ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় © সংগৃহীত
জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মিত হচ্ছে স্থায়ী জুলাই স্মৃতিফলক। দীর্ঘদিন যাবত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে থাকা আন্দোলনের বিভিন্ন স্লোগান এবং প্রতিবাদী গ্রাফিতি সময়ের বিবর্তনে ফিকে হয়ে যাওয়ায় জুলাইয়ের স্মৃতি রক্ষার্থে এই উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আগামী পহেলা আগস্ট ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানের দিনে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ হ ম এহছানুল হক মিলন এই স্থায়ী স্মৃতিফলক উদ্বোধন করার কথা রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্নাতক প্রথম বর্ষের (২০২৫-২৬) নবীনবরণে শিক্ষামন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হাতে নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর অংশ হিসেবে ক্যাম্পাসের মেইন গেট রঙ করার কথা রয়েছে। তবে গেটের দেয়ালে জুলাইয়ের বিভিন্ন স্লোগান ও গ্রাফিতি থাকায় সেক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের মতামত চায় প্রক্টরিয়াল বডি। পরপর দুদিন আয়োজিত এই সভায় মেইন গেট রঙ করে বিকল্প ব্যবস্থায় স্থায়ীভাবে স্মৃতি সংরক্ষণের ব্যাপারে মত দেয় শাখা ছাত্রদল ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা, বিপরীত মতামত দেয় শাখা ছাত্রশিবির ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় ছাত্রশক্তি।
তবে প্রক্টর অফিসে আয়োজিত সভায় আজ বিরোধিতা করলেও গতকাল এই প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়েছিলেন বৈছাআ আহবায়ক এস এম সুইট। সভা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যায় জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতৃবৃন্দ। সেখানে উপাচার্যের সাথে আলোচনার পর তারাও এ ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের মতামতের প্রেক্ষিতে সম্মতি দিয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে প্রশাসন বিকল্প যে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে তাতে সমর্থন জানিয়েছে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন।
জানতে চাইলে ছাত্রশক্তির আহবায়ক ফুয়াদ হাসান বলেন, ভিসি স্যার এগুলো স্থায়ীভাবে সংরক্ষণে তার পদক্ষেপের ব্যাপারে আমাদের জানিয়েছেন। আমরা শুধু ছাত্র সংগঠন নয়, সকল শিক্ষার্থীর মতামত নিতে বলেছি। প্রশাসন ডেমোটা আগে উপস্থাপন করবে। সেটা শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হলে পরবর্তীতে গেটের স্মৃতি মোছা যেতে পারে। হুট করে স্মৃতি মুছে ফেলা হলে তা বিরূপ প্রতিক্রিয়া দিবে।
ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি ইসমাইল হোসেন রাহাত বলেন, জুলাই শুধুমাত্র স্মৃতিফলকে ধারণের বিষয় নয়, জুলাই হৃদয়ে ধারণ করার বিষয়। গেটে স্মৃতিচিহ্ন গুলো আছে মানেই যে সবাই জুলাই চেতনা ধারণ করে বিষয়টা এমন না। আবার এই অভ্যুত্থানের স্মৃতি গুলো হেলাফেলায় হারিয়েও যেতে দেওয়ার কোন জায়গা নেই। তাই স্মৃতি গুলো সংরক্ষণে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রশাসন যে সিদ্ধান্ত নেবে তাতেই আমাদের সম্মতি রয়েছে।
ইবির বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহবায়ক এস এম সুইট গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘জুলাই মাসে জুলাইয়ের স্মৃতি মুছে ফেলা যাবে না। আমরা প্রশাসনকে জানিয়েছি আগে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ বাস্তবায়ন করতে হবে। এরপর প্রশাসন জুলাই স্মৃতি যথাযথভাবে সংরক্ষণের মাধ্যমে চাইলে প্রধান ফটকে রং করতে পারে।’
শাখা ছাত্রদলের আহবায়ক মাসুদ রুমি মিথুন বলেন, মেইন গেটে এখনো নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কিছু কিছু স্লোগান, কথার অংশ চোখে পড়ে। আমরা দাবি জানিয়েছি এগুলো মুছে ফেলতে। এছাড়া বর্তমান ভিসি স্যার নিজেও আমাদের মতোই জুলাইয়ে রাজপথে থেকেছেন, তিনিও জুলাইকে ধারণ করেন। প্রশাসন যেহেতু বলেছে জুলাইয়ের স্মৃতি গুলো স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, আমরা সেই সিদ্ধান্তে আস্থা রাখছি।
এদিকে সদ্য দায়িত্বে আসা প্রশাসন জুলাইয়ের স্মৃতিকে মুছে ফেলতে চায় - এমন একটি প্রচারণা চলছে ক্যাম্পাস জুড়ে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা। অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেট রঙ করাকে ষড়যন্ত্রের অংশ এবং জুলাইয়ের চেতনা বিরোধী কর্মকাণ্ড হিসেবেই ভাবছেন। তবে, প্রশাসন জুলাইকে ধারণ করে না কিংবা কৌশলে জুলাই গ্রাফিতে মুছে ফেলা হচ্ছে বলে যে প্রচারণা চলছে, তা অপকৌশল ও বিভ্রান্তিকর বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান।
ইবি উপাচার্য বলেন, যদি গেট রঙ নাও করা হয়, তাহলেও এই স্মৃতিচিহ্ন গুলো আজীবন থাকবে না। রোদ, বৃষ্টি বা সময়ের বিবর্তনে গেটের রঙ নষ্ট হতে থাকবে, একসময় তা হারিয়ে যাবে। কারো কাছ থেকে দাবি না আসলেও প্রশাসন জুলাইকে ধারণ করে বিধায় স্ব উদ্যোগে স্থায়ী স্মৃতিফলক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ক্যাম্পাসে আসছেন বিধায় তাঁকে দিয়ে প্রাথমিকভাবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে। এরপরে এই গেটের আদলেই সরকারের টেন্ডার প্রক্রিয়া মেনে আরেকটি ডামি গেট নির্মাণ করা হবে যাতে এই গ্রাফিতি, স্মৃতিচিহ্ন গুলো অক্ষুণ্ণ থাকবে। ডামি গেটের কাজ শেষ করে তারপরেই এই গেট রঙ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের আবেগ, অনুভূতি, তাদের দাবীর সাথে আমি সম্পুর্ণ একমত। কারণ তাদের মতো আমি নিজেও একজন সক্রিয় জুলাই যোদ্ধা এবং দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদ বিরোধী অবস্থান আমার ছিলো। সেই জায়গা থেকে আমি কৌশলে জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি মুছে ফেলবো - এটা অমূলক, অপপ্রচার। কালের বিবর্তনে এই স্মৃতিগুলো হারিয়ে যাবে বিধায় ই এগুলো স্থায়ী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ইঞ্জিনিয়ার অফিসকে সেভাবেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্থায়ী স্মৃতিফলকটি গেটের পাশেই অবস্থান করবে এবং সবাই তা দেখলেই ইবিতে জুলাই আন্দোলনের ব্যাপারে ধারণা পাবে।