শিক্ষার্থীদের হাতে বনরুটি ও ডিম © সংগৃহীত
কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করতে চালু করা স্কুল ফিডিং (মিড-ডে মিল) প্রকল্পেও দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের স্কুলগুলোতে নিম্নমানের ও পচা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। দুর্গন্ধযুক্ত অপুষ্টিকর খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অতি লোভের খেসারত দিচ্ছে শিশুরা। এসব খাবার খেয়ে শিশুদের অসুস্থ হওয়ার ঘটনা বাড়ছে।
এ সমস্যা উত্তোরণে প্রাথমিকের মিড-ডে মিলে ব্যাপক পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরিকল্পনার মধ্যে মিড ডে মিলে ড্রাই ফ্রুটস যুক্ত করা, খাবার গ্রহণের সময় প্রধান শিক্ষককে খাবারের মান যাচাই করে নেওয়ার মতো নির্দেশনা আসতে যাচ্ছে।
খাদ্যের মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে খাদ্যের মান ও পরিমাণ স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সঠিক আছে কিনা তা নিশ্চিত হতে হবে; নির্ধারিত তারিখ ও সময়ে খাদ্য গ্রহণ ও বিতরণ; খাদ্যদ্রব্যের ধরণ অনুযায়ী বিদ্যালয় পর্যায়ে উপযুক্ত সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে খাদ্যের গুণগত মান বজায় থাকে; বিশেষ করে বনরুটি তাজা, নরম ও সঠিকভাবে মোড়কজাত কিনা পরীক্ষা করতে হবে; প্যাকেজিং অক্ষত, ছিঁড়ে যাওয়া বা আর্দ্রতা মুক্ত এবং পচন, ফাঙ্গাস বা দুর্গন্ধমুক্ত হতে হবে।
এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট কমিটি মিড-ডে মিলের খাবার বুঝে নেবে। বিশেষ করে হেডমাস্টার (প্রধান শিক্ষক) খাবার বুঝে নেবে। খাবার নেওয়ার সময় নাক দিয়ে স্মেল (গন্ধ) নিলেই খাবার ভালো না খারাপ সেটি বোঝা যাবে।’
মিড ডে মিলে ড্রাই ফ্রুটস যুক্ত করা হচ্ছে জানিয়ে ড. মিলন আরও বলেন, ‘ড্রাই ফ্রুটস যুক্ত করার পাশাপাশি শিশু শিক্ষার্থীদের খাবারে আমরা আরও ক্যালরি যুক্ত করতে চেষ্টা করছি। শিক্ষার্থীরা যেন বেশি পুষ্টি পায় সেই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, শিশুদের অপুষ্টি ও ক্ষুদা প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতিতে বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু করে সরকার। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ উদ্যোগ বর্তমানে দেশের ১৫০টি উপজেলার ১৯ হাজার ৪১৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এর আওতায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থী নিয়মিত খাবার পাচ্ছে।
স্কুল ফিডিং কর্মসূচির প্রধান উদ্দেশ্য হলো- কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়ার হার কমানো। এজন্য শিক্ষার্থীদের খাদ্য তালিকায় রাখা হয়েছে বানরুটি, সেদ্ধ ডিম, কলা, ইউএইচটি দুধ এবং ফর্টিফায়েড বিস্কুট।
শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে সরকারের এ উদ্যোগ দেশব্যাপী প্রশংসা পেলেও মাঠপর্যায়ে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে বানরুটি, ডিম ও কলা সরবরাহে মান নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন স্কুল পচা ডিম ও কলা সরবরাহের অভিযোগ ওঠে। অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থও হয়ে পড়েন।
স্থানীয় পর্যায়ে খাবার সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োজিত এজেন্টরা নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দাম দিয়ে নিম্নমানের রুটি কেনা, আগেভাগে ডিম সেদ্ধ করে রাখার কারণে খাবার নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের হাতে কাঁচা বা পচা কলাও দেওয়া হচ্ছে।
‘মিড-ডে মিল প্রকল্পে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না। অনিয়ম রোধে আমরা কিছু পরিকল্পনা করেছি। এটি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বিষয়গুলো চূড়ান্ত হওয়ার পর আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাব। মিড-ডে মিল নিয়ে কোনো অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’—ববি হাজ্জাজ, প্রতিমন্ত্রী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়
