তরুণদের ইশতেহার © ফাইল ছিল
বাকি মাত্র ১৮ দিন। এরপরই বহুল কাঙ্ক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট উৎসব। আসন্ন এই একাদশ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের প্রধান দুটি দলের নজর এখন তরুণ ভোটারদের দিকে। তথ্যমতে, এবার নির্বাচনে প্রায় আড়াই কোটি নতুন ভোটার অংশগ্রহণ করবে; যাদের বয়স ১৮ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে। মূলত এসব তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতেই আগামী দিনের কর্ম পরিকল্পনা সাজাচ্ছে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের দেওয়া তারুণ্যের ইশতেহারসহ শিক্ষিত, তরুণ ও কোটি বেকারদের বিষয়গুলো মাথায় রেখেই চলছে ইশতেহার প্রণয়নের কাজ।
ইশতেহার প্রণয়নে দায়িত্ব সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখের বেশি। যাদের মধ্যে প্রায় আড়াই কোটি ভোটারই তরুণ। প্রতিটি আসনে গড়ে ২৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার পর্যন্ত তরুণ ভোটার রয়েছেন। নির্বাচনে এরাই জয়-পরাজয়ে মুখ্য ভূমিকা রাখবেন। সুতরাং তাদের বিষয়টি রেখেই ইশতেহার তৈরি হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও বলছেন, তরুণদের ভোট যারা বেশি পাবেন, তাদের বিজয়ী হওয়া সহজ হবে। যদিও তরুণদের চাহিদা মাফিক নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করা খানিকটা চ্যালেঞ্জ; তারপরও বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত রেখেই ইশতেহার প্রস্তুত করবে মহাজোট ও ঐক্যফ্রন্ট। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, তরুণ ভোটারদের কাছে প্রধান বিষয় হিসাবে গুরুত্ব পাচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। বর্তমানে আমাদের দেশে শিক্ষিত বেকার প্রায় এক কোটি। তরুণদের প্রধান সমস্যা চাকরির সুযোগ। এজন্য তাঁদের পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ তৈরির কথা ইশতেহারে থাকতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়িয়ে, পর্যটনশিল্পের প্রসার ঘটিয়ে ও আলাদা অর্থনৈতিক জোন করে তাদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। এছাড়া শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, গবেষণাকেন্দ্রিক পড়াশোনার সুযোগ তৈরি এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্ট তাদের নিার্বাচনী ইশতিহারে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়টিকে সমানভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে। এছাড়া উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে বেকারত্বের হার কমানোর বিষয়টিও থাকছে দুই দলের ইশতেহারে।
সূত্র বলছে, মাত্র ১৮দিন হাতে থাকা নির্বাচন উপলক্ষে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ইশতেহার প্রণয়নের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দলটির ইশতেহারকে তরুণবান্ধব করতে থাকছে নতুন কর্মের সৃষ্টি, তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি, গুণগত শিক্ষা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলার অঙ্গীকার। এছাড়া তরুণ প্রজন্মকে আগামী দিনের উন্নয়নে কাজে লাগাতে তাদেরকে দেশ পরিচালনার সাথে যুক্ত করা হবে। তাদের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। দেশের তৃণমূল পর্যায়ের তরুণ বেকারদের কথা মাথায় রেখে গ্রামকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে তোলা হবে কর্মসংস্থান। আর এ লক্ষ্যে বাড়ানো হবে শিল্পায়ন। এছাড়া সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার থাকছে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে।
অন্যদিকে কোটা আন্দোলনকারীদের ‘তারুণ্যের ইশতেহার’ পর্যালোচনা করে তাদের বেশ কিছু দাবি ইশতেহারে অন্তর্ভূক্ত করার কথা ভাবছে দলটি। ইশতেহার প্রণয়নের সাথে সম্পৃক্ত কয়েকজন নেতা জানান, কোটা আন্দোলনকারীদের ‘তারুণ্যের ইশতেহার’ পর্যালোচনা করে তাদের বেশ কিছু বিষয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে। তাদের ১০ দফা দাবির কয়েকটি নতুন কোনো ফরম্যাটে ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না— তা নিয়েও কাজ হচ্ছে।
ইশতেহার প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক নেতা জানান, উৎপাদনমুখী ব্যাপক নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার মান উন্নয়ন, গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতির উন্নয়ন ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি, গুণগত শিক্ষা এবং রাজস্ব খাত থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে শুধু শহরভিত্তিক উন্নয়ন নয়, শহর অঞ্চলের মতো গ্রামীণ এলাকায়ও পরিকল্পিত ঘরবাড়ি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার আছে ইশতেহারে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলা, নারীর ক্ষমতায়নের কথা জোরালোভাবে থাকবে। এছাড়া আধুনিক, জনবান্ধব পুলিশ কী ধরনের হবে, তা নিয়েও একটি আলাদা অনুচ্ছেদ থাকছে। কোটা আন্দোলনকারীদের ‘তারুণ্যের ইশতেহার’ পর্যালোচনা করে তাদের বেশ কিছু বিষয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে। তাদের ১০ দফা দাবির কয়েকটি নতুন কোনো ফরম্যাটে ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না তা নিয়ে কাজ হচ্ছে বলেও জানা গেছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশ থেকে আসা তরুণের সঙ্গে ‘লেটস টক’ নামে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে তাদের ভাবনার কথা শুনেছেন। সেসব ভাবনার চুম্বক অংশ গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া গণভবনে প্রধানমন্ত্রী তরুণদের দাবির প্রতি সম্মতিস্বরূপ সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধির পক্ষেও মত দিয়েছেন। এ বয়স বাড়ালে সিনিয়র-জুনিয়র ভারসাম্য থাকবে কি না তা নিয়েও তিনি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেন। বয়স বাড়ানো হলে নির্দিষ্ট চাকরিতে একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ কতবার আবেদন করতে পারবেন তার একটি সীমানা টেনে দেওয়া হতে পারে ইশতেহারে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও ইশতেহার প্রণয়ন উপকমিটির আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক জানান, “আগামী দিনের তরুণ সমাজ নিয়ে আমরা কী ভাবছি- তরুণ সমাজকে উন্নয়নের সাথে, দেশ পরিচালনার সাথে কিভাবে সম্পৃক্ত করা যায়, সেটা জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে। সেই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ভাবনাগুলো আসবে ইশতেহারে।
অন্যদিকে ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ভাবনায়ও তরুণরাই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। তরুণদের দাবি দাওয়া মাথায় রেখেই তাদের ইশতেহার প্রণয়নের কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে তরুণ ভোটারের মন জয় করতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বড় পরিকল্পনা নিয়েছে ঐক্যফ্রন্ট।
ঐক্যফ্রন্ট সূত্র জানায়, পুলিশ ও সামরিক বাহিনী ছাড়া সরকারি চাকরিতে প্রবেশের জন্য কোনো বয়সসীমা থাকবে না। সরকারি চাকরিতে শুধু অনগ্রসর জনগোষ্ঠী এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা ছাড়া আর কোনো কোটা থাকবে না। ত্রিশোর্ধ্ব শিক্ষিত বেকারের জন্য বেকার ভাতা চালু করা হবে। আগামী তিন বছরের মধ্যে সব সরকারি শূন্য পদে নিয়োগ সম্পন্ন করা হবে।
ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার প্রণয়ন কমিটি সূত্র জানায়, শিক্ষা ব্যবস্থায় কিছু যুগোপযোগী পরিবর্তন আনা হবে। কর্মসংস্থানকে প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন করা হবে। পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল করা হবে। সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। প্রথম বছর থেকেই ডাকসুসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করা হবে। পুরোপুরি ভ্যাটমুক্ত থাকবে বেসরকারি শিক্ষা। মাদরাসা শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষা দিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থান করা হবে। সূত্র জানায়, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপরে নৃশংস হামলাকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে। বড় শহরগুলোতে ট্রাফিক জ্যাম নিরসনকল্পে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া হবে। শহরে গণপরিবহনকে প্রাধান্য দিয়ে পরিবহন নীতি প্রণয়ন করা হবে। মানুষের জন্য আরামদায়ক গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা হবে। রেলখাতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে সমপ্রসারণ করা হবে।
কী ছিল তারুণ্যের ইশতেহারের দাবি-দাওয়া
গত ৩ ডিসেম্বর কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রত্যাশীদের প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে তারুণ্যের ইশতেহার ভাবনা প্রকাশ করে। এতে নির্বাচনে অংশ নেয়া রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন তারা।
পাঁচ দফা দাবি-দাওয়ার মধ্যে ১ম দাবি ছিল- বেকারত্ব নিরসনে কর্মসংস্থান। এতে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো- শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন শেষে যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মের নিশ্চয়তা প্রদান, বেকার তরুণদের সহজ শর্তে ন্যূনতম ৫ লাখ টাকার ঋণ প্রদান, ঘুষ-দুর্নীতি ও রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা।
২য় ধফায় উল্লেখিত দাবিগুলো হলো- চাকরির নিয়োগ ব্যবস্থা। এতে রয়েছে-৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর চাকরিতে কোটা প্রথার সংস্কার, চাকরির আবেদন সম্পূর্ণ ফ্রি করা, প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার ১০ দিনের মধ্যে ও লিখিত পরীক্ষার ৯০ দিনের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ করা এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে সর্বোচ্চ ৫০ নির্ধারণ করা, তথ্য যাচাইয়ের নামে হয়রানি বন্ধকরণ, বেসরকারি চাকরি আইন প্রণয়ন ও তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক নিয়োগ পরীক্ষা পদ্ধতির প্রণয়ন।
৩য় ধফা দাবির মধ্যে রয়েছে- শিক্ষা ও গবেষণা। এতে বলা হয়, শিক্ষাখাতে বার্ষিক বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ রাখা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেয়া, প্রশ্ন ফাঁসবিরোধী সেল গঠন করা, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধে কঠোর আইন করা এবং মেধাপাচার রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৪র্থ ধফা দাবিতে উল্লখ করা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক সংক্রান্ত বিষয়গুলো। এতে বলা হয়, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা, আবাসনের কৃত্রিম সংকট দূর করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটের ১০ শতাংশ গবেষণা খাতে বরাদ্দ দেয়া, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির পাশাপাশি বেতন কাঠামো তৈরি করা, মাদক, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাস-দখলদারিত্বমুক্ত গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ ক্যম্পাস গড়ে তোলা।
৫ম তম ধফায় বলা হয় যুব অ্যাসেম্বলি আয়োজনের কথা। যুব সমাজকে গণতান্ত্রিক পরিবেশে উন্নত নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠার সুযোগ দিতে প্রতি বছর যুব অ্যাসেম্বলি এর আয়োজন করার উদ্যোগ নিতে বলা হয়। যুব অস্যাম্বেলিতে প্রতিনিধিত্ব করবে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ছাত্র সংসদের সদস্যরা।