নারীদের বিরুদ্ধে আপত্তিকর ও ভিত্তিহীন তথ্য © টিডিসি সম্পাদিত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে আপত্তিকর ও ভিত্তিহীন তথ্য ছড়ানো এখন নিয়মিত এক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কন্টেন্টের প্রধান টার্গেট হয়ে উঠেছেন সরকারে থাকা ও রাজনীতিতে সক্রিয় নারীরা। ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার), ইউটিউব ও টিকটকের মতো বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নারী রাজনীতিকদের নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট, নকল সংবাদ, বিকৃত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিপফেইক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব কনটেন্ট তৈরি করা হচ্ছে।
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) ফ্যাক্টচেক ইউনিট বাংলাফ্যাক্ট এক গবেষণায় দেখেছে, দেশের পাঁচজন উদীয়মান নারী রাজনীতিক, একজন প্রতিষ্ঠিত নারী নেত্রী এবং একজন নারী উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ইন্টারনেটে ছড়ানো মোট ২৭টি আপত্তিকর কনটেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে—সবগুলোই ভুয়া। এসব কনটেন্টে তাদেরকে জড়িয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য ও কুরুচিপূর্ণ উপস্থাপনা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধনের সংশোধিত ফল প্রকাশ, নতুনভাবে পাস ১১৩ জন
গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়ানো হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম-আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুমকে ঘিরে, যার সংখ্যা সাতটি। বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে ছড়ানো হয়েছে ছয়টি কনটেন্ট। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারার বিরুদ্ধে রয়েছে পাঁচটি করে কনটেন্ট। অন্যদিকে, উমামা ফাতেমা, তাজনূভা জাবীন ও অর্পিতা শ্যামা দেবকে নিয়েও ছড়ানো হয়েছে ভুয়া তথ্য।
এই ২৭টি কনটেন্টের মধ্যে ১১টি ফটোকার্ড, ১০টি ভিডিও, ৫টি ছবি এবং ১টি অডিও/কলরেকর্ড রয়েছে। এসব কনটেন্টে ব্যবহার করা হয়েছে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের লোগো ও ডিজাইন, যেন তা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। অথচ, যাচাই করে দেখা গেছে, এসব কনটেন্টের একটিও আসল নয় এবং কোনো সংবাদমাধ্যম এগুলো প্রকাশ করেনি।
নুসরাত তাবাসসুমকে নিয়ে তৈরি করা একটি ভিডিও দাবি করে বলা হয়েছিল, ‘সমন্বয়ক নুসরাতের গোপন ভিডিও ফাঁস’। পরে জানা যায়, এটি একটি অ্যাডাল্ট ভিডিও থেকে সংগৃহীত, যেখানে পরবর্তীতে তার মুখমণ্ডল বসিয়ে ভুয়া ভিডিও বানানো হয়। একইভাবে, তার বসে থাকার একটি শান্তিপূর্ণ ছবিকে বিকৃত করে কুরুচিপূর্ণ ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়।
রুমিন ফারহানাকে নিয়েও একই ধরনের অপপ্রচার চালানো হয়েছে। শাকিব খানের সঙ্গে ভিডিও ফাঁসের ভুয়া দাবিতে ফটোকার্ড তৈরি হয়, বিয়ের সাজে এডিট করা ছবি ছড়ানো হয়, এমনকি তার নামে ডিপফেইক নাচের ভিডিও বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করা হয়।
পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে ঘিরে ছড়ানো হয়েছে কৃত্রিমভাবে তৈরি ভিডিও ও বিকৃত ফটোকার্ড। জাতিসংঘ মহাসচিবকে চুম্বনের দৃশ্য দাবিতে একটি ডিপফেইক ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যদিও আসল ভিডিওতে এমন কোনো দৃশ্য নেই। তাছাড়া, কনডম বা সন্তান জন্ম নিয়ে তার নামে করা বিভিন্ন মন্তব্যের ভুয়া ফটোকার্ডও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার পায়।
তাসনিম জারাকে নিয়ে একাধিক ভুয়া ফটোকার্ড ও ভিডিও ছড়ানো হয়েছে। ‘সমাবেশে তাসনিম জারা, আহতরা কাতরাচ্ছে, আমি বিছানায় কাতরাই’—এই ধরনের বানোয়াট শিরোনামসহ তৈরি করা ফটোকার্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়, যেগুলো কোনো মিডিয়া প্রকাশ করেনি।
উমামা ফাতেমাকে নিয়েও জনকণ্ঠের নামে ভুয়া ফটোকার্ড এবং সম্পাদিত আপত্তিকর ছবি প্রচার করা হয়েছে। একইসঙ্গে তাজনূভা জাবীনকে জড়িয়ে একটি ভাইরাল কলরেকর্ড ছড়িয়ে পড়ে। পরে জানা যায়, ওই কলরেকর্ডের নারী তিনি নন, বরং অন্য একজন নারী নিজের নাম প্রকাশ করে বিষয়টি পরিষ্কার করেন।
এসব কনটেন্ট ছড়ানোর মূল মাধ্যম হিসেবে উঠে এসেছে কিছু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল ও এক্স অ্যাকাউন্ট। বিশেষ করে আওয়ামীপন্থি ও বিরোধী রাজনৈতিক গ্রুপগুলোর মধ্যে কিছু পেজের মাধ্যমে এসব অপপ্রচার সবচেয়ে বেশি ছড়ানো হয়।
বাংলাফ্যাক্ট জানায়, এসব বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট নারীরা, যা তাদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাফ্যাক্টসহ অন্যান্য তথ্য যাচাইকারী সংস্থা এসব বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট সরিয়ে নেওয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি, তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে এসব ভুয়া কনটেন্ট তৈরিকারী ও প্রচারকারীদের শনাক্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।