গত মার্চে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় কয়েকটি বিদ্যালয়ে নিম্নমানের ও পচা কলা সরবরাহের ঘটনা সামনে আসে। বিষয়টি জানাজানি হলে অধিকাংশ বিদ্যালয় সেই কলা ফেরত পাঠায়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। ফলে ওই দিন অনেক শিক্ষার্থী বিস্কুট পেলেও কলা থেকে বঞ্চিত হয়। যদিও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সমস্যা খুব সীমিত সংখ্যক, অর্থাৎ ৮ থেকে ১০টি বিদ্যালয়ের মধ্যেই ছিল।
গত ২২ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার শংকরবাটি ১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিডডে মিলের খাবার খেয়ে অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওই দিন শিক্ষার্থীদের খাবারের আইটেম ছিল পাউরুটি, দুধ, কলা ও ডিম। খাবার গ্রহণের কিছুক্ষণের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বমি, পেটব্যথা ও চোখে জ্বালাপোড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এসব সমস্যা সমাধানে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
নির্দেশনায় খাদ্যের মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে খাদ্যের মান ও পরিমাণ স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সঠিক আছে কিনা তা নিশ্চিত হতে হবে; নির্ধারিত তারিখ ও সময়ে খাদ্য গ্রহণ ও বিতরণ; খাদ্যদ্রব্যের ধরণ অনুযায়ী বিদ্যালয় পর্যায়ে উপযুক্ত সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে খাদ্যের গুণগত মান বজায় থাকে; বিশেষ করে বনরুটি তাজা, নরম ও সঠিকভাবে মোড়কজাত কিনা পরীক্ষা করতে হবে; প্যাকেজিং অক্ষত, ছিঁড়ে যাওয়া বা আর্দ্রতা মুক্ত এবং পচন, ফাঙ্গাস বা দুর্গন্ধমুক্ত হতে হবে। প্যাকেটের গায়ে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং নেট ওজন (১২০ গ্রাম) উল্লেখ আছে কিনা তা যাচাই করতে হবে; ডিম ফাটা, দুর্গন্ধযুক্ত ও পিচ্ছিলতা বা দৃশ্যমান দূষণ আছে কিনা দেখতে হবে; কলা দাগ বা পোকামুক্ত হতে হবে, বেশি পাকা বা পঁচা কলা গ্রহণ বা বিতরণ করা যাবে না; ইউএইচটি মিল্ক ও ফর্টিফাইড বিস্কুটের ক্ষেত্রে প্যাকেজিং অক্ষত, প্যাকেটের গায়ে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং নেট ওজন উল্লেখ আছে কিনা তা যাচাই করার কথা উল্লেখ করা হবে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসাররা এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষকদের নির্দেশনা দেবেন।
এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘মিড-ডে মিল প্রকল্পে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না। অনিয়ম রোধে আমরা কিছু পরিকল্পনা করেছি। এটি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বিষয়গুলো চূড়ান্ত হওয়ার পর আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাব। মিড-ডে মিল নিয়ে কোনো অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বর্তমান খাবার ও খরচ
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সপ্তাহে ছয় দিন (শনি থেকে বৃহস্পতিবার) প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খাবার দেওয়া হচ্ছে। খাবারগুলো রুটিন অনুযায়ী বিতরণ করা হচ্ছে। রুটিন অনুযায়ী শনি, রবি, বুধ ও বৃহস্পতিবার বানরুটি ও সেদ্ধ ডিম দেওয়া হয়। সোমবার বানরুটি ও ইউএইচটি দুধ এবং মঙ্গলবার দেওয়া হয় ফর্টিফায়েড বিস্কুট ও কলা।
সূত্রের তথ্য বলছে, বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, প্রতি ডিম ১৪ টাকা, কলা ১০ টাকা, বানরুটি ২৫ টাকা, দুধ ২৯ টাকা এবং বিস্কুট প্রতি প্যাকেট ১৯ টাকা করে ধরা হয়েছে। সে হিসেবে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে প্রতিদিন ২৯ থেকে ৫৩ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।