শাহিনুর রহমান সাগর © সংগৃহীত
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা এখন আর কেবল দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক সীমাবদ্ধতা নয়; এটি একটি ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক প্রবাহ। ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রায় ৫২ হাজার ৭৯৯ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য ৫৫টি দেশে গেছেন। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪৯ হাজার ১৫১, আর ২০২১ সালে ৪৪ হাজার ৩৩৮। তিন বছরের ধারাবাহিক বৃদ্ধির এই চিত্র প্রমাণ করে বিদেশে উচ্চশিক্ষা এখন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পেশাগত পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠেছে।
এই প্রবণতার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো পিএইচডি বা গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা। বিশেষ করে গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৫০ শতাংশ, যা গবেষণামুখী শিক্ষার আকর্ষণকে স্পষ্ট করে। বিদেশগমন প্রবণতা সংখ্যা যা বলছে- আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর প্রবৃদ্ধি
বছর শিক্ষার্থী সংখ্যা
২০২১ সালে ৪৪ হাজার ৩৩৮ জন ২০২২ সালে ৪৯ হাজার ১৫১ জন ২০২৩ সালে ৫২ হাজার ৭৯৯। এই পরিসংখ্যান থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট: আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা আর এলিট-নির্ভর নয়; মধ্যবিত্ত অংশগ্রহণ বাড়ছে। স্কলারশিপ ও ফান্ডিং সম্পর্কে তথ্যপ্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রবেশের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দৃশ্যমান।
পিএইচডি—ডিগ্রি নয়, জ্ঞান-উৎপাদন প্রক্রিয়া
বিদেশে পিএইচডি মূলত একটি গবেষণা-চুক্তি। উন্নত বিশ্বে এটি ‘ডক্টরাল ট্রেনিং’ হিসেবে দেখা হয়, যেখানে শিক্ষার্থী জ্ঞান উৎপাদনের অংশীদার। পিএইচডির কাঠামো, গবেষণা সমস্যা নির্ধারণ, তাত্ত্বিক কাঠামো, মেথডোলজি, ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, থিসিস রচনা, পিয়ার-রিভিউ প্রকাশনা। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো গবেষণা দক্ষতার প্রমাণ দেওয়া।
প্রধান গন্তব্য দেশ কেন ও কীভাবে?
যুক্তরাষ্ট্র-RA/TA ভিত্তিক ফুল ফান্ডিং, গবেষণা অনুদান ও ল্যাব সুবিধা, STEM বিষয়ে উচ্চ চাহিদা। যুক্তরাজ্য-সময়সীমা ৩–৪ বছর, Commonwealth ও বিশ্ববিদ্যালয় স্কিম । কানাডা-সুপারভাইজার নির্ভর আবেদন, পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক সুবিধা। জার্মানি –DAAD, প্রকল্প ভিত্তিক funded PhD। অস্ট্রেলিয়া-RTP স্কলারশিপ, গবেষণাভিত্তিক অর্থায়ন । স্ক্যান্ডিনেভিয়া-পিএইচডি চাকরি হিসেবে, বেতন ও সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা।
ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপ—মিথ ও বাস্তবতা
অনেকে মনে করেন ফুল-ফান্ডেড পিএইচডি পাওয়া অত্যন্ত দুর্লভ। বাস্তবে, উন্নত দেশে অধিকাংশ পিএইচডি ফান্ডেড। প্রধান ফান্ডিং উৎস-Fulbright, Commonwealth, DAAD, MEXT, CSC, GKS, Australia RTP
বাস্তব কৌশল -সম্ভাব্য সুপারভাইজারের গবেষণা বিশ্লেষণ, প্রস্তাবকে নির্দিষ্ট করা, প্রাসঙ্গিক প্রকাশনা সংযুক্ত করা, ইমেইল যোগাযোগে, পেশাদারিত্ব। অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থী প্রবাহ কেবল একাডেমিক নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ঘটনা। বছরে ৫০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর বিদেশ যাত্রা জাতীয় অর্থনীতির উপর বহুস্তরীয় প্রভাব ফেলে।
বৈদেশিক মুদ্রা বহিঃপ্রবাহ বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সাধারণত ব্যয়ের প্রধান খাতগুলো হলো টিউশন ফি, আবাসন, স্বাস্থ্যবীমা, জীবনযাত্রার ব্যয়, ভিসা ও ভ্রমণ খরচ।যদিও পিএইচডি পর্যায়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফুল-ফান্ডেড সুযোগ থাকে, কিন্তু মাস্টার্স ও আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। ফলে বার্ষিকভাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যায়।
