ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

জামায়াতে ধর্মীয় ঘরানার নেতা নয়, দরকার আরও বেশি পলিসি মেকার

২২ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৬ AM
ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

ফাইজ তাইয়েব আহমেদ © সংগৃহীত

সংসদে জামায়াতের বর্তমান পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনামূলক মূল্যায়ন করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার আইসিটি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফাইজ তাইয়েব আহমেদ। তার মতে, বিরোধী দল হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান, নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা, আধুনিক জ্ঞানচর্চা ও রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরির প্রস্তুতিতে দলটির ঘাটতি রয়েছে।

বুধবার (২২ জুলাই) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তিনি এসব কথা বলেন। স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, সংসদে জামায়াতের পারফরম্যান্স দেখে কয়েকটি বিষয় আমার সামনে এসেছে।

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের পাঠকদের জন্য সাবেক প্রধান উপদেষ্টার আইসিটি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফাইজ তাইয়েব আহমেদের ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো—

১। জামায়াত সংসদে ভালো কিংবা খুব ভালো পারফর্ম করছে, এটা বলার সুযোগ নেই। অধিকাংশ সদস্যের বক্তব্য শুনে মনে হয় উনারা 'রুলস অব বিজনেস', সচিবালয় বিধিমালা কিংবা মন্ত্রণালয়গুলোর 'অ্যালোকেশন অব বিজনেস' পড়েননি। বিএনপি এমপিরা পড়ে ফেলেছেন তাও নয়, কিন্তু সরকারি দল হওয়ায় তারা মন্ত্রী-সচিবের কাছে এক্সেস পান, ফোনেই নিজেদের সুবিধা এবং এলাকার দাবি ও দেনদরবার সেরে ফেলেন। বিরোধী দল চাহিবামাত্র বরাদ্দ পায় না বলে তাকে সংসদেই চাইতে হয়। তাই কোন বিষয় উপজেলা, জেলা, বিভাগ, মন্ত্রণালয় কিংবা সংসদের কোথায় উত্থাপন করতে হবে, এই ইনস্টিটিউশনাল নলেজ ছাড়া বিরোধী রাজনীতি অচল।

২। জামায়াতকে ঠিক করতে হবে সে গতানুগতিক রাজনীতি চায়, নাকি ‘রাজনীতির বয়ান’ দখল করতে চায়। ন্যারেটিভ তৈরির রাজনীতিতে দলটির এমপিদের অপ্রস্তুত মনে হয়েছে আমার কাছে (জামায়াত আমির শফিকুর রহমান সাহেব ও নিজামী সাহেবের ছেলে ব্যতিক্রম, বাকিদের পারফরম্যান্স নজরে পড়েনি)। ন্যারেটিভভিত্তিক রাজনীতির জন্য বহু ডোমেইনে পড়ালেখা, ইন্টেলেকচুয়াল সংযোগ, মাস কমিউনিকেশনের ভাষা ও যুক্তির উপর দখল লাগে। ক্ষমতাকে রাইট টাইমে, রাইট প্রশ্ন করার মত উইট, জ্ঞান এবং সাহস লাগে।  

৩। জামায়াতের দরকার একদল পলিসি মেকার, অধিক পরিমাণে ধর্মীয় ঘরানার নেতা নয়। সামাজিক সুরক্ষা, দারিদ্র্য বিমোচন, যোগাযোগ, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু, নদী-পানি ব্যবস্থাপনা- কোন খাতে জামায়াতের মহাপরিকল্পনা কী এবং এসবের ২য়/৩য় বিকল্প কী, এসব ডোমেইন নলেজ লাগবে। ভালো পলিসি মেকারের মন্ত্রণালয় ভিত্তিক অতীত-বর্তমান কাজের নলেজ লাগে, প্রজেক্ট গুলোর ভুলত্রুটি জানা লাগে, আগের নেয়া  পলিসি ও আইনের সীমাবদ্ধতা, সাফল্য-ব্যর্থতা জানা লাগে, বিভিন্ন প্রজেক্ট ও পাইলটের ফলাফল জানা লাগে, পাশাপাশি, আইন-পলিসি, দপ্তর-সংস্থার ইনস্টিটিউশনাল ক্যাপাসিটি জানতে হবে। আপনাকে বলতে হবে, ওমুকে এটা করেছিল, সেটা সফল বা ব্যর্থ হয়েছে, তাই সরকারি দলের এটাও ব্যর্থ হবে বা সফল হবে- এমন রাজনৈতিক-প্রশাসনিক ডমিনেন্স লাগবে, আপনার অভিজ্ঞতার কমতিকে নলেজ দিয়ে বিট করা লাগবে।  
একটা কথা সবাইকে বলি, সাধারণভাবে সততা মহা মূল্যবান, কিন্তু প্রস্তুতিহীন সততা রাষ্ট্র চালাতে কাজে আসে না। মিশন ও ভিশন লেস সততা জনতার কল্যাণ বয়ে আনে না। আপনাকে রাইট টাইমে রাইট কাজ করতে হবে। সরকার না করলে তাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে। 
সফল আর্থিক ও সেবা প্রতিষ্ঠান চালানো আর রাষ্ট্র চালানো এক কথা নয়, ভিন্নতা আছে।

