জাতীয় সংসদ অধিবেশন © সংগৃহীত
তফসিলী ব্যাংক সম্পর্কিত রেজুলেশন ক্ষমতা প্রয়োগ এবং এ সংক্রান্ত বিষয়ে বিধান প্রণয়নকল্পে আনীত ‘ব্যাংক রেজুলেশন বিল-২০২৬’ সংসদে পাস হয়েছে। আজ শুক্রবার (১০ এপ্রিল) বিকেলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি উত্থাপনের অনুমতি চান। বিল উত্থাপনে বিরোধীদলের আপত্তির পর কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
এদিন অর্থমন্ত্রী ব্যাংক রেজুলেশন বিল-২০২৬ উত্থাপনের অনুমতি চাইলে এতে আপত্তি জানান ঢাকা-১২ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ-২০২৫’ সংরক্ষণের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন।
সাইফুল আলম খান মিলন তার দীর্ঘ বক্তব্যে বলেন, ব্যাংব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ-২০২৫ শুধু একটি আইনি দলিল নয়, এটি বাংলাদেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের নিরাপত্তা কবজ, দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড রক্ষার হাতিয়ার এবং ব্যাংক লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট আইনি প্রতিঘাত। বর্তমান সরকার এ অধ্যাদেশটি বাতিল বা সংশোধন করার প্রস্তাব করেছেন। আমি বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই, এ প্রস্তাব দেশের স্বার্থবিরোধী, জনগণের বিরুদ্ধে এবং আর্থিক খাতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বাংলাদেশ ব্যাংকিং খাতে আজ গভীর সংকটে। শত শত কোটি টাকা ঋণখেলাফ, মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট, দীর্ঘদিনের দুর্নীতির ফলে কিছু সংখ্যক ব্যাংক আজ অস্তিত্ব সংকটে। এই পরিস্থিতিতে অধ্যাদেশ বাতিল করা হলে তা হবে মানুষের চিকিৎসা বন্ধ করার শামিল।
সাধারণ আমানতকারীদের সুরক্ষা এই অধ্যাদেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের কোটি কোটি মানুষের তাদের জীবনের সঞ্চয় ব্যাংকে রাখেন। যখন কোনো ব্যাংক সংকটে পড়ে, তখন সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষই। অধ্যাদেশটি স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করেছে যে রেজুলেশন প্রক্রিয়ায় সুরক্ষিত আমানত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। আমানতকারীরা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কাজেই এই অধ্যাদেশ বাতিল করা মানে কোটি মানুষের সুরক্ষাকে ধ্বংস করা।
সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, অতীতের সংকটগ্রস্ত ব্যাংকগুলো বাঁচাতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে, যা মূলত সাধারণ করদাতার অর্থ। এই অধ্যাদেশ এমন একটি কাঠামো নির্মাণ করেছে যেখানে প্রথমে বেসরকারি উৎস থেকে সংকট নিরসনের চেষ্টা হবে এবং শুধুমাত্র সর্বশেষ উপায় হিসেবে সরকারি সহায়তার বিধান রয়েছে। এটি বাতিল হলে আবার করদাতাদের অর্থ অপচয়ের মুখে পড়বে।
ব্যাংকিং সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি ব্যাংক সংকটে পড়লে তার আমানতকারী এবং ব্যবসায়ীরা তাৎক্ষণিক ক্ষতি শিকার হন, লক্ষ লক্ষ গ্রাহকদের লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়, ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ অধ্যাদেশ সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করে যে রেজুলেশন প্রক্রিয়া চলাকালে ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে, গ্রাহকরা তাদের সেবা পাবেন। এটি অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও প্রতিরোধের মূল রক্ষাকবজ।
অধ্যাদেশটি আর্থিক খাতে জনগণের সেবা পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে জনগণের আস্থা আজ তলানিতে। কারণ বারবার ব্যাংক কেলেংকারি, লুটপাট ও সংকটে পড়েও কার্যকর কোন আইনি ব্যবস্থা ছিল না। এই অধ্যাদেশ স্বচ্ছ, পূর্বঘোষিত, আইনসম্মত রেজুলেশন প্রক্রিয়া তৈরি করে, সেই আস্থা পুনরুদ্ধারের পথ প্রশস্ত করে। এটি বাতিল করলে সেই বিশ্বাসের সামান্য যা অবশিষ্ট ছিল তাও ধ্বংস হয়ে যাবে।
এমপি মিলন বলেন, এতদিন বাংলাদেশের ব্যাংক সংকট মোকাবিলার কোন সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো ছিল না। ব্যাংক ডুবতে থাকত এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক হাত-পা বেঁধে বসে থাকত। এই অধ্যাদেশ বাংলাদেশ ব্যাংককে সুস্পষ্ট আইনি ক্ষমতা দিয়েছে। সংকটগ্রস্ত ব্যাংকে ক্ষতিগ্রস্থ করায় এ ক্ষমতা বাতিল করা মানে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আবার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। যখন কোন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ব্যর্থ হয়, দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনায় ব্যাংক ডুবানো হয়, তখন দ্রুত একজন যোগ্য শাসক নিয়োগ দিয়ে ব্যাংককে রক্ষা করার ব্যবস্থা এই অধ্যাদেশে রয়েছে, প্রশাসকের স্পষ্ট দায়িত্ব এবং ক্ষমতা জবাবদিহিতার বিধান নিশ্চিত করা হয়েছে। পুরো পৃথিবীতে এই পদ্ধতি সফলভাবে সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
ব্রিজ ব্যাংকগুলো সংকটগ্রস্ত উল্লেখ করে সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, ব্যাংকের ভাল সম্পদ, গুরুত্বপূর্ণ সেবা রক্ষা করে একটি নতুন ব্যাংককে হস্তান্তরের বিশ্বমানের কৌশল। এতে সংকটে পড়া ব্যাংকের ভাল অংশটুকু টিকিয়ে রাখা যায়, গ্রাহকরা সেবা পেতে থাকেন এবং ব্যাংক ব্যবস্থার বিপর্যয় এড়ানো যায়। এই অধ্যাদেশ এই ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংককে দিয়েছে, যা আগে কখনো ছিল না। একটি দুর্বল ব্যাংক থেকে তার সুস্থ সম্পদ একটি শক্তিশালী ব্যাংকে হস্তান্তরের মাধ্যমে আমানতকারীদের রক্ষা করা এবং ঋণ গ্রহীতাদের সেবা নিশ্চিত করা আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্যতম মূলনীতি। এ অধ্যাদেশ সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোতে এই ক্ষমতা নিশ্চিত করেছে এবং কে কত পাবেন তার অগ্রাধিকার ক্রমনির্ধারণ করেছে।
তিনি বলেন, এতদিন ব্যাংক ডুবলে সাধারণ করদাতা এবং আমানতকারীরা ক্ষতি বহন করতেন। অথচ ব্যাংকের মালিক ও উচ্চ পর্যায়ের বিনিয়োগকারীরা সুরক্ষিত থাকতেন। এ অধ্যাদেশ বলে আগে শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষতি বহন করবেন, তারপর অন্যান্য পাওনাদাররা। সাধারণ আমানতকারীরা সবার শেষে, সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত রাখবেন। এটি ন্যায়বিচারের নীতি।
বাংলাদেশ ব্যাংকিং খাতের সংকটের মূল কারণ হল একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর দ্বারা বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রতারণামূলক আত্মসাৎ ও লুণ্ঠন— উল্লেখ করে এমপি মিলন আরও বলেন, এই অধ্যাদেশ দ্বারা ৭৭ থেকে ৮২ পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে যে যারা প্রতারণামূলকভাবে ব্যাংকের সম্পদ ব্যবহার করবেন, তাদের দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সম্পদ ফেরত দিতে বাধ্য করা হবে। শুধু শাস্তি দেওয়া নয়, লুণ্ঠিত অর্থ ফেরত আনাও জরুরি। এই অধ্যাদেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা দিয়ে সেই অর্থ উদ্ধারের জন্য আইনি পদক্ষেপ নিতে এবং আদালতের মাধ্যমে সম্পদ ক্রোক, জরিমানা আদায়, জরিমানা আরোপ এবং অপরাধী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফোজদারী কার্যক্রম শুরু করার বিধান রয়েছে। অধ্যাদেশ বাতিল হলে লুটেরারা আইনের ফাঁকে পালিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক লুটের একটি সাধারণ কৌশল হল বেনামি মালিকানা এবং জটিল কর্পোরেট কাঠামোর আলোকে আড়ালে থেকে ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করা। এই অধ্যাদেশে সুস্পষ্টভাবে চূড়ান্ত সুফলভোগী মালিক অর্থাৎ আল্টিমেট ভেনিশিয়াল ওনারের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার বিধান রয়েছে। এটি স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।
ছায়া পরিচালকদের জবাবদিহিতার বিষয়ে তিনি বলেন, বহু ব্যাংকে প্রকৃত ক্ষমতাশীলরা পর্ষদে নাম না রেখে পর্দার আড়াল থেকে নির্দেশ দেন এবং ব্যাংক লুট করেন। এ অধ্যাদেশ ছায়া পরিচালকের দ্বারা আইনগতভাবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদেরও আইন জবাবদিহিতার আওতায় আনার বিধান তৈরি করেছে। এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা বাতিল হলে এই মুহূর্তে কৌশলকারীরা আবার সুরক্ষা পাবে।
তিনি আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংকসহ বহু ব্যাংকে এস আলমের নামে নামি-বেনামি মালিকানার মাধ্যমে ধ্বংস করেছে। সংকটের আগে একটি জরুরি ব্যবস্থার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পূর্বপ্রস্তুতি অনিবার্য। এই আদেশ বড় ব্যাংকগুলোকে আগে থেকেই রেজুলেশন-পরিকল্পনা তৈরি করতে বাধ্য করেছে, যাতে সংকট এলে দ্রুত এবং সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এই পূর্ব প্রস্তুতি বিধান ছাড়া সংকট আসলে তখন হাতের কাছে কিছু থাকবে না।
তিনি বলেন, একটি ব্যাংক দুর্বল হতে শুরু করলে প্রথম পর্যায়ে পদক্ষেপ নেওয়া গেলেই সংকট সবচেয়ে কম ক্ষতিতে সমাধান করা যায়। এ অধ্যাদেশে কারেক্টিভ অ্যাকশন ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে নির্ধারিত করেছে যে কোন কোন সূচক দুর্বল হলে কোন কোন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এটি একটি অটোমেটিক আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম, যা ছাড়া রেজুলেশন অন্ধকারে তীর ছোঁড়ার মত। সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক আর্থিক সম্পদ থাকা জরুরি। এই অধ্যাদেশে আর্থিক স্থিতিশীলতা, রেজুলেশন তহবিল গঠনের বিধান করেছে, যেখানে ব্যাংকগুলো চাদা দেবে, সরকার নয়। এই তহবিল থেকে প্রয়োজনের সংকটগ্রস্ত ব্যাংকে ঋণ দেওয়া হবে, গ্যারান্টি প্রদান, সম্পদ ক্রয় করা যাবে। এটি একটি নিশ্চিত সেলফ-ইনস্যুরেন্স ব্যবস্থা।
ব্যাংকিং খাতের সংকট এককভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয় জানিয়ে তিনি বলেন, এতে প্রয়োজন বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, আমানত-বীমা সংস্থা, বিএসইসি এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা। এ অধ্যাদেশ একটি আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সংস্থা সংগঠন করেছে, যা সমন্বয় নিশ্চিত করবে। এটি ছাড়া একটি হাত জানবে না অন্য হাত কী করছে।
