জহুরুল ইসলাম বিদ্যালয়ে কাজ করা এবং মঙ্গলবারও হাজিরা খাতায় সই করার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের অনুমতিতেই আমি বিদ্যালয়ে আসছি। আপনারা তাদের কাছ থেকেই বিস্তারিত জেনে নেন।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম দায় চাপান শিক্ষা কর্মকর্তার ওপর। তিনি বলেন, ‘টিইও (উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা) স্যার ওই শিক্ষককে বিদ্যালয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন বলে অভিযুক্তের কাছ থেকে জেনেছি।’
আরও পড়ুন: প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থান বেড়েছে ২১ শতাংশ, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতেও স্বস্তি
অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাফিয়া আক্তার অপু। যোগাযোগ করা হলে তিনি উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘তাকে তো বেতন দেওয়া হচ্ছে না। বিদ্যালয়ে গিয়ে ফ্রিতে কাজ করে দিলে প্রবলেম কোথায়?’
সরকারি চাকরি আইন এটি সমর্থন করে কি না—জানতে চাইলে তিনি সদুত্তর দেননি।
জানতে চাইলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আশরাফুল কবীর বলেন, ‘কোনো শিক্ষক বিদ্যালয়ে কাজের যোগ্য নন বিবেচিত হলেই তাকে বরখাস্ত করা হয়। সেখানে তাকে কাজ করার অনুমতি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। শিক্ষা কর্মকর্তারা এমনটি করে থাকলে, সেটি খতিয়ে দেখে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’