আবদুল হামিদ খান ভাসানী © সংগৃহীত
‘কাগমারী সম্মেলন’ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ওই দিন পাকিস্তানি শাসকদের উদ্দেশে মওলানা ভাসানীর ‘আসসালামু আলাইকুম’ শব্দের ব্যবহারের কারণেই কাগমারী সম্মেলন ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে। আজ সেই কাগমারী সম্মেলনের ৬৯তম দিবস।
১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের এই দিনে টাঙ্গাইল জেলার কাগমারীতে অনুষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন। একই সময় সেখানে অনুষ্ঠিত হয় মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সম্মেলন। তখন থেকেই দিবসটি কাগমারী সম্মেলন দিবস হিসেবে পালন করা হয়। পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের ডাক দেয়া হয় ওই সম্মেলন থেকেই। ওই সম্মেলন বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের দাবি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। মওলানা ভাসানীর ডাকে কাগমারীতে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনকে বাঙালির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বলা হয়। সে সম্মেলনে চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত, ব্রিটেন, মিসর, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিশ্বের বহু দেশের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। সেখানেই পাকিস্তানের স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী ‘আসসালামু আলাইকুম’ শব্দ ব্যবহার করেন।
টাঙ্গাইল জেলার কাগমারীতে ১৯৫৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন ও সাংস্কৃতিক সম্মেলন। ৭ ফেব্রুয়ারি কাউন্সিল অধিবেশনে মূল আলোচ্যসূচি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন এবং জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি। কিন্তু আমেরিকার পক্ষ নিয়ে সিয়াটো ও সেন্টোর সামরিক চুক্তির প্রতি আওয়ামী লীগ নেতা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করলে সম্মেলনে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়।
সোহরাওয়ার্দী সামরিক জোটের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করেন। তিনি পাকিস্তান স্বাক্ষরিত সামরিক চুক্তি এবং কেন্দ্রে পূর্ব পাকিস্তানে আরোপিত অর্থনৈতিক নীতিমালার পক্ষে মত দেন। সোহরাওয়ার্দীর এই পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বক্তব্য আওয়ামী লীগের বামপন্থী নেতৃবৃন্দ সমর্থন করেননি। তাদের পুরোধা ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি (সম্মেলনেরও সভাপতি) মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। মওলানা ভাসানী সোহরাওয়ার্দীর অনুসৃত সামরিক জোটের সমালোচনা করে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলেন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি এবং পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে দলের দুই শীর্ষ নেতার (ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী) মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়। ইঙ্গো-মার্কিন জোটের বাইরে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে ভাসানী অনড় থাকেন। পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে মওলানা বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার যদি পূর্ব পাকিস্তানকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তাহলে সেদিন বেশি দেরি নেই যেদিন পূর্ব বাংলার মানুষ পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানাবে। তার এই ঘোষণায় শাসকশ্রেণির মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কাগমারী সম্মেলনের পর থেকে বাংলাদেশে সূচিত হয় এক নতুন বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারা। সে কারণে দিবসটি ঐতিহাসিকভাবে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
ঐতিহাসিকদের মতে, কাগমারী সম্মেলন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক; বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এক স্মরণীয় ঘটনা। কাগমারী সম্মেলনের মাধ্যমেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলনের সূচনা হয়।
দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। কাগমারী সম্মেলন দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ নেতৃদ্বয় বলছেন, ইতিহাসে যার যেটুকু ভূমিকা, তা স্বীকার না করলে একদিন ইতিহাসই মুখ ফিরিয়ে নেবে।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারী) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি ও মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়া এসব কথা বলেন।
তারা বলেন, ১৯৫৭ সালে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর আহ্বানে ও নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলন ছিল উপমহাদেশ তথা তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের টার্নিং পয়েন্ট।
৭-৮ ফেব্রুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনের ৬৭তম বার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্য রাজনৈতিক কর্মসূচির আয়োজন করেছিলেন, এর মধ্যে তাঁর অবিস্মরণীয় কীর্তি এবং উপ-মহাদেশের তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আজকের বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হচ্ছে ১৯৫৭ সালের ‘কাগমারী সম্মেলন’। উপ-মহাদেশ ও পূর্ব বাংলা তথা আজকের বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর তাৎপর্য অনাগত কালের গবেষকদের কাছে স্বীকৃত।
নেতৃদ্বয় আরো বলেন, কাগমারী সম্মেলন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি মাইল ফলক-বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এক স্মরণীয় ঘটনা। কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানীর কঠোর ভাষণ এবং তাঁর ‘আসসালামু আলাইকুম’ই দেশের জনগণকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় স্বপ্ন দেখিয়েছিল।
তারা বলেন, ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনের মাধ্যমেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত শাসন ও স্বাধিকার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদী-আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ ও সচেতন করতে এই সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কাগমারী সম্মেলনে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী যে গুরুত্বপূর্ণ ও জ্বালাময়ী বক্তব্য রেখেছিলেন তা আজও আমাদের দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, পতাকা-মানচিত্র রক্ষার সংগ্রামে এবং সাম্রাজ্যবাদ-আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামে ও লড়াইয়ে অনুপ্রেরণা জোগায়।
ন্যাপ নেতৃদ্বয় বলেন, বাংলাদেশ এক কঠিন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। রাজনীতিকেরা ক্ষমতার চশমায় নিজেরা যেমন সবকিছু দেখতে অভ্যস্ত, তেমনি অন্যদেরও দেখতে বাধ্য করছেন। যা শুভ লক্ষণ নয়। ১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানীর আহ্বানে অনুষ্ঠিত কাগমারী সম্মেলন ছিল পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের প্রথম স্বাধীনতার ডাক।