চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) প্রশ্নপত্র প্রণয়নে অসতর্কতার কারণে ৪১৬ জন পরীক্ষার্থীর ফলাফল প্রকাশ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে । ফলে গত ২৯ অক্টোবর ‘ডি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল স্থগিত করা হয়। আগামী ৬ নভেম্বর ন্যাশনাল কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত ৪১৬ জন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর পুনঃপরীক্ষা নেয়ার পর ওই ইউনিটের ফলাফল প্রকাশ করার কথা রয়েছে। ফলে ১০০ নম্বরের পুনরায় পরীক্ষা দিতে আসতে হবে তাদের।
৬ নভেম্বর সকাল সোয়া ১০ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা অনুষদে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। কোনো পরীক্ষার্থী যদি অনুপস্থিত থাকে তাহলে তার ভর্তি প্রার্থীতা বাতিল করা হবে বলে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। পুনঃপরীক্ষার পরেই সমন্বয়ের মাধ্যমে 'ডি' ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশ করা হবে।
যা ঘটেছিল সেদিন:
গত ২৮ অক্টোবর দুই শিফটে অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ‘ডি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা। এদিন সমাজবিজ্ঞান অনুষদের (১০১, ১০২ ও ১০৩) এই তিনটি কক্ষ নির্ধারিত ছিল ন্যাশনাল ও ব্রিটিশ কারিকুলামের শিক্ষার্থীদের জন্য। এতে ন্যাশনাল কারিকুলামের ইংরেজি মাধ্যমের ৪১৬ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল। প্রথম শিফটে পরীক্ষা শুরু হলে ন্যাশনাল কারিকুলামের পরীক্ষার্থীদের জন্য আলাদা প্রশ্ন সরবরাহ করা হয়নি।
নিয়মানুযায়ী ন্যাশনাল কারিকুলামের শিক্ষার্থীদের বাংলা প্রশ্নের উত্তর দেয়া আবশ্যিক হলেও, তাদের জন্য বাংলা অংশের প্রশ্ন ছাপানো হয়নি। ফলে তাদেরকে ব্রিটিশ কারিকুলামের প্রশ্ন দেয়া হয়। এবং এতে বাংলা প্রশ্ন ছিলো না। এসময় শিক্ষার্থীরা আপত্তি জানালে দায়িত্বরত শিক্ষকরা ব্রিটিশ কারিকুলামের প্রশ্নের ‘স্পেশাল ইংলিশ’ অংশটি উত্তর করার জন্য বলেন। পরে শিক্ষার্থীরা সেই নির্দেশনাই অনুসরণ করেন। অথচ এত বড় একটি অসঙ্গতি শিক্ষকরা জানার পরেও দ্বিতীয় শিফটের ক্ষেত্রেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।
জানা যায়, ঐদিন 'ডি' ইউনিটের প্রতিনিধি হিসেবে সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সেই তিনটি কক্ষে দুই শিফটেই দায়িত্ব পালন করেন লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী এস এম খসরুল আলম কুদ্দুসী। যদিও এই অধ্যাপকে শিক্ষা অনুষদে দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল। কিন্তু এদিন ডি ইউনিটের কো-অর্ডিনেটর শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল ফারুকের নির্দেশে সমাজবিজ্ঞান অনুষদের কিছু শিক্ষার্থীর জন্য বাংলা প্রশ্ন নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন অধ্যাপক ড. কাজী এস এম খসরুল আলম কুদ্দুসী। ১০১, ১০২, ১০৩ কক্ষে ওই শিক্ষার্থীদের আপত্তির বিষয়টি দায়িত্বরত শিক্ষকরা অধ্যাপক ড. কাজী এস এম খসরুল আলম কুদ্দুসী কে জানান। তিনি সমস্যা সমাধানে পরিস্থিতি বিবেচনায় ‘স্পেশাল ইংলিশ’ অংশের উত্তর দেয়ার নির্দেশ দেন বলে জানিয়েছেন সাংবাদিকদের।
তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে আমি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহামেদকে জানিয়েছিলাম। কারণ, তখন বাংলার অতিরিক্ত প্রশ্নও পর্যাপ্ত ছিল না যে শিক্ষার্থীদের আলাদা করে দেয়া যাবে। কিন্তু এ বিষয়ে সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন নিষ্ক্রিয় থাকায় পরিস্থিতি বিবেচনায় ন্যাশনাল কারিকুলামের শিক্ষার্থীদের ব্রিটিশ কারিকুলামের ‘স্পেশাল ইংলিশ’ অংশটি উত্তর দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলাম। তাছাড়া নেটওয়ার্কের সমস্যার কারণে ‘ডি’ ইউনিটের কো-অর্ডিনেটরকেও বিষয়টি জানাতে পারিনি।
তবে বিষয়টি অস্বীকার করে সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহামেদ বলেন, ঐদিন প্রশ্ন সংক্রান্ত এই সমস্যার বিষয়টি ড. খসরুল আলম কুদ্দসী আমাকে জানাননি। এমনকি দায়িত্বরত কোনো শিক্ষক বা কোনো লেভেল থেকেই আমাকে বিষয়টি জানানো হয়নি। কুদ্দুসী কোন দায়িত্বে এখানে এসেছেন আর ওই কক্ষগুলোতে কী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তা আমার জানা ছিল না। ইউনিটপ্রধানও সেটি আমাকে অবহিত করেননি।
ডি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় দুই শিফটে ন্যাশনাল কারিকুলামের মোট ৪১৬ জন শিক্ষার্থী প্রশ্ন নিয়ে জটিলতায় পড়েন। কিন্তু এ ঘটনার কিছুই জানতেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার এবং ইউনিট কো-অর্ডিনেটর অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল ফারুক।
চবি উপাচার্য বলেন, পরীক্ষার পরদিন ২৯ অক্টোবর বিকেলে কয়েকজন অভিভাবক উপাচার্যকে মুঠোফোনে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানান। ঐদিন সন্ধ্যায় ১৯ জন ইউনিট সদস্যকে নিয়ে বৈঠক করেন উপাচার্য। সেখানে এটি নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। সেখানে উপস্থিত থাকা দুই জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের বরাতে জানা যায়, সভায় তিন শিক্ষক ওই পরীক্ষায় অংশ নেয়া ন্যাশনাল কারিকুলামের সব শিক্ষার্থীকে বাংলা অংশের জন্য ৩০ নম্বর দেয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু অন্যান্য শিক্ষকদের আপত্তির মুখে সর্বসম্মতিক্রমে ৪১৬ শিক্ষার্থীর পুনঃপরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
'ডি' ইউনিটের কো-অর্ডিনেটর ও শিক্ষা অনুষদের প্রধান অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল ফারুক ভুলের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, এটা আমাদের নিজেদের ভুল। যেভাবেই হোক তাৎক্ষনিক আমি বিষয়টি জানতে পারিনি। কেউই আমাকে বিষয়টি জানায়নি। যদি কেউ আমাকে জানাতো, তাহলে আমি অবশ্যই ব্যবস্থা নিতাম। তাছাড়া কেউ লিখিত অভিযোগও দেয়নি। এমনকি আমি বিষয়টি একদিন পরে ২৯ তারিখ রাত সাড়ে ৭টার দিকে উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতারের কাছ থেকে জেনেছি।
তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে নিয়ে আরও বলেন, আমি পরীক্ষার প্রশ্ন আগে চেক না করায় বিষয়টি আমার অজানা ছিলো। তবে পরীক্ষার সময় বিষয়টি আমাকে জানানো উচিৎ ছিলো। তবে এতে কারো কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিলো না। নতুন করে পরীক্ষা নেয়ার ফলে কেউ বৈষম্যের শিকার হবে কিনা, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রশ্নের ক্যাটাগরি একই থাকবে। সবাইকে সমন্বিতভাবে মার্ক দেওয়া হবে।'
উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার সাংবাদিকদের বলেন, কয়েকজন অভিভাবক আমাকে বিষয়টি জানালে পরীক্ষা কমিটির সাথে বৈঠক করে ৪১৬জন শিক্ষার্থীর পরীক্ষা পুনঃরায় নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যাতে পরবর্তীতে কেউ কোন প্রশ্ন তুলতে না পারেন।