৩২ বছরে ১২ লাখ বৃক্ষরোপণ প্রকৌশলী টুটুলের, স্বপ্ন ২০ লাখ © সংগৃহীত
একটি গাছের চারা হয়তো খুব ছোট। কিন্তু সেই চারার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একটি ছায়াঘেরা ভবিষ্যৎ, এক টুকরো নির্মল বাতাস আর একটি সবুজ পৃথিবীর সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনাকে বুকে ধারণ করেই তিন দশকের বেশি সময় ধরে ছুটে চলেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আলিমুজ্জামান টুটুল। চাকরির বেতন থেকে শুরু করে বাড়তি উপার্জন—নিজের সামর্থ্যের প্রায় সবটুকুই ব্যয় করেছেন গাছের চারা রোপণ ও বিতরণে। ৩২ বছরে তাঁর হাতে রোপণ ও বিতরণ হয়েছে প্রায় ১২ লাখ গাছের চারা। এবার জীবনের বাকি সময়ে সেই সংখ্যা ২০ লাখে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত এই ইঞ্জিনিয়ার টুটুলের বৃক্ষপ্রেমের শুরু বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পড়ার সময় একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত ‘আমাদের দেশটা মরুভূমিতে পরিণত হতে যাচ্ছে’ শিরোনামের একটি লেখা তাঁর মনে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেখান থেকেই পরিবেশ রক্ষায় কাজ করার প্রত্যয় জন্ম নেয় তাঁর মনে।
১৯৯৫ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই বেতনের ১০ শতাংশ টাকা আলাদা করে রাখতেন গাছের চারা কেনার জন্য। তবে বৃক্ষরোপণের পরিধি বাড়াতে একসময় বাড়তি উপার্জনের জন্য বাড়ির নকশা ও ডিজাইনের কাজ শুরু করেন। সেই অতিরিক্ত উপার্জনের প্রায় পুরোটাই ব্যয় করতেন গাছের চারা কেনা ও বিতরণে। একপর্যায়ে গাছের পেছনে তাঁর মাসিক ব্যয় প্রায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
বিভিন্ন জাতের ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা সংগ্রহ করে তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের হাতে চারা তুলে দেওয়াকে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। ছুটির দিনে নোয়াখালী, ফেনী, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার স্কুল, কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চারা বিতরণ করেছেন।
প্রকৌশলী টুটুলের দেওয়া চারার মধ্যে রয়েছে বারোমাসি আম্রপালী, পেয়ারা ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। দ্রুত ফলনশীল গাছ শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার পেছনেও রয়েছে তাঁর বিশেষ উদ্দেশ্য। একটি শিশু যখন নিজের লাগানো গাছে ফুল বা ফল দেখতে পায়, তখন তার মধ্যে গাছের প্রতি ভালোবাসা আরও বাড়ে বলে মনে করেন তিনি। এভাবেই একজন শিশুর হাত ধরে আরেকটি গাছ, আরেকটি সবুজ স্বপ্ন ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি।
শুধু চারা বিতরণ করেই দায়িত্ব শেষ করেন না টুটুল। শিক্ষার্থীদের গাছের প্রয়োজনীয়তা ও পরিবেশ রক্ষার গুরুত্বও বোঝান। তাঁর মতে, গাছ শুধু অক্সিজেন ও ছায়াই দেয় না; ফল দেয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং বড় হয়ে পরিবারের জন্য আর্থিক সম্পদেও পরিণত হতে পারে।
দীর্ঘদিনের এই বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমে স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। ২০১০ সালে খুলনা বিভাগের সেরা সমাজসেবকের স্বীকৃতি পান প্রকৌশলী টুটুল। তবে কোনো পুরস্কার বা সম্মাননার আশায় তিনি এই কাজ করেননি। তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো নিজের হাতে দেওয়া একটি চারা যখন বড় হয়ে ফল দেয় এবং সেই ফল নিয়ে কোনো শিক্ষার্থী তাঁর কাছে ফিরে আসে।
৩২ বছরে প্রায় ১২ লাখ গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করেও থেমে নেই তাঁর পথচলা। বয়স বেড়েছে, শরীর আগের মতো শক্তিশালী নেই। কিন্তু সবুজের স্বপ্ন এখনও তরুণ। বর্তমানে তাঁর এই কাজে পাশে দাঁড়িয়েছে ছেলে সাকিব। বাবা-ছেলে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাড়ির নকশার কাজে গেলে সঙ্গে করে নিয়ে যান গাছের চারাও। সুযোগ পেলেই কাছাকাছি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেন সেই চারা।
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানিয়ে প্রকৌশলী টুটুল বলেন, জীবনের বাকি দিনগুলোতে এই সংখ্যাকে ২০ লাখে উন্নীত করাই আমার স্বপ্ন ও লক্ষ্য। গাছ আমাদের ছায়া দেয়, অক্সিজেন দেয়, বিপদের দিনে আর্থিক সাহায্যও দেয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হাতে যদি ১০টি টাকাও থাকে, আমি গাছই লাগানোর চেষ্টা করব।
তার কাছে একটি গাছ কেবল একটি চারা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া একটি সম্পদ। তাঁর বিশ্বাস, একজন মানুষ পৃথিবী থেকে চলে গেলেও তাঁর লাগানো একটি গাছ বহু বছর বেঁচে থেকে মানুষের উপকার করতে পারে।
তাই ১২ লাখের পথ পেরিয়ে এখন তাঁর লক্ষ্য ২০ লাখে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সবুজের এই অভিযাত্রা চালিয়ে যেতে চান তিনি। তাঁর স্বপ্ন—একদিন বাংলাদেশের প্রতিটি শিশু অন্তত একটি গাছ লাগাবে, প্রতিটি পরিবার বছরে অন্তত একটি করে গাছ রোপণ করবে। আর সেই স্বপ্নের পথ ধরেই এগিয়ে চলেছেন ইঞ্জিনিয়ার টুটুল— ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রকৌশলী, যার সবচেয়ে বড় পরিচয় একজন বৃক্ষ প্রেমী মানুষ।