বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
গত এক মাসে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অন্তত পাঁচটি উল্লেখযোগ্য সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সে সময়ের হামলা সংঘর্ষ ও আহতদের ছবি। © টিডিসি সম্পাদিত
দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) অস্থিরতা যেন থামছেই না। বিভিন্ন সময়ের সংঘর্ষ, হামলা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টি সম্প্রতি জাতীয় সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসছে। গত এক মাসে ক্যাম্পাসে অন্তত পাঁচটি উল্লেখযোগ্য সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কোনো ঘটনারই কার্যকর বিচার বা দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্যাম্পাসে অস্থিরতা কাটছেই না।
জানা যায়, গত ৩০ দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের ঘটনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গত ১৫ জুলাই হলে ডেকে নিয়ে শিক্ষার্থীর ওপর হামলা, আইন-সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মধ্যে সংঘর্ষ, ২০ জুলাই গণিত বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ, ৫ আগস্ট ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং ১৫ আগস্ট ইংরেজি ও অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ।
বারবার সংঘর্ষের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও পরবর্তী সময়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে এক ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তির অন্যতম কারণ প্রশাসনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এখন পর্যন্ত সংঘটিত কোনো সংঘর্ষের ঘটনায় দৃশ্যমান ও কার্যকর বিচার করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে সংঘর্ষে জড়িতদের মধ্যে শাস্তির ভয় কমে গেছে এবং ক্যাম্পাসে সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ক্যাম্পাসে স্থায়ী শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে শুধু সংঘর্ষের সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না; ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সংঘর্ষ এড়াতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ এবং সব পক্ষের মধ্যে সহাবস্থান নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ছাত্রীকে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ
গত রাত (১৫ আগস্ট) ছাত্রীকে প্রেমের প্রস্তাব ও উত্ত্যক্তের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ইংরেজি ও অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। রাত ৯টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলা সংঘর্ষে দুই বিভাগের অন্তত ১০ শিক্ষার্থী আহত হন বলে জানা যায়। এ সময় আহত শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে নেওয়ার পথে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে মারধর এবং চালককেও মারধরের অভিযোগ ওঠে।
হলে ডেকে শিক্ষার্থীর ওপর হামলা
গত ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিজয়-২৪’ হলে ডেকে নিয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ইনামুল হকের ওপর ইতিহাস বিভাগের কিছু শিক্ষার্থী হামলা করেন। হলের দ্বিতীয় তলার করিডোরে এ ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ইনামুল হক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. মোশাররফ হোসেন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অংকন এবং ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিবসহ ২০–২৫ জনকে অভিযুক্ত করেন।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থী সাকিবও ইনামুল হকের বিরুদ্ধে প্রক্টর অফিসে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। ঘটনা তদন্তের জন্য চার সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কমিটি এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি।
গণিত-গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মধ্যে সংঘর্ষ
এর পাঁচ দিন পর, ২০ জুলাই গণিত ও গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহের জন্য সাংবাদিকেরা উপস্থিত হলে তাঁরাও হামলার শিকার হন। সংঘর্ষের ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হলেও এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি কমিটি।
আইন-সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মধ্যে সংঘর্ষ
এরপর আইন ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায়ও কোনো বিচার করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
শিবির-ছাত্রদলের মধ্যে সংঘর্ষ
গত ৫ আগস্ট ‘অদম্য জুলাই’ মিছিলে বহিরাগত থাকার অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিবির-ছাত্রদলের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে দুই পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মনিরুল ইসলামের পায়ে রক্তক্ষরণ হয়। ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীও ঘটনাস্থলে আহত হন। সংঘর্ষের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর শিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করলেও দৃশ্যমান কোনো বিচার বা পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন,‘বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস জুড়ে সংঘর্ষের দায়ভার আমি প্রশাসনকেই দিবো। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতি জন্য বার বার সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে একটি মহল ও শিক্ষার্থীরা। যদি প্রশাসন অতীতের ঘটনা গুলোর সুস্থ তদন্তের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করত, তাহলে বার বার সংঘর্ষ ঘটত না, আমি এটাই মনে করি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী মুস্তাফিজুর রহমান সৌরভ বলেন,‘অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতে এ সকল সংঘর্ষের ঘটনা এড়ানো যেত। শাস্তি নিশ্চিত হলে সবার কাছে একটি মেসেজ যেত, যাতে করে এ সকল সংঘর্ষ আর ঘটত না। ঘটলেও সংঘর্ষের তীব্রতা বাড়ত না। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়ানোর জন্য প্রশাসনের উচিত সুস্থ তদন্তে অপরাধীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা ভঙ্গের আইনে নিয়ে এসে শাস্তি নিশ্চিত করা।’
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফ হোসেন শান্ত বলেন, ‘ইতিহাসের সাথে বাংলা বিভাগের জুনিয়র দ্বারা সিনিয়র সংঘর্ষ হলো তখন ওইটার বিচারহীনতায় পরবর্তীতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাথে আইন বিভাগ, গণিত সাথে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ ও অর্থনীতির সাথে ইংরেজী বিভাগের সংঘর্ষ এভাবে ধারাবাহিক ভাবে ডিপার্টমেন্ট বাই ডিপার্টমেন্ট চলতেই আছে। যদি অতীতের ঘটনার সুস্থ ভাবে বিচার হতো তাহলে এতো দূর পর্যন্ত গড়াতো না, যেটা আমি মনে করি।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মো. মেহেদী হাসান বলেন,‘যে সকল বিভাগের শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে জড়িয়েছে আমরা তাদের বিভাগের চেয়ারম্যানদের সাথে বসেছি। এই সংঘর্ষের পিছনে আমাদের মনে হয়েছে তাদের অস্বাভাবিক আচরণ দায়ী। তাদের কেউ মাদকাসক্ত থাকতে পারে। আমরা পুলিশের সাথে কথা বলেছি। তারা আমাদের হেল্প করতে চেয়েছে। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পরে যতগুলো ঘটনা ঘটেছে সবগুলো তদন্ত কমিটি আমি দ্রুত সময়ের মধ্যে করে ফেলেছি। তদন্ত কমিটি রিপোর্ট শৃঙ্খলা কমিটিতে জমা দিবে। তদন্ত কমিটি ও শৃঙ্খলা কমিটির সিন্ধান্ত হবে সিন্ডিকেটে। সিন্ডিকেট চূড়ান্ত সিন্ধান্ত গ্রহণ করবে।’
সার্বিক বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক মো. মামুন অর রশিদ বলেন, ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি রিপোর্ট জমা দিলে, বিচার নিশ্চিত করা হবে।