বিশ্ববিদ্যালয়ের আইএসএসির উদ্যোগে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান মিলনায়তনে সেমিনারে অতিথিরা © টিডিসি
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিটিউটের অধীনে তৃতীয় ভাষা হিসেবে চীনা ভাষা চালুর উদ্যোগ এবং প্রস্তাবিত চীনা ভাষা শিক্ষা কার্যক্রমকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক অগ্রযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এ উদ্যোগ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করতে পারে। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি সংস্কৃতিরও একটি ঐতিহ্য।
তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে চীনা ভাষার গুরুত্বও বাড়ছে।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ছাত্রবিষয়ক সেলের (আইএসএসি) উদ্যোগে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান মিলনায়তনে চীনের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।
বিশ্বরাজনীতিতে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ইবি উপাচার্য বলেন, ‘আমি মনে করি, বিশ্ব রাজনীতিতে চীন আগামী দিনের পরবর্তী আধিপত্যশীল রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে। কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের সঙ্গে প্রস্তাবিত সহযোগিতার আওতায় প্রাথমিকভাবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য তিন মাসের একটি বেসিক চীনা ভাষা কোর্স চালু করা হতে পারে। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন ও কর্মসূচির অগ্রগতির ভিত্তিতে এ কোর্সের মেয়াদ ১০ মাস কিংবা এক বছর পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে চীনা ভাষার স্থানীয় বা নেটিভ শিক্ষকদের সহযোগিতা পাওয়ার আশা করছে বিশ্ববিদ্যালয়। এ ধরনের সহযোগিতা শিক্ষার্থীদের যোগ্য শিক্ষকের কাছ থেকে সরাসরি ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষা শিক্ষার মান উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে প্রস্তাবিত মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিটিউটের অধীন একটি চায়নিজ স্টাডিজ বিভাগ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও জানান ইবি উপাচার্য।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের চীনা পরিচালক ড. ইয়াং হুই। তিনি চীনের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিক্ষা সহযোগিতা জোরদারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের প্রভাষক আকিব ইরফান আলোচক হিসেবে অংশ নেন। মূল প্রবন্ধে ড. ইয়াং হুই চীনের শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে ধারণা দেন।
তিনি বলেন, দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাক্-প্রাথমিক, বাধ্যতামূলক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি বিশেষ শিক্ষা এবং অব্যাহত শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। তিনি বিশেষভাবে চীনের ৯ বছর মেয়াদি অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আলোকপাত করেন এবং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে দেশটির সামগ্রিক শিক্ষা কাঠামো কীভাবে কাজ করে, সে বিষয়ে আলোচনা করেন।
আরও পড়ুন: কাগজে ১১০ শিক্ষার্থী, বাস্তবে একজনও নেই! শ্রেণিকক্ষে ছাগলের ক্লাস
ড. ইয়াং হুই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষা শিক্ষা আবার চালুর সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন। করোনা মহামারির সময় বন্ধ হয়ে যাওয়া ইবির চীনা ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয় ও কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের মধ্যে নতুন করে সহযোগিতার মাধ্যমে আবার চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রস্তাবিত এ উদ্যোগের মাধ্যমে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চীনা ভাষা শেখার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং চীনের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও জোরদার হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশে চীনা ভাষা শিক্ষা সম্প্রসারণে সাম্প্রতিক বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সহযোগিতা রয়েছে। নির্বাচিত স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষা শিক্ষা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ চীনা ভাষার শিক্ষক তৈরি করতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। বাংলাদেশে চীনা ভাষা শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রসারণ ও টেকসই কাঠামো গড়ে তুলতে স্থানীয় পর্যায়ে যোগ্য শিক্ষক তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
ড. ইয়াং হুই বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিক্ষা সহযোগিতা শুধু ভাষা শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এ সহযোগিতার ক্ষেত্র কারিগরি শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, ডিজিটাল শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা যেতে পারে। তিনি বাংলাদেশের শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চীনা ভাষা শিক্ষার সঙ্গে ব্যবসায়িক ও কারিগরি দক্ষতার সমন্বয়ে ‘চায়নিজ প্লাস’ কর্মসূচি চালুর প্রস্তাব করেন। এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ভাষাগত দক্ষতার পাশাপাশি পেশাগত ও ব্যবহারিক দক্ষতাও অর্জনের সুযোগ পেতে পারেন, যা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তাদের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন, ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. ইদ্রিস আলী এবং ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. আতিকুর রহমান। আন্তর্জাতিক ছাত্রবিষয়ক সেলের আহ্বায়ক ও পরিচালক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান অনুষ্ঠানটি সমন্বয় করেন।
সেমিনারে চীনের শিক্ষা ব্যবস্থা, বাংলাদেশে চীনা ভাষা শিক্ষার ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব এবং দুই দেশের মধ্যে একাডেমিক, কারিগরি, প্রযুক্তিগত ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার সম্ভাব্য বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কর্মকর্তা, শিক্ষক ও শিক্ষাবিদসহ চীনা ভাষা শিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উদ্যোগের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।