ববি শিক্ষার্থী হৃদয় হাওলাদার © টিডিসি ছবি
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. হৃদয় হাওলাদার যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটিতে ‘পলিটিকস’ বিষয়ে পিএইচডির সুযোগ পেয়েছেন। এ জন্য তিনি পেয়েছেন Newcastle University Overseas Research Scholarship (NUORS) ও Teaching Assistantship (TA)। পাশাপাশি তার গবেষণায় Queen’s University Belfast, Ireland-এর যৌথ তত্ত্বাবধান থাকবে। হৃদয় হাওলাদার তার স্কলারশিপের আওতায় বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ টাকার ফেলোশিপ পাবেন।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন মো.হৃদয় হাওলাদার। বিভাগটি প্রতিষ্ঠার পর পিএইচডির সুযোগ পাওয়া প্রথম শিক্ষার্থী তিনি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটিতে NUORS স্কলারশিপ পেয়েছেন। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে এই স্কলারশিপের আওতায় সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির পার্থক্য কভার করা হবে।
পলিটিকস বিষয়ে পিএইচডির পাশাপাশি গবেষণার ক্ষেত্রেও ইতোমধ্যে কাজ করেছেন হৃদয়। তার গবেষণার আগ্রহের মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অভিবাসন ও শরণার্থী অধ্যয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই শাসন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পরিবেশ রাজনীতি। এরই মধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন হৃদয়। তার গবেষণার মধ্যে ভারত-বাংলাদেশের পানি বিরোধের ভূরাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক প্রভাব, রোহিঙ্গা সংকট, যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জলনিরাপত্তা ও জলবায়ু রাজনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব উঠে এসেছে।
তার উল্লেখযোগ্য গবেষণার মধ্যে রয়েছে “The Rohingya Crisis in Bangladesh: Challenges and Prospects”। গবেষণাটি বিশ্ববিখ্যাত জার্নাল স্প্রিংগারের ‘ডিসকভার গ্লোবাল সোসাইটি’ জার্নালে প্রকাশিত হয়। গবেষণাটিতে রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
জলবায়ু ও পানিনিরাপত্তা নিয়েও গবেষণা করেছেন হৃদয়। “Hydrological Hegemony and US Strategic Engagement in Climate and Water Security” শিরোনামের গবেষণায় জলনিরাপত্তা, জলবায়ু ঝুঁকি, অভিবাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা নিয়েও তার গবেষণা রয়েছে। “US-China Rivalry and the Future of Global Security” শিরোনামের গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর ও ফাইভজি প্রযুক্তিকে ঘিরে দুই দেশের প্রতিযোগিতা এবং এর প্রভাব বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ওপর কীভাবে পড়ছে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশের পানি বিরোধ নিয়েও কাজ করেছেন হৃদয়। “Assessing Geopolitical and Socio-Economic Consequences of India-Bangladesh Water Disputes” শিরোনামের গবেষণায় আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন, দুই দেশের সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
এর আগে ডেনমার্কের Aalborg University-তে MSc in International Relations and Global Refugee Studies পড়তে যান হৃদয়। ওই সময় তার লক্ষ্য ছিল মাস্টার্স শেষ করে উত্তর আমেরিকায় পিএইচডির পথে এগিয়ে যাওয়া। তবে ডেনমার্কে যাওয়ার পর কাজের অনিশ্চয়তা, সিপিআর-সংক্রান্ত জটিলতা এবং বিভিন্ন বাস্তবতার কারণে সেখানে থাকা তার একাডেমিক পরিকল্পনার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
হৃদয় বলেন, অর্থ উপার্জন কখনো তার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল না। গবেষণা, উচ্চশিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক ক্যারিয়ার গড়াই ছিল তার মূল লক্ষ্য। এ কারণে ইউরোপে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক স্বপ্নকে গুরুত্ব দিয়ে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
অ্যালবর্গ ইউনিভার্সিটির নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভর্তি বাতিল করলে টিউশন ফির ৭৫ শতাংশ ফেরত পাওয়ার সুযোগ ছিল। একই সঙ্গে দেশে ফিরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সের চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ করার সুযোগও পান তিনি।
দেশে ফিরে নিজের একাডেমিক প্রোফাইল শক্তিশালী করতে গবেষণায় মনোযোগ দেন হৃদয়। ডেস্কভিত্তিক গবেষণার পাশাপাশি সুন্দরবনে মাঠপর্যায়ে গবেষণা করেন। তথ্য সংগ্রহ, গবেষণাপত্র লেখা, সংশোধন এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পে কাজের মাধ্যমে নিজের একাডেমিক প্রোফাইল তৈরি করতে থাকেন।
তবে দেশে ফেরার পর একাডেমিক কাজের পাশাপাশি সামাজিক নানা প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে বলে জানান হৃদয়। তার সাময়িক ও কৌশলগত দেশে ফেরাকে অনেকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখেছিলেন। এতে তার পরিবারকেও নানা কথা শুনতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
এই কঠিন সময়ে পরিবারের সদস্যরা তার পাশে ছিলেন। বাবা-মা, ভাই-বোন, শিক্ষক, পরামর্শদাতা, সহকর্মী ও বন্ধুদের সহযোগিতাকে নিজের এই সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখছেন হৃদয়।
গবেষণার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রকাশনা ও একাডেমিক কাজেও যুক্ত হয়েছেন তিনি। তার গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করে নিজের একাডেমিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছেন তিনি।
এখন যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি শুরু করতে যাচ্ছেন হৃদয় হাওলাদার। নিজের এই অর্জনকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখছেন না তিনি। তার মতে, এই যাত্রার পেছনে রয়েছে পরিবারের ত্যাগ, শিক্ষক-পরামর্শদাতাদের সহযোগিতা এবং কঠিন সময়ে পাশে থাকা মানুষদের বিশ্বাস।
নতুন এই একাডেমিক যাত্রার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন হৃদয়। তার লক্ষ্য গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি একজন দায়িত্বশীল ও বিনয়ী গবেষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা।