জ্যাক মা : ব্যর্থতা থেকে আলীবাবা ও বিশ্বজয়ের গল্প

২৮ মে ২০১৯, ০২:০০ PM
জ্যাক মা

জ্যাক মা

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কথা বলতে গেলে যে প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম সবার আগে আসে তারমধ্যে আলীবাবা গ্রুপ অন্যতম। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৪২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। এরমধ্যে প্রায় চার হাজার কোটি ডলারের মালিক একজন। তিনি হলে জ্যাক মা, আলিবাবা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। সম্প্রতি অবশ্য বিশাল এই ই-কমার্স সাম্রাজ্যের প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

বিশাল এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হলেও তিনি কিন্তু খুব ভালো ছাত্র ছিলেন না। স্কুল ও কলেজে কয়েকবার ফেল করেছেন। ইংরেজিতে শিক্ষকতাও করেছেন। তবে এসব কিছুই আলিবাবা গ্রুপ প্রতিষ্ঠার পেছনে বাঁধা হয়ে দাড়াতে পারেনি। বিশাল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তিদের একজন তিনি।

১৯৬৪ সালে পূর্ব চীনের চচিয়াং প্রদেশের হাংচৌ শহরে জন্মগ্রহণ করেন জ্যাক মা। তিন সন্তানের দ্বিতীয় ছিলেন তিনি। তার বাবা মা-লাইফা এবং মা চুই ওয়েনচাই। তারা ছিলেন পেশাদার গল্প বলিয়ে ও সঙ্গীত শিল্পী হলেও উপার্জন ছিলো সামান্য। ফলে সংসারে খুব বেশি স্বচ্ছলতা ছিল না তাদের। জ্যাক মা ছাড়াও তার বড় ভাই ও এক বোন ছিলো। এই সংসার থেকে উঠে এসেই আজ বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের একজন তিনি।

ছোটবেলা থেকেই ইংরেজি ভাষায় বেশ আগ্রহ ছিলো জ্যাক মা’র। উন্নতি করতে হলে এ ভাষা জানতে হবে তা তিনি ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। ১২ বছর বয়স থেকেই ইংরেজি শেখা শুরু করেন তিনি। এজন্য ভালো একটি সুযোগও পেয়ে যান। হ্যাং-চাও ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে আসা ইংরেজী-ভাষী পর্যটকদের ফ্রি গাইড হিসেবে কাজ করতেন তিনি। সেখানে টানা ৯ বছর ধরে ৭০ মাইল পথ সাইকেল চালিয়ে পর্যটকদের এলাকা ঘুরিয়ে দেখাতেন মা। এর বিনিময়ে তার একটা প্রাপ্তি ছিলো ইংরেজি শিখতে পারা। তখন এক পর্যটকের সাথে তাঁর ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেলে মা ইউনকে ‘জ্যাক মা’ নাম দিয়েছিলেন ইংরেজি উচ্চারণের সুবিধার্থে।

পরবর্তী জীবনে ব্যাপক সফল হলেও পড়াশুনায় তেমন ভালো ছিলেন না জ্যাক মা। প্রাইমারি স্কুলে পরীক্ষার সময় দু’বার ফেল করেন। পরে মাধ্যমিকেও তিনবার ফেল করার পর কলেজে ভর্তি হতে পেরেছিলেন। হ্যাং-চাও দিয়ানজি ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে যোগদানের আগে ৩০টি চাকরির চেষ্টা করেন তিনি। তবে একটিতেও সুবিধা করতে পারেননি।

প্রাইমারিতে দুবার, মাধ্যমিকে তিনবার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় তিনবার ফেল করে চুড়ান্ত ব্যর্থতার পরিচয় দেন তিনি। এমনকি চীনে যখন কেএফসি আসে তখন ২৪ জন চাকরির জন্য আবেদন করে। এর মধ্যে ২৩ জনের চাকরি হয়। শুধুমাত্র একজন বাদ পড়ে, তিনি হলেন জ্যক মা। এভাবে বারবার ব্যর্থ হয়েও পৌঁছেছেন সাফল্যের শিখরে।

১৯৯৫ সালে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের অনুবাদক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করার সুযোগ পেয়ে সর্বপ্রথম ইন্টারনেট সেবার সঙ্গে পরিচিত হন তিনি। পরে নতুন ব্যসা শুরুর চিন্তাভানা করেন। এজন্য ২৪ জন বন্ধুকে বাসায় ডেকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেও তারা কিছুই বোঝেনি। মাত্র একজন তার পাশে থাকতে রাজি হয়েছিলেন। কারণ তখন আক্ষরিক অর্থে ব্যবসা করার তেমন কোনো যোগ্যতা তার ছিল না। শিক্ষায়ও বেশ পিছিয়ে ছিলেন।

৩৩ বছর বয়সে তিনি প্রথম কম্পিউটার ব্যবহার করেন। তিনি অনলাইনে প্রথম যে শব্দটি লিখে সার্চ দিয়েছিলেন, তা ছিলো ‘বিয়ার’। কিন্তু সেই সার্চের ফলাফলে চীনা কোনো বিয়ারের নাম ছিল না। সেটি তাঁকে অবাক করে দেয়। তখন তিনি চীনের জন্য ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন। এর আগে কম্পিউটার সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণাই ছিল না।

পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে ১৮ জন সহপ্রতিষ্ঠাতাকে নিয়ে নিজের বাসায় আলিবাবা গ্রুপের যাত্রা শুরু হয় জ্যাক মা’র হাত ধরে। তবে তাদের জন্য কোনো বিনিয়োগকারী ছিল না। ১৮ জন পাঁচ লাখ আরএমবি করে বিনিয়োগ করে অন্তত ১২ মাস ওই অর্থ দিয়ে ব্যবসাটা চালানোর পরিকল্পনা ছিলো তাদের। তবে আট মাসের মাথায় তাদের সব অর্থ শেষ হয়ে যায়।

পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট জো সাইকে নিয়ে যখন সিলিকন ভ্যালিতে যান তখন ৩০ জন বিনিয়োগকারী তাদেরকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ তাদের পরিকল্পনা কারোর পছন্দ হচ্ছিলো না। তারপরও সফল একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে আলিবাবা গ্রুপ। এক লাখের উপরের বিশাল কর্মীবাহিনী রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

জ্যাক মা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘মানুষ কেন আপনাকে সাহায্য করবে? মানুষ আপনাকে সাহায্য করলে সেটা অস্বাভাবিক। কেউ আপনাকে সাহায্য করবে না, এটাই তো স্বাভাবিক। সাহায্যটা আপনাকে অর্জন করে নিতে হবে।’

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ধনী ব্যক্তি জ্যক মা গত বছরের ১০ই সেপ্টেম্বর ৫৫ বছরে পা দিয়েছেন। তবে তার একটি ঘোষণা সারাবিশ্বের জন্যই বিস্ময় হয়ে এসেছে। নিজের প্রতিষ্ঠিত আলিবাবা গ্রুপের প্রধান নির্বাহীর পদ ছেড়ে আবার শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তাঁর এই ঘোষণা সারাবিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে দায়িত্ব ছাড়বেন তিনি।

চীনে ধনীদের তালিকায় এখন তৃতীয় স্থানে রয়েছেন জ্যাক মা। এছাড়া ফোর্বস বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের যে তালিকা প্রকাশ করেছে, সেই তালিকায় তিনি ২০তম স্থানে রয়েছেন। আলিবাবার বর্তমান বাজার মূল্য ৪২ হাজার কোটি ডলারের বেশি। যেখানে তার প্রায় ৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। জ্যাক মার সম্পদ রয়েছে প্রায় চার হাজার কোটি ডলারের। ২০১৪ সালে আলিবাবা যখন শেয়ার বাজারে যাত্রা শুরু করে তখন প্রতিষ্ঠানটির বাজার মূল্য ধরা হয়েছিল ১৫ হাজার কোটি ডলার।