মানবসম্পদে বিনিয়োগ (Human Capital Formation) অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকারের মানবসম্পদ তত্ত্ব (Human Capital Theory) অনুযায়ী শিক্ষা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জনকারী ব্যক্তিরা উচ্চ দক্ষতা অর্জন করেন, উন্নত প্রযুক্তি ও গবেষণা পদ্ধতির সাথে পরিচিত হন, আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণের সক্ষমতা বাড়ান । এই দক্ষতা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে ।
রেমিট্যান্স ও জ্ঞান স্থানান্তর
বিদেশে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে কর্মরত উচ্চশিক্ষিত বাংলাদেশিরা রেমিট্যান্সের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবদান রাখেন। স্বপ্নের ডক্টরেট: বাংলাদেশ থেকে বৈশ্বিক গবেষণাগারে ঢাকার এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান রাফি এখন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক। তার ভাষায়, “প্রথমে ভেবেছিলাম বিদেশে পিএইচডি মানে শুধু ধনীদের জন্য। পরে বুঝলাম-সঠিক সুপারভাইজার আর গবেষণা প্রস্তাব থাকলে ফুল ফান্ডিং পাওয়া সম্ভব।”
ইউনেসকোর তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে ৫২ হাজার ৭৯৯ জন শিক্ষার্থী বিদেশে গেছেন। এই সংখ্যার পেছনে আছে হাজারো রাফির গল্প। রাফি জানান “আমি আবেদন শুরু করি এক বছর আগে। সম্ভাব্য সুপারভাইজারের ১৫টির বেশি গবেষণা প্রবন্ধ পড়েছিলাম। তারপর লক্ষ্যভিত্তিক ইমেইল করি।” তার মতে, SOP কপি-পেস্ট নয়; প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা করে লেখা জরুরি। আরেক গল্প: জার্মানির গবেষণাগার নুসরাত, বর্তমানে জার্মানিতে পিএইচডি করছেন। তিনি বলেন,“আমার পিএইচডি আসলে চাকরি। মাসিক বেতন পাই। কিন্তু শুরুতে ভিসা ও ডকুমেন্ট প্রক্রিয়া ছিল কঠিন।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে গবেষণা অবকাঠামো সীমিত। এখানে ল্যাব সুবিধা অসাধারণ।”
পরিবারের দৃষ্টিকোণ-এক অভিভাবক বলেন,“বিদেশে পড়াশোনার খরচ চিন্তার বিষয়। কিন্তু স্কলারশিপ পেলে ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হয়।” আন্তর্জাতিক যৌথ পিএইচডি প্রোগ্রাম Joint Doctoral Programs বা Cotutelle মডেল চালু করা গেলে শিক্ষার্থীরা আংশিক সময় দেশে গবেষণা করতে পারবে, আন্তর্জাতিক সুপারভিশন পাওয়া সম্ভব হবে, গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন হবে।
বিদেশফেরত গবেষকদের পুনর্বাসন
একটি সুসংগঠিত ‘Returnee Research Grant’ চালু করা যেতে পারে, যাতে বিদেশ ফেরত পিএইচডি গবেষকরা -ল্যাব স্থাপন করতে পারেন, শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়ে, গবেষণা-উদ্ভাবন দ্রুত বাণিজ্যিকীকরণ হয়।
পিএইচডি আবেদন প্রক্রিয়া: কাঠামোগত বিশ্লেষণ পিএইচডি আবেদনকে একটি কৌশলগত প্রকল্প হিসেবে দেখা উচিত। সময়রেখা (Timeline Approach)। আবেদন শুরুর প্রস্তুতি: ১২ মাস আগে, সম্ভাব্য সুপারভাইজার চিহ্নিতকরণ: ৮–১০ মাস আগে, ডকুমেন্ট প্রস্তুতি: ৬–৮ মাস আগে, আবেদন জমা: নির্ধারিত ডেডলাইনের পূর্বে ।
গবেষণা প্রস্তাবের কাঠামো
একটি শক্তিশালী গবেষণা প্রস্তাবে থাকতে হবে সুস্পষ্ট গবেষণা সমস্যা, সাহিত্য পর্যালোচনা, নির্দিষ্ট গবেষণা প্রশ্ন, পদ্ধতিগত স্পষ্টতা, প্রত্যাশিত অবদান। সুপারভাইজার ম্যাচিং। আন্তর্জাতিক পিএইচডি নির্বাচনে সুপারভাইজারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবেদনকারীকে অবশ্যই সম্ভাব্য সুপারভাইজারের গবেষণা আগ্রহ বিশ্লেষণ করতে হবে । তাদের চলমান প্রকল্পের সাথে নিজের প্রস্তাব সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রবণতা ও সম্ভাব্য দিকনির্দেশনা বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী দশকে বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।
২০২৩ সালে ৫২ হাজার ৭৯৯ শিক্ষার্থীর বিদেশযাত্রা একটি পরিসংখ্যান নয় এটি বাংলাদেশের বৈশ্বিক একাডেমিক অভিযাত্রার প্রতীক। ফুল-ফান্ডেড পিএইচডি এখন কেবল স্বপ্ন নয়; এটি পরিকল্পিত প্রস্তুতি, গবেষণার দক্ষতা ও কৌশলগত আবেদন প্রক্রিয়ার ফল। তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এই বৈশ্বিক জ্ঞানসম্পদকে কীভাবে জাতীয় উন্নয়নে কাজে লাগানো যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে রাষ্ট্রীয় নীতি, গবেষণা বিনিয়োগ ও দূরদর্শিতার ওপর।
লেখক: পিএইচডি স্কলার, মঙ্গলায়তন বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত