পটুয়াখালী-৪ আসন
এবিএম মোশাররফ হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমান, জহির উদ্দিন আহমেদ © সংগৃহীত
একসময়ের আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ১১৪, পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) সংসদীয় আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির অংশগ্রহণ না থাকায় দীর্ঘদিনের পরিচিত ভোটের ধারায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
গতকাল বুধবার (২১ জানুয়ারি) প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী মাঠ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যেখানে ভোটের হিসাব-নিকাশ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০-দলীয় ‘ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’ জোটের মধ্যে। পাশাপাশি গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীর অংশগ্রহণ ভোটের সমীকরণে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। কলাপাড়া ও নদীবেষ্টিত রাঙ্গাবালী উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনটি বরিশাল বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অঞ্চল।
এখানে রয়েছে দেশের তৃতীয় বৃহত্তর সমুদ্রবন্দর পায়রা, তিনটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, শের-ই-বাংলা নৌঘাঁটি, সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন এবং আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা। ফলে এ আসনটি শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭ হাজার ৪৭৩ জন। এর মধ্যে কলাপাড়া উপজেলায় ২ লাখ ১৩ হাজার ৩১৯ জন এবং রাঙ্গাবালী উপজেলায় ৯৪ হাজার ৫৫৪ জন ভোটার রয়েছেন।
বিএনপির মনোনীত প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির প্রশিক্ষণ-বিষয়ক সম্পাদক এবিএম মোশাররফ হোসেন (ধানের শীষ)। প্রতীক বরাদ্দের আগেই তিনি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করে মাঠ গোছানোর কাজ শেষ করেছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে দৃশ্যমান সক্রিয়তা।
তিনি বলেন, ‘ধানের শীষে ভোট পেয়ে নির্বাচিত হলে পায়রা বন্দর ও কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। উপকূলীয় জনপদের মানুষকে আর অবহেলিত থাকতে দেওয়া হবে না।’
বিএনপি নেতাকর্মীদের ধারণা, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংকের পাশাপাশি ভাসমান ভোটের বড় একটি অংশ বিএনপির দিকেই ঝুঁকতে পারে। এ আসনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান (হাতপাখা)।
সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক বিএনপি নেতা হিসেবে তার রয়েছে নিজস্ব ভোটব্যাংক ও স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা। গত বছরের ৬ মে দলীয় গ্রুপিংয়ের কারণে বিএনপি ছেড়ে ইসলামী আন্দোলনে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি নিয়মিত গণসংযোগ, কর্মী সমাবেশ ও দাওয়াতি কার্যক্রমের মাধ্যমে মাঠ শক্ত করছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে নয়, ইসলামী আদর্শ, সুশাসন ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচন করছি। মানুষ পরিবর্তন চায়, আমি সেই পরিবর্তনের প্রতিনিধি হতে চাই।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাবেক বিএনপি ভোটারদের একটি অংশ এবং ধর্মপ্রাণ ভোটারদের বড় অংশ ইসলামী আন্দোলনের দিকে ঝুঁকতে পারে।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল কাইউম দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মনোনয়ন প্রত্যাহার করে ১০-দলীয় জোটের মনোনীত খেলাফত মজলিসের প্রার্থী ডা. জহির উদ্দিন আহমেদকে (দেওয়াল ঘড়ি) সমর্থন দিয়েছেন।
ডা. জহির উদ্দিন আহমেদ রাঙ্গাবালী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং একসময় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচনী মাঠে তাকে কম সক্রিয় দেখা গেলেও তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক যোগাযোগ ও ভোটার ঐক্য গঠনে কাজ করছেন জোটের নেতাকর্মীরা।
এ আসনে গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য মো. রবিউল হাসান (ট্রাক) স্বতন্ত্র ধারার রাজনীতি ও সংস্কারের বার্তা দিচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনি মূল লড়াইয়ে সরাসরি প্রভাব না ফেললেও ভোট বিভাজনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় দলটির দীর্ঘদিনের ভোটব্যাংক এখন পুরোপুরি ভাসমান। এই ভোট কোন দিকে যাবে—বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন নাকি ১০ দলীয় জোটের দিকে—তা নিয়েই চলছে মূল হিসাব–নিকাশ। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে আসন সমঝোতা না হওয়ায় ধর্মভিত্তিক ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এলাকার ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, সততা ও এলাকার জন্য কাজ করার সক্ষমতাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ী, শিক্ষক, রিকশাচালক ও তরুণ ভোটারদের মুখে একই কথা—‘দল দেখে নয়, যোগ্য মানুষকে ভোট দেব।’
সব মিলিয়ে একসময়ের আওয়ামী লীগের দুর্গ পটুয়াখালী-৪ আসনে এবারের নির্বাচন বহুমাত্রিক ও অনিশ্চিত রূপ নিয়েছে। শক্তিশালী একাধিক প্রার্থী, ভাসমান ভোটব্যাংক, ধর্মভিত্তিক ভোট বিভাজন এবং কৌশলগত গুরুত্ব—সবকিছু মিলিয়ে এই আসনের ফলাফল পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক বার্তা বহন করবে। শেষ পর্যন্ত ভোটারদের রায়ই নির্ধারণ করবে পটুয়াখালী-৪ আসনের ভবিষ্যৎ রাজনীতি।