তিনি আরও বলেন, এই অধ্যাদেশ বাংলাদেশ ব্যাংককে নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করতে বলেছে এবং কোন কোন কারণে ব্যাংকের রেজুলেশন বাধা সৃষ্টি হতে পারে। একই সাথে সেই বাধাগুলো আগেভাগে দূর করতে বলেছে। এই প্রতিরোধমূলক পদ্ধতি অনেক সংকট শুরু হওয়ার আগেই প্রতিহত করতে হবে।
অধ্যাদেশের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে সাইফুল আলম খান বলেন, বাধাগুলো চিহ্নিত করে, মূল্যায়ন করে আগেভাগে সমাধানের ব্যবস্থা করা উচিত, এটা এখানে আছে, যাতে সংকট প্রতিহত করা যায়। এরপর আইনগত ন্যায্যতা মূলনীতি, এই অধ্যায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি নিশ্চিত করেছে। রেজুলেশন প্রক্রিয়ায় কোন পাওনাদার বা আমানতকারী যদি স্বাভাবিক অবসান যত পেতেন তার চেয়ে কম পান, তাহলে সরকারি তহবিল ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, এটি নিশ্চিত করা হয়েছে। এরপর হল সাময়িক স্থগিতাদেশ সংকট নিরসন, সংকটের সময় দাবির স্রোত বন্ধ না করলে ব্যাংক বাঁচানো সম্ভব নয়। কাজেই এমন ব্যবস্থা থাকা দরকার যাতে আস্তে আস্তে আমানতকারীকে দেওয়া যায়— তাহলে সমস্যা দেখা দিবে না।
বিচারিক তত্ত্বাবধান ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা নিয়ে তিনি বলেন, পদ্ধতিগত ঝুঁকি প্রতিরোধ একটি ব্যাংকের সংকট ছড়ানোর থেকে রক্ষা করে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আইনি কাঠামো তৈরি করা, কারণ এরকম অবস্থা হলে বিদেশের বিনিয়োগাটা আমাদের এখানে আসবে না। যেটা ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা।
সরকারের বাতিলের যুক্তি খণ্ডন করে তিনি বলেন, আরো পরামর্শ দরকার, এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রপতি আদেশ বাতিল সাংগঠনিক প্রশ্ন এবং আন্তঃসীমা রেজুলেশন, বৈশ্বিক ব্যাংকিং সংকট মোকাবিলা, ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ভবিষ্যতের জন্য ভিত্তি। আমি মনে করি যে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা জনমত যাচাই করার জন্য পেশ করা হোক।
সাইফুল আলম খান মিলনের বক্তব্যের পর সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএনপির আর্থিক খাতে যে ভাবনা এবং নীতিমালা সেটা খুবই পরিষ্কার। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা, গুড গভর্নেন্স— এই তিনটা হচ্ছে বিএনপির আর্থিক খাত পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের সুপ্রতিষ্ঠিত দলীয় নীতি। যে জন্য আপনি লক্ষ্য করবেন বিগত দিনে বিএনপি যতবারই সরকারে ছিল, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা সবসময় ছিল, স্থিতিশীলতা ছিল, গুড গভার্নেন্স ছিল। কোন ধরনের সমস্যা হয় নাই। বিগতদিনের যে কথাগুলো সংসদ সদস্য বলেছেন, উনার সাথে আমি একমত। এই ঘটনাগুলো ঘটেছে। সুতরাং আমরা আমাদের যে ভাবনা-চিন্তা-দর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে আপনাকে নিশ্চিতভাবে বলতে চাই, আমাদের সেই প্রিন্সিপাল থেকে আমরা এতটুকু সরব না।
তিনি বলেন, এটি হচ্ছে একটি অল্টারনেটিভ রেজুলেশন অপশন। এটা একটা নতুন উইন্ডো করা হয়েছে। মূল নীতি, মূল বিধানগুলোতে কোন পরিবর্তন নাই। দিস ইজ দ্য নিউ উইন্ডো ওপেন টু ক্রিয়েট মোর অপরচুনিটি। ইতোপূর্বে প্রণীত অধ্যাদেশে বিকল্প সমাধানের পদ্ধতি ছিল না, একটাই ছিল। এতে ১৮(ক)-একটি নতুন ধারা সংযোজন করা হয়েছে। ফলে ব্যাংকসমূহের দুরবস্থা থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য শুধুমাত্র রেজুলেশন পদ্ধতি হিসেবে লিকুইডিশন, ব্রিজ ব্যাংকের নিকট হস্তান্তর, তৃতীয় পক্ষের নিকট হস্তান্তর ইত্যাদি অপশনের ওপর নির্ভর