সীমার জন্মকালীন সময় সুখের হয়নি। কন্যা সন্তান হয়ে পৃথিবীতে আসাটা মেনে নিতে পারেননি বাবা আব্দুর মোতারিব। ক্ষোভে মা মীরাজ বিবি ও মেয়েকে (সীমা) হত্যার উদ্দেশ্যে একসঙ্গে এসিডে ঝলসে দেন তিনি। মূলত জন্মের সেই ক্ষণ হতেই শুরু সীমার জীবনের কঠিন বাস্তবতা।
মাত্র ৫ বছর বয়সে হবিগঞ্জের উছাইল গ্রাম থেকে এসে ঠাঁই হয় ঢাকার কড়াইল বস্তিতে। স্বপ্ন দেখে সমবয়সী অন্য মেয়েদের মত স্কুলে ভর্তি হওয়ার। শুরু হয় প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির দৌঁড়ঝাপ। অধম্য সীমা বেশ কিছু স্কুলে বুকভরা আশা নিয়ে যায় ভর্তি হতে। কিন্তু সভ্য সমাজের স্কুলে এসিডে ঝলসানো চেহারা নিয়ে চাইলেই কি ভর্তি হওয়া যায়? স্বভাবতই ফিরতে হয় একরাশ নিরাশার বালি নিয়ে।
এ সময় কড়াইল বস্তিতে সীমার সাথে হঠাৎ পরিচয় চ্যানেল আই’য়ের সাংবাদিক মোস্তাফা মল্লিকের। ২০১০ সালের শুরুর দিকে চ্যানেল আই’য়ে তাকে নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রচারিত হয়। এরপর অদম্য সীমাকে ভর্তি করাতে রাজি হয় ঝিগাতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এমনই সময় এগিয়ে আসেন এক প্রবাসী। তার সহায়তায় বস্তি থেকে সীমার স্থান হয় আধুনিক ফ্ল্যাটে। এরপর হবিগঞ্জের উছাইল গ্রামে নিজেদের জমিতে বসবাস করতে থাকে।
সীমা ভর্তি হয় এলাকার একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে চলতে থাকে তার সংগ্রামী জীবন। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় (পিইসি) জিপিএ-৫ অর্জন করে পা রাখে মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে। এ বছর নভেম্বরে অংশ নেয় জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায়। সোমবার শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে হস্তান্তর করেন লাল ফিতা বাঁধানো জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার ফলাফল। তাতে সীমার নামটিও লিপিবদ্ধ রয়েছে। জিপিএ-৪.৮০ পেয়ে সংগ্রামী শিক্ষা-জীবনে সফলতার দ্বিতীয় সিঁড়িও পার হয়েছে সে।
মোস্তাফা মল্লিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে অদম্য সীমার সাথে তাঁর স্মৃতিগুলো তুলে ধরেন। লিখেন, ‘আমার সঙ্গে পরিচয় ২০১০ এর জানুয়ারির দিকে, মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার জন্য শতাধিক সরকারি বিদ্যালয়ে গেলেও চেহারার কারণে কোনো স্কুল ভর্তি নিতে রাজি হচ্ছিল না তাকে। চ্যানেল আইয়ে রিপোর্ট প্রচারের পর ২০১০ সালে সীমা সরকারি স্কুলে ভর্তি হতে পেরেছিল। একজন প্রবাসীর সহায়তায় বস্তি থেকে সীমার স্থান হয় আধুনিক ফ্ল্যাটে। এরপর নিজেদের জমিতে হবিগঞ্জের বাড়িতে বসবাস। পঞ্চম শ্রেণিতে জিপিএ ৫ পায় এই শিক্ষার্থী। হঠাৎ করেই আর্থিক সাহায্য বন্ধ হয়ে যায় তার। আবারো রিপোর্ট। এগিয়ে আসেন আরেক প্রবাসী মাহমুদ মায়া। প্রতিমাসে লেখাপড়ার খরচ দিতে শুরু করেন তিনি। এখন সীমার গল্প ভিন্ন কিছু। মেধাবী, সাহসী সীমাকে গত ৮ বছর ধরে ফলো করছি আমি। গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে বেড়ানো সীমা অস্টম শ্রেণিতে পেয়েছে জিপিএ ৪.৮০।’