ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্র © টিডিসি ফটো
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) দুই দফায় সাইকিয়াট্রিক মেডিকেল অফিসার পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত নিয়োগ দিতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এ পদ শূন্য থাকায়, শিক্ষার্থীরা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে এবং ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই পদে মোট দুইবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি হয়। নিয়ম অনুযায়ী একটি পদের বিপরীতে কোরাম পূরণ হওয়ার জন্য অন্তত ৩ জন যোগ্য প্রার্থী থাকতে হয়, যা সে সময় পাওয়া যায়নি।
মেডিকেল সূত্রে জানা যায়, দুইবার বিজ্ঞপ্তি হয়েছে। কিন্তু কোরাম পূর্ণ না হওয়ায় এই নিয়োগগুলো সম্পন্ন হয়নি। প্রার্থীদের মধ্যে হয়ত একজনের সাইক্রিয়াট্রিতে এমসিপিএস বা সমমানের ডিগ্রি ছিল, আবার অন্যজনের হয়ত মাত্র ৬ মাসের একটি শর্ট-কোর্স বা ট্রেনিং ছিল, যা বিশেষজ্ঞ পদের জন্য পর্যাপ্ত নয়। তবে, তৎকালীন প্রশাসন একজনকে নিতে চাইলেও সার্বিক দিক বিবেচনা করে নাকচ করে দেয়।
নিয়োগের আবেদনের শর্তে বলা হয়েছে, প্রার্থীর কোন অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় হতে এম.বি.বি.এস ডিগ্রি থাকতে হবে। কমপক্ষে ১ (এক) বছরের পি.জি.টি. (সাইকিয়াট্রিক) সহ কোন হাসপাতাল অথবা সমপর্যায়ের সরকার অনুমোদিত কোন প্রতিষ্ঠানে সাইকিয়াট্রিক হিসাবে কমপক্ষে ২ (দুই) বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সাইকিয়াট্রিক স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী প্রার্থীদেরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এবং প্রার্থীর বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৩২ (বত্রিশ) বছর উল্লেখ করা হয়।
জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় উপস্থাপিত তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা–সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী রয়েছেন মাত্র ১.১৭ জন, আর সারা দেশে সরকারি খাতে কর্মরত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা মাত্র ৩৫০ জন। দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের তীব্র সংকট রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আত্মহত্যা প্রবণতা, প্রেমঘটিত সম্পর্ক, পারিবারিক কলহ, পরিবেশের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা, অতিরিক্ত চিন্তা, ক্যারিয়ার দুশ্চিন্তা, মুড সুইং, আত্মবিশ্বাসের অভাব, মৌলিক চাহিদার অপূর্ণতা, মানসিক চাপ, হতাশা, উদ্বিগ্নতা, প্যানিক ডিজঅর্ডার, ওসিডি, শারীরিক সমস্যা, পর্যাপ্ত ঘুমের ঘাটতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারসহ বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তার সমাধান কাউন্সেলিং ও চিকিৎসার মাধ্যমে দিয়ে থাকেন একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অতিরিক্ত মানসিক চাপ গুরুতর সংকট তৈরি করছে। শিক্ষকদের অর্ন্তকন্দল, পরীক্ষা সময়মতো না হওয়া, ফলাফলে বৈষম্য ইত্যাদি আমাদের মানসিক অবস্থাকে আরও ভেঙে ফেলছে। কখনো কখনো মনে হয় জীবনের কোন মূল্য নাই। এছাড়া, পারিবারিক সমস্যা, আর্থিক সংকট, সম্পর্কের জটিলতা, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক চাপ তো আছেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমস্যার কথা প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ করি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী সাদিয়া মাহমুদ মীম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি, ইভটিজিং, নিরাপত্তাহীনতা এবং নানা ধরনের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়ে থাকে। এসব অভিজ্ঞতা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে স্বাভাবিক শিক্ষা জীবন সামাজিক কার্যক্রম সংকুচিত ও ব্যাহত হয়। তাই একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা, অভিযোগ নিষ্পত্তির স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং ভুক্তভোগীদের জন্য মানসিক ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-প্রধান মেডিক্যাল অফিসার ডা. এস. এম. শাহেদ হাসান বলেন, শারীরিক রোগ বা ঠান্ডা-কাশি-নিউমোনিয়ার মতো সমস্যার চেয়ে মানসিক সমস্যা একটি পরিবারের জন্য অনেক বেশি দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এসব ক্ষেত্রে কোনো রকম বা ভালো মতন কাউন্সেলিং না করে কেবল একগাদা কড়া অ্যান্টি-সাইকোটিক বা ঘুমের ওষুধ লিখে দিলে রোগীর কোনো স্থায়ী উন্নতি হয় না। তাই ওষুধ ও সঠিক কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে একজন যোগ্য সাইক্রিয়াট্রিস্ট ও কাউন্সেলর প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সামগ্রিকভাবে চিন্তা করলে যদি মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ৫ শতাংশ (ধারণাগত তথ্য) মানুষেরও মানসিক কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজন হয়, তবে সংখ্যার দিক থেকে সেটি একটি বিশাল জায়গা। সাইকিয়াট্রিস্ট থাকলে রোগী দেখার পাশাপাশি কাউন্সেলিংয়ের সুবিধাও পাওয়া যাবে। ওয়ান-টু-ওয়ান কাউন্সেলিং করতে গেলে অনেক সময় লাগে, অথচ রোগীর চাপ বেশি থাকলে শর্ট্কাটে ছাড়তে হয়। তাই এখানে একজন প্রফেশনাল সাইকিয়াট্রিস্টের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাস্তব উদাহরণ উল্লেখ্য করে তিনি বলেন, ফার্মেসিতে পড়ুয়া এক নারী শিক্ষার্থী, যে পড়াশোনায় ভালো হওয়া সত্ত্বেও পারিবারিক ও মানসিক সমস্যার কারণে চরম আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিল। তার বাবা অত্যন্ত যত্নশীল হলেও পরিবারে মায়ের অনুপস্থিতি এবং অন্যান্য কারণে মেয়েটির মানসিক অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতি বিবেচনায় তাকে সাইক্রিয়েটিক সাজেস্ট করেছি। এমন অনেক কেস আসে যেগুলোর সমাধান আসলে সাইক্রিয়েটিকরাই দিতে পারেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের (ভারপ্রাপ্ত) চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের যে শর্তসমূহ দেওয়া হয়েছে সেই শর্তপূরণ করছে এমন কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। পরপর দুইটি নিয়োগেই কোরাম পূর্ণ হয়নি। এই চিকিৎসা খুবই সেনসিটিভ, তাই শর্তসমূহ শিথিল করা কঠিন তবে অভিজ্ঞতার জায়গায় একটু শিথিলতা আনা যায়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ থাকলে সঠিক কাউন্সেলিং মধ্যে আত্মা হত্যার প্রবণতা শূন্য কোটায় আনা সম্ভব। তবে, দ্রুততর সময়ের মধ্যে প্রশাসনের সাইক্রিয়েটিক নিয়োগ প্রদান করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে আমি জেনেছি এবং বিবেচনায় রাখছি। পর্যালোচনা করে পদক্ষেপ নিবো। আমি বিভাগে শিক্ষক থাকা অবস্থায় কাউন্সেলিং করেছি। এটা শিক্ষকদের দায়িত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সকল স্টেকহোল্ডার যদি তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করে অর্থাৎ শৃঙ্খলার মধ্যদিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে তাহলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের যে অবনতি তার অধিকাংশ সমাধান হয়ে যায়।