৪। লাগবে আধুনিক জ্ঞান, বিশ্ব কী করছে, রিজিয়নাল বেস্ট ফিট সলুশ্যান  কী, প্রযুক্তিগত সমাধান কী। সরকারি দলের কাজ ক্ষমতার জোরে হয়ে যায়, কিন্তু বিরোধী দলের লাগে থিংক ট্যাংক, স্টাডি সার্কেল, সার্ভে ও সাবজেক্ট ম্যাটার এক্সপার্ট ও গবেষণা সংযোগ।

৫। জামায়াত ও ডানপন্থী দলগুলোর কমন কিন্তু গভীর একটা সমস্যা আছে। বাংলাদেশের বামদেরও, তবে আজকে আমরা সেদিকে যাব না। শুধুমাত্র চেনা বাবলেই মতবিনিময়। এতে নতুন জ্ঞানের সংযোগ ঘটে না, সরকারের পলিসিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর ক্যাপাসিটিও তৈরি হয় না। বাজেট আলোচনায় কয়েকজন এমপির কথা শুনে মনে হয়েছে দারিদ্র্য বিমোচনের অর্থনীতি, জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি, সার্বিক ম্যাক্রো ও মাইক্রো অর্থনীতি, মুদ্রানীতি কিংবা বাজেট বরাদ্দের বেসিক নলেজই মিসিং। ডিজিটাল লিটারেসি, ফ্যাক্ট চেকিং, সাইবার সুরক্ষা, ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন, এসবেও ঘাটতি স্পষ্ট। এই বাবলের শিকড়টা সাংগঠনিক: দলীয় ফোরামের এজেন্ডা মুরুব্বিকেন্দ্রিক, নতুনদের ফ্লোর সীমিত, ভিন্নমত আদবের বরখেলাপ গণ্য হয়। কামারুজ্জামান, ব্যারিস্টার রাজ্জাক, আবদুল্লাহ তাহের সাহেবদের দুই দশক আগের সংস্কার পরামর্শ দলের এজেন্ডায় স্থান পায়নি বলে অভিযোগ ছিল, আজকের নতুন জ্ঞানও পাবে না, যদি না জামায়াত স্ট্রাকচারালি ডাইভার্স হয়। নিজের বাবলে বাইরের বাবলের জ্ঞান প্রবাহ ঢুকতে দেয়। 

আপনার এমন একটা কাঠামো লাগবে দলের ভিতরে বা বাইরে (এক্সটার্নাল  গবেষণা বা থিংক ট্যাংক যার উপর আপনার প্রভাব নাই), যেখানে ক্রমাগত নিজের নলেজ ও পলিসি চ্যালেঞ্জ হয়। আপনি আন-টেস্টেড পলিসি রাষ্ট্রে প্রয়োগ করতে পারবেন না, এর আর্থিক ক্ষতি ও পাবলিক সাফারিং সীমাহীন। আপনাকে বৈশ্বিক জ্ঞান এবং দেশে দেশে পলিটিক্যাল ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতায় নিজের পলিসি টেস্ট করে পরে প্রয়োগে যেতে হবে।   

৬। সংসদে একটি ভাইব্র্যান্ট পলিটিক্যাল ন্যারেটিভ ফোর্স হতে হলে  জামায়াতকে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং বাঙালী সংস্কৃতির প্রশ্নগুলো দ্রুত সলভ করতে হবে। আরও বিশেষভাবে সরাসরি 'ওমেন এম্পাওয়ারমেন্ট' এর প্রশ্ন, সরাসরি নারী প্রতিনিধিত্বের বিষয়। অর্থাৎ দলটি ফার রাইট বা রাইট থেকে 'অন্তর্ভূক্তিমূলক সেন্টার-রাইট' হতে পারবে কিনা? পারলে কোন পলিসিতে। 

বিশ্বের দেশে দেশে ক্রিশ্চিয়ান ও মুসলিম সেন্টার রাইট দল গুলা ইঙ্কলুসিভনেসের এসব প্রশ্ন কীভাবে শাসনতান্ত্রিকভাবে সল্ভ করেছে, এসব কালেক্টিভ নলেজ সার্ফ করতে হবে। শুধু নির্বাচনের আগে একজন হিন্দু প্রার্থী খুঁজে পেলেই ফার রাইট দলের বহুবিধ নন-ইঙ্কলুসিভনেস  সমস্যার সমাধান হবে না। নিয়োগে ও অন্তর্ভুক্তিতে আন্তরিকতা ও  স্বচ্ছতার সাথে ন্যাশনাল ইন্টিগ্রিটি দেখাতে হবে, গোষ্ঠীস্বার্থ নয়। জামায়াত ক্ষমতায় এলে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান, চাকমা মারামা মুরং সাঁওতাল কিংবা মতুয়ারা মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পাবে কিনা- এটা জামায়াতকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।  

আর হ্যাঁ, ৭১ প্রশ্নে ভোটার ও জনআকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করে একটা যৌক্তিক অবস্থানে পৌঁছাতে হবে। বিভিন্ন ঘটন-অঘটনে কর্মীদের যে পাকিস্তানপ্রীতি প্রকাশ পায়, এই নেগেটিভ লিগ্যাসি স্বাধীন দেশের রাজনীতির জন্য মানানসই নয়। এই ওয়েপনটা প্রতিপক্ষের হাতে রেখে দেওয়ার কোনো রাজনৈতিক যুক্তি থাকে না, আদতে যে স্বাধীন দেশের বিরোধিতা আপনি করেছেন, সেখানে প্রশ্নহীনভাবে ক্ষমতার কন্টেন্ডার আপনি হতে পারবেন না। বিশ্ব রাজনীতিতে এমন নজির নেই।  রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আপনাকে স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে বিদ্ধ করবেই। যথা কর্তব্য সংকোচ থাকলেও করে ফেলুন।   

৭। শেষ বিষয়, সার্ভে। নির্বাচনের আগে প্রায়-নিরপেক্ষ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সার্ভের সাথে ডানপন্থী দলগুলোর নিজস্ব সার্ভের ফলাফলে আকাশপাতাল ব্যবধান দেখা গেছে। কারণ নিজেদের লোক দিয়ে সার্ভে করালে ডিজাইনে ও স্যাম্পল সিলেকশনে বায়াস ঢুকে, (৫ নং পয়েন্টের  বাবল ইফেক্টই) এই বায়াস সচেতন না হলেও, অচেতনে ভুল রেজাল্ট দেয়। ভুল সার্ভে দিয়ে সঠিক রাজনৈতিক কৌশল হয় না।
মোটকথা, রাষ্ট্র পরিচালনায় মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও ইন্সটিটিউশান গুলার ডোমেইন নলেজ, ইসলামি থিওলজি সহ রাষ্ট্র বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পারদর্শীতা, আধুনিক বিশ্ব চর্চিত পলিসি ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান, পলিটিক্যাল ন্যারেটিভের উপর তীব্র দখল ও বায়াসলেস  সার্ভে, এসব ক্ষেত্রে কমফোর্ট জোনের বাইরে গিয়ে নতুন জ্ঞান, পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনাগত এক্সিলেন্স হাসিল করতে হবে। 

অনেকেই বলেন, আমাদের অনেক ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক ও ডক্টরাল রিসোর্স আছে। এটা খুব ভালো। তবে 'নিউ নলেজ' বিদ্যমান জঞ্জালে কীভাবে ফিট করাবেন, ইন্ট্রিগ্রেট করাবেন এবং কীভাবে বিদ্যমান জঞ্জাল ট্রান্সফর্ম করাবেন, কোথায় কোন পলিসি ইন্টারভেনশন করাবেন- এগুলা বুঝাপড়া লাগবে। ওয়ান ফাইন মর্নিং আপনি দেশের সব ফিজিক্যাল ও লজিক্যাল সিস্টেম এবং বিদ্যমান প্রসেস বন্ধ করে, নিউ নলেজ ও নিউ সিস্টেম চালু করতে পারবেন না, লজিস্টিক্স সমস্যা, ফান্ড সমস্যায় পড়বেন এবং ব্যাপকতর রেজিস্ট্যান্স আসবে। ফলে আপনার লাগবে ম্যাসিভ ট্রান্সফর্মেশন পলিসি ও পরিকল্পনা। 
   
শেষে তিনি উল্লেখ করেন, বিরোধী দলকে সরকারি দলের তুলনায় সক্ষমতায় তীব্র ব্যবধানে এগিয়ে থাকতে হয়, যুক্তি খণ্ডনে, পাল্টা ন্যারেটিভে। নইলে আমরা দেখব, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফসল ঘরে তুলে একটা রাজনৈতিক উত্থানের পর আবারও ডান দলগুলোর গতানুগতিক পতন।  
শেষ করি এই বলে, ডান দলগুলো যাতে ওয়াজের বক্তা, মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল কিংবা বড় মিছিল-সমাবেশ করতে পারা নেতাদের একমুখী  হেডকাউন্ট না করে, বরং অধিক হারে পলিসি মেকার তৈরি করে। রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় 'মিনিংফুল কন্ট্রিবিউশান' আনতে পারলেই তা হবে জনগণের সার্বিক মঙ্গল, দেশ ও দশের ফায়দা।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস নিয়োগ দেবে এক্সিকিউটিভ, আবেদনের সুযোগ…
  • ১১ আগস্ট ২০২৬
ময়মনসিংহে সড়কে পড়ে ছিল নারীর মরদেহ
  • ১১ আগস্ট ২০২৬
পড়াশোনা থেমেছিল ২০০২-এ, ২৪ বছর পর এসএসসি পাস করলেন কাঠমিস্ত…
  • ১১ আগস্ট ২০২৬
ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে …
  • ১১ আগস্ট ২০২৬
ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসক-কর্মচারী দু’পক্ষের মারামারি, পরিচালক …
  • ১১ আগস্ট ২০২৬
ঘরটিকে সন্তানের জন্য আদালত নয়, আশ্রয় করে তুলুন
  • ১১ আগস্ট ২০২৬