প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ © টিডিসি ফটো
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) দুই দিনব্যাপী পঞ্চম রবীন্দ্র-নজরুল সংগীত উৎসবের সমাপনী দিনে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, সাহিত্য ও সংগীতকে উৎসর্গ করে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘নজরুল-পর্ব’।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। অনুষ্ঠানে সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, চারুকলা ও সংগীত বিভাগের গ্র্যাজুয়েটরা যাতে আরও সহজে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মহলে কাজ চলছে—যা দেশের সাংস্কৃতিক বিকাশকে তৃণমূল স্তরে আরও বেগবান করবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিনা শারমিন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান ড. অনিমা রায়।
সমাপনী অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, কর্ম, সাহিত্য ও সংগীতচর্চা নিয়ে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে দেশের খ্যাতিমান নজরুলসংগীত শিল্পী এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সংগীত পরিবেশন করেন। নজরুলের সাম্য, মানবতা, বিদ্রোহ ও প্রেমের চেতনাকে ধারণ করে পরিবেশিত সংগীত ও সাংস্কৃতিক আয়োজন দর্শকদের মুগ্ধ করে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ মানবজীবন, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতায় সংগীতের অপরিসীম গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “সংগীত হলো মানুষের আত্মিক ও মৌলিক অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। ইতিহাস এবং আধ্যাত্মিকতার প্রতিটি স্তরেই সংগীতের প্রভাব অত্যন্ত জোরালো। আমাদের বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের অবদান চিরন্তন ও অপরিসীম। তাঁরা আমাদের জাতীয় জীবনের আইকন। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁদের এই অনন্য সৃষ্টি ও সাহিত্যকর্মকে আরও বেশি ছড়িয়ে দিতে হবে।”
নিজের কৈশোরের স্মৃতিচারণ করে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের কথাও তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংগীত, চারুকলা ও নাট্যকলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীরা যাতে সহজেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সুযোগ পান, সেজন্য একটি কার্যকর ও সরাসরি কর্মসংস্থানের পথ তৈরির বিষয়ে কাজ চলছে।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিনা শারমিন বলেন, “প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক বোধ জাগ্রত রাখতে সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতিচর্চার গুরুত্ব অপরিসীম। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের দর্শন নতুন প্রজন্মকে আলোকিত, সহনশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের এ আয়োজন নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।”
সভাপতির বক্তব্যে সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান ও অনুষ্ঠানের সভাপতি ড. অনিমা রায় বলেন, “শুদ্ধ সংগীত চর্চা এবং আমাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিতে তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ও আশাব্যঞ্জক পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ আয়োজিত এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্যই হলো আমাদের মহান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া।”
তিনি আরও বলেন, “সংস্কৃতি হলো একটি দেশের আয়না। আমরা কেবল বিনোদনের জন্য গান করি না; সংগীত মানুষের মনস্তত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করে। একজন হতাশ মানুষকে সুস্থ করে তুলতে এবং পথভ্রষ্টকে সঠিক পথ দেখাতে সংগীতের সুর ও রাগ এক ধরনের থেরাপি বা মেডিটেশন হিসেবে কাজ করে। এই মহৎ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত আমাদের শিক্ষার্থীদের যথাযথ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন প্রয়োজন। সংস্কৃতির এই লড়াইয়ে যারা পাশে দাঁড়ান, তারাই প্রকৃত দেশপ্রেমিক।”
আয়োজকরা জানান, দুই দিনব্যাপী এ উৎসবের প্রথম দিন ‘রবীন্দ্র-পর্ব’-এ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য ও সংগীতকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। সমাপনী দিনে ‘নজরুল-পর্ব’-এর মাধ্যমে জাতীয় কবির অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্যবাদী চেতনা এবং সাংস্কৃতিক অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
উৎসবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সংগীতানুরাগীরা অংশগ্রহণ করেন। দুই দিনের এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্র ও নজরুল চর্চার ধারাবাহিকতা আরও সমৃদ্ধ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন ।