পর্ব-১
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুয়া সনদে চাকরি © টিডিসি সম্পাদিত
নামসর্বস্ব ও বিতর্কিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুয়া সনদ দেখিয়ে এক যুগের বেশি সময় ধরে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) চাকরি করছেন অন্তত ১০ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী চাকরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রশাসনের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির সুযোগ নিয়ে এই ভুয়া সনদ দেখিয়ে তারা বছরের পর বছর চাকরি করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতাও উত্তোলন করে যাচ্ছেন। প্রাথমিক তদন্তে তাদের নাম পাওয়া গেলেও আরও কমপক্ষে ডজনখানেক ভুয়া সনদ ও অভিজ্ঞতা জালিয়াতি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি করে যাচ্ছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বিগত সরকারের আমলে বেরোবির উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক ড. আব্দুল জলিল মিয়া। তিনি বেরোবির দ্বিতীয় উপাচার্য হিসাবে যোগদান করেন ২০১১ সালের ৮ জানুয়ারি। মেয়াদপূর্তির আগেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে তিনি উপাচার্যের পদ থেকে ২০১৩ সালের ৭ মে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তার সময়কালে তিনি বেরোবির একটি দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন।
জানা যায়, অধ্যাপক ড. আব্দুল জলিল মিয়ার আমলে নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে অ্যাডহক বা অস্থায়ী ভিত্তিতে এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে তারা দেশের নামসর্বস্ব ও বিতর্কিত বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ভুয়া প্রতিষ্ঠানের জাল সনদপত্র জমা দিয়ে চাকরি স্থায়ী করেন এবং পরবর্তীতে পদোন্নতিও বাগিয়ে নেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ তদন্তে এই ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সনদের জালিয়াতি ও অসংগতি প্রকাশ পায়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, অভিযুক্তদের নামে কোনো সনদ কখনও ইস্যু করা হয়নি। এই তালিকায় বর্তমান প্রশাসনের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীও জড়িত রয়েছেন।
এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী হলেন—বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা দপ্তরের সহকারী পরিচালক সোহেল রানা, কেন্দ্রীয় ভাণ্ডারের সহকারী স্টোর অফিসার রেহমান সরকার, ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী রেজিস্টার (গ্রেড-২) মো. এমদাদুল হক, বাংলা বিভাগের সহকারী রেজিস্টার (গ্রেড-২) মো. মনিরুজ্জামান, সেন্ট্রাল লাইব্রেরি এন্ড ইনফরমেশন সেন্টারের ক্যাটালগার মো. মাহাফুজার রহমান, স্টুডেন্ট ও ক্যাশ শাখার উপ-রেজিস্ট্রার মো. মাহবুবার রহমান, ইইই বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার মো. শাহীদ আল মামুন, বিজয় ২৪ হলের সেকশন অফিসার আতিকুজ্জামান সুমন, সিনিয়র সেমিনার সহকারী আবু তাহের মন্ডল এবং সেন্ট্রাল লাইব্রেরি এন্ড ইনফরমেশন সেন্টারের ক্যাটালগার মো. আলমগীর হোসেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সোহেল রানা রয়েল ইউনিভার্সিটি অফ ঢাকা থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তার কাগজপত্র, সনদের সত্যতা যাচাই করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি চিঠি রয়েল ইউনিভার্সিটি অফ ঢাকা’কে পাঠানো হয়। রয়েল ইউনিভার্সিটি অফ ঢাকা থেকে জানানো হয়, এরকম সনদের কোনো ইস্যু তারা করেননি। একইভাবে রেহমান সরকারের চাকরিতে যোগদানের সময় দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করা স্নাতকোত্তরের সনদ জমা দিয়েছিল। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার সনদের সত্যতা যাচাই করার জন্য দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জানানো হয় এমন কোনো সনদের ইস্যু তারা করেনি।
অনুরূপভাবে উপ-রেজিস্ট্রার মো. মাহবুবার রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার মো. শাহীদ আল মামুন, সেকশন অফিসার আতিকুজ্জামান সুমন, সহকারী রেজিস্টার (গ্রেড-২) মো. মনিরুজ্জামান—তারা সবাই দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করেন বলে জানা যায়। কিন্তু দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরের সনদ যাচাইয়ের পাঠানো হলে তারা সনদের কোনো ইস্যু করেননি বলে চিঠির মাধ্যমে জানিয়ে দেয়।
এছাড়াও আরো কয়েকজন কর্মকর্তা যারা দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর এবং ডিপ্লোমা করেছেন। তাদের সনদ পুরাপুরি ভুয়া বলে চিঠি দিয়েছেন ওই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
তারা হলেন—সেন্ট্রাল লাইব্রেরি এন্ড ইনফরমেশন সেন্টারের ক্যাটালগার মো.আলমগীর হোসেন, সেন্ট্রাল লাইব্রেরি এন্ড ইনফরমেশন সেন্টারের ক্যাটালগার মো. মাহাফুজার রহমান। মাহাফুজার রহমান স্নাতকোত্তর এবং ডিপ্লোমা করেছেন দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হলে তার দুটোই সনদ ও ডিপ্লোমা পুরাপুরি ভুয়া বলে জানিয়েছেন। সেন্ট্রাল লাইব্রেরি এন্ড ইনফরমেশন সেন্টারের ক্যাটালগার মো. আলমগীর হোসেন এর সত্যতা যাচাই করতে পুলিশ ভেরিফিকেশন করা হয়। সেখানে তার স্নাতকোত্তর সত্য নয় বলে প্রতিবেদন এসেছে।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন বলে জানা যায়। এছাড়াও আবু তাহের মণ্ডলের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর দুটি দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করা। এবং দুটিই ভুয়া বলে ঐ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জানানো হয়েছে। এসব কর্মকর্তার সনদ যে ভুয়া—সেসব প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, এই ভুয়া সনদে চাকরি করা ১০ জনের একদিনের জন্য চাকরির করার অধিকার নেই বা নৈতিক অধিকার হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারণে বিষয়টি দীর্ঘদিন উপেক্ষিত হয়ে আছে। আড়ালে পড়ে আছে ভুয়া সনদে চাকরি করা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এই ১০ জন ছাড়াও এই তালিকায় আরও যুক্ত আছে একাধিক কর্মকর্তা কর্মচারী।
ইতোমধ্যেই সনদ জালিয়াতির দায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বেশ কয়েকজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং কয়েকজনের পদোন্নতি স্থগিত রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে জাল সনদে চাকরি করা অভিযুক্ত এসব কর্মকর্তা কর্মচারীদের সাথে কথা বললে তারা বিষয়টি অস্বীকার করেন। তারা জানান যে—যেখানে পড়াশোনা করছেন সেখান থেকে ডিগ্রি নিয়েছেন। এর সকল কাগজপত্র তাদের কাছে রয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার ড. মো. ফেরদৌস রহমান বলেন, আমরা ইতোমধ্যে কয়েকজনের রিপোর্ট হাতে পেয়েছি এবং আরো কয়েকজনের রিপোর্ট তদন্তাধীন রয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজনের পদোন্নতি বন্ধ রয়েছে এবং দুই একজনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) রংপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের একটি দল ক্যাম্পাসে এসে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও প্রমাণাদি সংগ্রহ করেছে।