‘পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ ও বিশ্ব মিডিয়া: নৈতিক দায়বদ্ধতা ও আত্মপর্যালোচনা’ শীর্ষক সেমিনার © টিডিসি ফটো
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ, বিশ্ব গণমাধ্যমের ভূমিকা, তথ্যযুদ্ধ, সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও মানবিক দায়বদ্ধতা নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেমিনারে যুদ্ধকালীন সংবাদ পরিবেশনে সত্যতা যাচাই, মানবিক মর্যাদা, ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক আইন এবং গণমাধ্যমের নৈতিক দায়িত্বের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের উদ্যোগে ‘পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ ও বিশ্ব মিডিয়া: নৈতিক দায়বদ্ধতা ও আত্মপর্যালোচনা’ শীর্ষক এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক গ্রেগরি জে. সিমনস। বক্তব্য দেন ঢাকায় নিযুক্ত ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমী জাহানাবাদী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন এবং ঢাকায় নিযুক্ত রুশ ফেডারেশনের রাষ্ট্রদূতের প্রেস সেক্রেটারি সোফিয়া কুতেপোভা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শাহ মো. নিসতার জাহান কবীর।
মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক গ্রেগরি জে. সিমনস পশ্চিমা গণমাধ্যমের ভূমিকা ও যুদ্ধের তথ্যগত এবং মনস্তাত্ত্বিক দিক নিয়ে আলোচনা করেন। তার বক্তব্যে প্রচলিত ‘Fourth Estate’ ধারণার সমালোচনা, বিকল্প গণমাধ্যমের উত্থান এবং যুদ্ধের সময় তথ্য ও বয়ান নিয়ন্ত্রণের বিষয় উঠে আসে।
সাইমনসের মতে, পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রচলিত ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ ধারণা কার্যকর নেই। তার বক্তব্য অনুযায়ী, গণমাধ্যম শুধু তথ্য জানানোতেই সীমাবদ্ধ নয়, জনমতকে নির্দিষ্ট দিকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি তথ্য ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াইও চলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমী জাহানাবাদী বলেন, যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো ‘মিডিয়া যুদ্ধ’। তার অভিযোগ, পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমে ফিলিস্তিন ও গাজার বাস্তুচ্যুত মানুষকে একভাবে এবং ইসরায়েলকে অন্যভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। পশ্চিমাদের এই যুদ্ধের বয়ান বা ন্যারেটিভ সম্পূর্ণ অন্যায় ও পক্ষপাতদুষ্ট।
স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা সম্পর্কে জাহানাবাদী বলেন, কোনো পক্ষের হয়ে নয়, বরং সত্য, ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির পক্ষে থাকা উচিত গণমাধ্যমের। যুদ্ধের সময় হাসপাতাল, শিশু, বিদ্যালয়, নারী ও ঐতিহাসিক স্থাপনায় হামলা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আহ্বান জানান তিনি।
ইরানের রাষ্ট্রদূত দাবি করেন, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রয়েছে এবং দেশটির কোনো ভূখণ্ড দখল হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের ওপর তথাকথিত বিজয় কতটা হয়েছে, তা বিচার করার দায়িত্ব তিনি শ্রোতাদের ওপর ছেড়ে দেন।
অন্যদিকে, রুশ ফেডারেশনের রাষ্ট্রদূতের প্রেস সেক্রেটারি সোফিয়া কুতেপোভা বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাত শুরুর আগে সামরিক, রাজনৈতিক ও প্রচারণামূলক প্রস্তুতির পরিসর ও ধরন বড় ধরনের সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। ইরানের বিরুদ্ধে এই দায়িত্বজ্ঞানহীন আক্রমণের পূর্বে সামরিক, রাজনৈতিক এবং প্রচারণামূলক প্রস্তুতি যে পরিসর ও চরিত্রের ছিল, তা এই সংকেতই দিচ্ছিল যে এক বিরাট সংঘাত শুরু হতে যাচ্ছে।
তার মতে, সংঘাতের পর ইরান নিজেকে একটি স্থিতিস্থাপক ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সহজ লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারেনি।
সাংবাদিকতার নৈতিকতার ওপরও গুরুত্ব দেন সোফিয়া কুতেপোভা। রুশ দূতাবাসের প্রেস সেক্রেটারি হওয়ার আগে সংবাদমাধ্যমে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের জন্য সত্য এবং তথ্য যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিডিয়া কর্মীদের জন্য সত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আমাদের দর্শক ও পাঠকদের সঠিক তথ্য প্রদান ও নিখুঁত থাকার জন্য তথ্য যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন বলেন, যুদ্ধ কেবল সেনাবাহিনী, সরকার বা রাজনৈতিক স্বার্থের মধ্যকার সংঘর্ষ নয়। এর গভীরতম স্তরে, যুদ্ধ হলো একটি মানবিক ট্র্যাজেডি। সাংবাদিকতার তিনটি নৈতিক দায়িত্ব তুলে ধরে উপাচার্য বলেন, সত্য, মানবিক মর্যাদা এবং প্রাসঙ্গিকতা ও ভারসাম্য বজায় রাখা সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। যুদ্ধকালীন তথ্য জনমত ও আন্তর্জাতিক ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে উল্লেখ করে তিনি রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
সেমিনারের সভাপতির বক্তব্যে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শাহ মো. নিসতার জাহান কবীর আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বিশেষভাবে ইরানের রাষ্ট্রদূত, রুশ দূতাবাসের প্রেস সেক্রেটারি সোফিয়া কুতেপোভা, উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক গ্রেগরি জে. সিমনসের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিনা শারমীন, শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক, আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আহমদ ইহসানুল কবীরসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।