জাতীয় সম্মেলনের প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ। সংগঠনটির সিনিয়র নেতাকর্মীরা বলছেন, কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর টালবাহানার কারণেই আটকে আছে এই কমিটি। তবে পদ-প্রত্যাশীদের অপেক্ষার পালা সম্ভবত এবার শেষ হচ্ছে। কাল বা পরশুর মধ্যেই গঠিত হচ্ছে সংগঠনটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি। শীর্ষ পর্যায়ে কথা বলে এমন আভাসই পাওয়া গেছে। যদিও বিষয়টি নিয়ে এখনও আশ্বস্ত হতে পারছেন না পদ প্রত্যাশীরা|
সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলছেন, আমাদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রস্তুত। শুধু আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমতি নেয়া বাকি আছে। আশা করি, রবিবার কিংবা সোমবারের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হবে। তবে এর মধ্যে না হলে আগামী সপ্তাহেই হবে বলে আশা করছি।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অমান্য করে দীর্ঘদিন ধরে কমিটি ঝুলিয়ে রাখায় নেতাকর্মীদের ক্ষোভ যেন শেষ হচ্ছে না। তাদের বক্তব্য, বর্তমান সভাপতি অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় ক্যাম্পাসে সময় কম দিচ্ছেন। ফলে মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের নিয়মিত দেখা গেলেও শোভন-রাব্বানীকে দেখা যাচ্ছে না। স্বভাবতই মধুতে জুনিয়র কর্মীদের যাতায়াত কিছুটা কমে গেছে।
তথ্যমতে, নতুন কমিটি দিতে গত বছরের ২৫ ও ২৬ এপ্রিল যথাক্রমে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তর এবং ২৯ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১১ ও ১২ মে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দুই দিনব্যাপী ২৯তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১১মে জাতীয় সম্মেলনের প্রথম দিনে সমঝোতার মাধ্যমে সংগঠনটিকে কমিটি করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর প্রায় আড়াই মাস পর ৩১জুলাই রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি এবং গোলাম রাব্বানীকে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক করা হয়। ওইদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের কমিটিও অনুমোদন দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটিতে সঞ্জিত চন্দ্র দাস সভাপতি ও সাদ্দাম হোসেন সাধারণ সম্পাদক; ঢাকা মহানগর উত্তরে মোঃ ইব্রাহিম সভাপতি ও সাইদুর রহমান হৃদয় সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণে মেহেদী হাসান সভাপতি ও জোবায়ের আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। সম্মেলনের প্রায় ১১ মাস পরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে না পারাকে ব্যর্থতা ভিন্ন অন্য কিছু ভাবতে নারাজ সিনিয়র নেতাকর্মীদের একাংশ।
ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রের ১১ (খ) ও (গ) ধারা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের কার্যকাল দু’বছর। এর মধ্যে সম্মেলন না হলে সংসদের কার্যকারিতা থাকবে না। বিশেষ বা জরুরি পরিস্থিতিতে বর্ধিত সভায় অনুমোদনের মাধ্যমে কমিটি তিন মাসের জন্য সময় বাড়াতে পারে। এছাড়া গঠনতন্ত্রে জেলা ইউনিটগুলোর মেয়াদ রাখা হয়েছে এক বছর। ৬-এর (গ) ধারা অনুযায়ী ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ জেলা হিসেবে গণ্য হবে। গঠনতন্ত্রের হিসেবে কেন্দ্রীয় কমিটি তার নির্ধারিত সময়ের প্রায় অর্ধাংশ এবং জেলা শাখার সমমর্যাদা সম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মহানগরের কমিটি তার প্রায় পূর্ণ সময়ই শেষ করে ফেলেছে। এমন পরিস্থিতিতেও কমিটি না হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন শাখা সংগঠনটির কর্মীরা।
নেতাকর্মীরা বলছেন, জাতীয় সম্মেলনের পর থেকেই নতুন কমিটিতে পদ পেতে অপেক্ষা শুরু হয় সিনিয়র নেতাদের। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়ার কার্যক্রম বারবার ভেস্তে যাওয়ায় অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে পদ-প্রত্যাশীদের। তারা বলছেন, কমিটি দিতে এত দেরি হওয়ার কোন কারণ নেই। প্রধানমন্ত্রী নিজের তত্ত্বাবধানে কমিটিতে পদ-প্রত্যাশীদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়েছেন। আবার দলীয় সভানেত্রী নিজেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের ব্যাপারে কয়েকবার তাগিদ দিয়েছেন। এতকিছুর পরও কমিটি না দেওয়া হঠকারিতা ছাড়া কিছুই নয়। পদ-প্রত্যাশীদের ভাষ্য, ছাত্রলীগে জবাবদিহিতার জায়গা নষ্ট করে ফেলছেন বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। তাদের কারণে প্রাণবন্ত কর্মীরা ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছেন।
কয়েকটি সূত্রের তথ্য, সম্মেলনের পর কেন্দ্রের কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে শোভন ও রাব্বানীর কমিটি মোট পাঁচবার সময় নেয়। নির্ধারিত এই সময়ের মধ্যে কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাবির সিনেট ভবনে ছাত্রলীগের নির্বাচনী বর্ধিত সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ওই সময় গত বছরের ডিসেম্বরের ১০ তারিখের মধ্যেই কমিটি দেওয়ার কথা বলেন গোলাম রাব্বানী। কিন্তু সেই ১০ তারিখ গিয়ে আরও তিনটি ১০ পেরোলেও কমিটির দেখা নেই। গত ডাকসু নির্বাচনের আগে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক সভায় নির্বাচনের ২০ দিনের মধ্যে কমিটি গঠন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। কিন্তু সে নির্দেশ মানার ব্যাপারেও কোনো সাড়া দেননি শোভন-রাব্বানী কমিটি।
জানা যায়, এর আগে ২৮তম জাতীয় সম্মেলনের প্রায় সাত মাস পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন সাবেক সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন। আর ২৭তম কেন্দ্রীয় সম্মেলনের চার মাস পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন তৎকালীন সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম। এবার এক বছর পেরোলেও কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার খবর নেই|
কেন্দ্রীয় কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ-প্রত্যাশী এক নেতা বলেন, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে ক্যাম্পাসে নিয়মিত পাওয়া যায় না। বিভিন্ন সময় যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না। ফোন দিয়েও সাড়া মিলে না। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কমিটি হওয়ায় তারা নিজেদের পাওয়ারফুল মনে করতে শুরু করছেন| ফলে অন্যদের মূল্যায়ন করছেন না। ডাকসুতে ভিপি পদে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের হারের পিছনে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়াকে দোষারোপ করেন এ নেতা।
পদ পাওয়ার দৌঁড়ে থাকা আরেক সিনিয়র নেতা জানান, কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে কাজে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের মধ্যে। এর আগে এমনও ঘটনা ঘটেছে যে, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় কোনো নেতা উপস্থিত হননি। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতেও বিশবিদ্যালয় নেতাদের উপস্থিতি থাকছে নগণ্য।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় কমিটি না হওয়ায় আটকে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের পূর্ণাঙ্গ কমিটিও। কেন্দ্রীয় কমিটি হওয়ার পরপরই এসব কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার পরিকল্পনা রয়েছে শীর্ষ নেতাদের। এর আগে কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার এক সপ্তাহের মধ্যেই নিজেদের কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি মোহাম্মদ ইব্রাহীম। এ বিষয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমরা অনেক আগেই কমিটির খসড়া প্রস্তুত করে রেখেছি। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তাদের এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের কমিটিতে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস সাংবাদিকদের বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেয়ার কাজ অনেক দূর এগিয়েছি। আমাদের সকল প্রস্তুতি আছে। কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই আমরা কমিটি দিতে পারব।
বয়স নিয়ে ধোঁয়াশা: এদিকে কমিটি নিয়ে বারবার কথা উঠলেও পদপ্রার্থীদের বয়স কত হবে তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রে কর্মীদের বয়স ২৭ বছর উল্লেখ করা থাকলেও জাতীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তা বাড়িয়ে ২৮ বছর নির্ধারণ করে দেন। সম্মেলনের ১ বছর পরও কমিটি না হওয়ায় ইতোমধ্যে বর্ধিত বয়সের সীমাও পার করে ফেলেছেন পদ-প্রত্যাশী অনেক নেতা। এমন পরিস্থিতিতে সহজেই বিষয়টি নিয়ে জটিলতা কাটছে না।