১৯৯৯ সালের অক্টোবরের গোল্ডম্যান স্যাকস ও সফটব্যাংক বিনিয়োগ পায় আলিবাবা। এতেই ঘুরে দাড়ায় প্রতিষ্ঠানটি। ২০০৫ সালে আলিবাবার ৫০ শতাংশ শেয়ার ইয়াহু কিনে নিলে তা ছিলো তাদের বিশাল অর্জন। এ চুক্তির পর ২০১৩ আলিবাবা’র প্রধান নির্বাহী পদ ছাড়েন তিনি। প্রতি বছরর ১১ নভেম্বর চীনে ‘সিঙ্গেলস ডে’ পালন করা হয়। এটি আলিবাবা’র ব্যবসায়ের জন্য সবচেয়ে বড় দিন। ২০১৬ এক দিনে প্রায় এক হাজার ৮০০ কোটি ডলারের পণ্য বিক্রির রেকর্ড গড়ে আলিবাবা। এছাড়া ২০১৭ সালে একদিনে আড়াই হাজার কোটি ডলারের পণ্য বিক্রি করে তারা। আর গত বছর ‘সিঙ্গেলস ডে’তে তিন হাজার ১০০ কোটি ডলারের পণ্য বিক্রির রেকর্ড গড়ে আলিবাবা গ্রুপ।

শিক্ষাখাতে বিশেষ আগ্রহ থেকে ‘জ্যাক মা ফাউন্ডেশন’ গঠন করেছেন তিনি। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে চীনের গ্রামপর্যায়ে শিক্ষা বিস্তারে কাজ করবেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও পছন্দের তালিকায় রয়েছেন জ্যাক মা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করলে তার প্রশংসা করে তিনি বলেছিলেন, ‘জ্যাক মা পৃথিবীতে বিশাল উদ্যোক্তা।’ তখন জ্যাক মাও ট্রাম্পের অনেক প্রশংসা করেছিলেন।

জ্যাক মা নিজেকে আলোচনায় রাখতে পছন্দ করেন। আলিবাবা চালাতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন সময় অভিনব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তাতে সফলও হয়েছেন। প্রতিবছরই এর প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী বেশ ঘটা করে পালন করা হয়। সেখানে তিনি নিজেও বিনোদনদাতা হিসেবে পারফরমেন্স করেন। এমনকি আলিবাবার ২০ হাজার কর্মীর সামনে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে পাঙ্ক রকারের মতো সাজ নিয়েছিলেন জ্যাক মা।

শেষ করি জ্যাক মা‘রই কিছু কথা দিয়ে। তিনি বলেছেন, ‘অনেকের স্বপ্ন আছে, কিন্তু তাঁরা পরিশ্রম করেন না। অনেকে পরিশ্রম করেন, কিন্তু তাঁদের কোনো স্বপ্ন নেই। উদ্যোক্তাদের মধ্যে দুই-ই থাকা চাই। স্বপ্ন দেখতে হবে, পরিশ্রমও করতে হবে। সে সব বিশেষজ্ঞের কথা শুনবেন না, যাঁরা বলেন- এটা কোরো না, ওটা কোরো না। ভবিষ্যতে কী হতে যাচ্ছে, সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারবে, পৃথিবীতে এমন কোনো বিশেষজ্ঞ নেই। উদ্যোক্তারাই একদিন বিশেষজ্ঞ হবে।’

তথ্যসূত্র: বিবিসির প্রতিবেদন, উইকিপিডিয়া এবং ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন নিবন্ধ।

‘দরকার হলে আমাকে ডিন থেকে বাদ দিয়ে দিন, আমি এসবে নেই’
  • ০৩ নভেম্বর ২০২৬
মাকে বঁটি দিয়ে হত্যা, কারাগারে অসুস্থ হয়ে মারা গেলেন সেই শি…
  • ০৩ নভেম্বর ২০২৬
ইনানীতে গ্যাসের আগুন: কত দিন জ্বলবে, কীভাবে মিলবে স্থায়ী সম…
  • ০৩ নভেম্বর ২০২৬
ফের গ্যাসের দাম বৃদ্ধি জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত দাবি করে ব…
  • ০৩ নভেম্বর ২০২৬
৪ তারিখের আন্দোলন কর্মসূচি থেকে সরে এসেছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষ…
  • ০৩ নভেম্বর ২০২৬
২৫ হাজার বোলার থেকে উঠে এলেন সেরা ২১, পুরস্কৃত করল বিসিবি
  • ০২ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950