না করে রেজুলেশন কার্যক্রমের অব্যবহিতপূর্বের শেয়ার ধারক বা উপযুক্ত বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে সম্পদ, দায় পুনঃধারণ ও ধারণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন, এখানে অপশন ইজ ওপেন। আগের যারা শেয়ার হোল্ডার, তাদের জন্য না। এটা ওপেন ফর এভরিবডি। এটা কেন করা হয়েছে? সরকারের আর্থিক দায় কমানো। আপনারা জানেন ইতোমধ্যে সরকার এখানে ৮০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। আরো প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। একটা সাধারণ সময় কোন সরকারের পক্ষে এত বড় একটা অ্যামাউন্ট বহন করা সম্ভব নয়। তার ওপর বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ইত্যাদি যে বিষয় সামনে চলে আসছে আরো এক লক্ষ কোটি টাকার মাধ্যমে এটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। এজন্য আবেদনকারীদের দ্বারা মূলধন পুনঃস্থাপন, দায় পরিশোধ এবং পূর্বে প্রাপ্ত সহায়তা ফেরত প্রদানের বাধ্যবাধকতা থাকায় সরকার বা আমানত সুরক্ষা তহবিলের উপর আর্থিক চাপ হ্রাস পাবে। আমানতকারীদের আস্থা বৃদ্ধি, ব্যাংকের সম্পদ দায় পুনর্গঠন এবং দ্রুত কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে। ফলে সার্বিকভাবে ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।
নির্দোষ সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের সুরক্ষা প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকের অব্যবস্থাপনা ও দুর্বলতার জন্য সকল শেয়ারহোল্ডার দায়ী নন। বিশেষত ক্ষুদ্র ও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ব্যবস্থাপনায় সরাসরি সম্পৃক্ত থাকেন না। এ প্রেক্ষিতে মালিকানা পুনর্বহালের সুযোগ প্রদান করলে নির্দোষ সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের আর্থিক স্বার্থ পুনরুদ্ধারের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা ন্যায্যতা, একুইটি ও বিনিয়োগ সুরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শেয়ারহোল্ডারদের পুনরুদ্ধারের নীতি সুযোগ সৃষ্টি তৈরি হলে এটি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি করতে সহায়ক হবে এবং ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগে উৎসাহ জোগাবে। বাজার ভিত্তিক সমাধান নিয়ে তিনি বলেন, সরকারি হস্তক্ষেপের পরিবর্তে বেসরকারি উদ্যোগ ও পুঁজি সংযোজনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করায় প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হবে, যা একটি বাজারভিত্তিক ও টেকসই পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হবে।
সম্পদের মূল্য সংযোজন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, লিকুইডেশনের ক্ষেত্রে সম্পদের মূল্য কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যেকোন লিকুইডিশনের ক্ষেত্রে। এই ধারার মাধ্যমে ব্যাংকসমূহকে সচল রেখে পুনর্গঠন করলে সম্পদের প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য সংরক্ষণ করা সম্ভব। কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম বজায় রাখা নিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংক সচল থাকলে কর্মচারীদের চাকরি সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে।
এরপর কণ্ঠভোট অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। এরপর অর্থমন্ত্রী বিলটি উত্থাপন করেন। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।