শেকড়হীন একটি প্রজন্ম গড়ে উঠছে

১৭ জুন ২০২১, ০৫:০৫ PM
কামরুল হাসান মামুন

কামরুল হাসান মামুন © ফাইল ছবি

দেশে কিন্তু একটা প্যারাডাইম শিফট ঘটে গেছে যার consequence আমরা সমাজের নানা স্তরে দেখতে পাচ্ছি। এইটা আসলে অনেকটা কন্ডাকটর থেকে সুপারকন্ডাক্টর কিংবা পানি থেকে বাষ্প বা বরফে পরিণত হওয়ার মত একটা phase ট্রানজিশন। দেশটাকে সময়ের অক্ষে ফেলে একটু বড় ক্যানভাসে পর্যবেক্ষণ করলেই এইটা টের পাওয়া যায়।

এর প্রাথমিক লিটমাস টেস্ট হলো বর্তমান বাংলাদেশে ভালো আইকনিক বা প্রভাবশালী কবি, সাহিত্যিক, লেখক, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, অভিনেতা ও নাট্যকারের শূন্যতা চলছে। বিশেষ করে কবি, সাহিত্যিক, লেখকের শূন্যতাটা একটু বেশি চোখে পরে। কিভাবে বুঝবেন যে এত বড় স্পেক্ট্রামের মানুষদের শূন্যতা চলছে? দেশে কোন অন্যায় হলে এইসব গোষ্ঠী থেকে কোন প্রতিবাদ আসে না। আগে প্রতিবাদ আসতো ছাত্র-যুব সমাজ থেকে এবং একই সাথে কবি, সাহিত্যিক, লেখক, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, অভিনেতা ও নাট্যকারদের কাছ থেকেও প্রতিবাদ আসতো।

প্রশ্ন হলো এই শূন্যতাটা কেন তৈরী হলো? এর অনেক কারণ আছে। তবে আমি একটি বিশেষ দুইয়েকটি কারণের দিকে আলোকপাত করব। পৃথিবীতে এমন একটি দেশ কি আছে যারা ভিন দেশি ভাষায় পড়াশুনা করে উন্নত হয়েছে? চীন জ্ঞান বিজ্ঞান অর্থবিত্তে এত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে কেন বা কিভাবে? এইটা একটা দীর্ঘ প্রসেস। এরা প্রথম যেই কাজটি করেছে সেটি হলো তাদের স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পাঠ্য বইকে তারা চীনা ভাষায় প্রনয়ন করেছে।

একই কাজ এর আগে জাপান করেছে, দক্ষিণ কোরিয়া করেছে এবং তারও অনেক আগে ইউরোপের দেশগুলো করেছে। জার্মানির শিক্ষার্থীরা কিংবা ইতালির শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ভাষায় লেখাপড়া করে না। ইউরোপের ইংল্যান্ড ব্যতীত সকল দেশে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার মাধ্যম তাদের নিজ নিজ মাতৃভাষায় হয়ে থাকে। দুনিয়ার এমন একটি দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না যে তারা ভিন দেশের ভাষায় লেখাপড়া করে জ্ঞান বিজ্ঞান ও অর্থেবিত্তে উন্নত হয়েছে। একটি উদাহরণও নাই। Because it is not simply possible!!

পড়াশুনা সত্যিকারভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে হলে মাতৃভাষায় পড়ার কোন বিকল্প নেই। প্রত্যেকটা শব্দের একটা মেন্টাল পিকচার আছে। মাতৃভাষাই কেবল পারে শব্দের পেছনের সেই ছবিটা হৃদয়ে আঁকতে। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটিই আমরা আজ পর্যন্ত শুরুই করতে পারিনি। আমরা বরং উল্টো পথে হেঁটেছি। দেশে যত্রতত্র ইংরেজি মাধ্যমই শুধু চালু করিনি। স্কুল কলেজে মাতৃভাষার যেইসব বই আছে সেগুলোকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে তাকে বাংলা মিডিয়ামের ইংরেজি ভার্সন হিসাবে চালু করেছি। এটিকে আমি বলি ডাবল ক্রাইম।

আমরা ভিন দেশি ভাষা অবশ্যই শিখব কিন্তু সেটা মাতৃভাষার বিনিময়ে নয়। আগে মাতৃভাষা। ইংরেজি মাধ্যমে পড়িয়ে এক্সপোর্ট কোয়ালিটির ছেলেমেয়ে বানালেতো এক্সপোর্টেড হয়ে যাবে তাহলে দেশ গড়বে কে? আমাদের দেশে এখন সেটাই ঘটছে।

একটি দেশের জনসংখ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মধ্যবিত্ত। এরা একটু অভাব অভাব পরিবেশে থাকে কিন্তু কোন অভাবই তেমন দীর্ঘস্থায়ী থাকে না। এই অভাব অভাব পরিবেশটা মানুষকে একটা ড্রাইভিং ফোর্স দেয়। এদের মাটির সাথে সম্পর্ক থাকে। এদের সামাজিক বন্ধন মজবুত থাকে। এই অংশ থেকেই মূলত কবি, সাহিত্যিক, শিপ্লী, নাট্যকার তৈরী হয়।

এই অংশটি যখন থেকে তাদের ছেলেমেয়েদের ইংরেজি মাধ্যমে পাঠাতে শুরু করে আমাদের প্যারাডাইম শিফট সেইদিন থেকেই শুরু হয়। আমার নিজের দুই কন্যা ইংরেজি মাধ্যমে পড়েছে বলে আমি এর ভেতর বাহির গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি এবং করছি। এই ইংরেজি মাধ্যমের ছেলেমেয়েদের অধিকাংশই মোটাদাগে বলা যায় এরা বাংলা কবিতা পড়ে না, বাংলা সিনেমা দেখে না, বাংলা নাটক থিয়েটার দেখে না, বাংলা গান শুনে না। ফলে এরা এইসবের ভোক্তা না।

এর ফলে একদিকে ভালো মানের বাংলাদেশি কবি লেখকের বই বিক্রি কমে গেছে আর অন্যদিকে এরা বাংলা ভাষার কবিতা গল্প পড়ে না বলে দেশ এই অংশ থেকে যেই কবি সাহিত্যিক নাট্যকার শিপ্লী পেত তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এইখানেই সৃষ্টি হয় মিসিং ডটস।

আরো একটা বিষয়। আমরা যখন গ্রামে স্কুল কলেজে পড়তাম তখন আমাদের সহপাঠীদের অনেকেই উপজেলায় চাকরী করা অফিসারদের ছেলেমেয়ে ছিল। একটি বিষয় লক্ষ করবেন যে বাংলাদেশের অধিকাংশ কবি সাহিত্যিকদের বাবারা বদলি চাকরী করতেন। বাবারা যখন যেখানে যেতেন সেখানে পুরো ফ্যামিলি নিয়ে যেতেন। ফলে এই ছেলেমেয়েদের মধ্যে নিত্য নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে চলতে শিখে যায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বদলি হওয়ার কারণে বাংলাদেশের নানা অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে পরিচয় ঘটে। এইসবই কবি সাহিত্যিক হওয়ার মসলা।

এখন বদলি চাকরীর বাবা মায়েরা না বরং গ্রামের সাধারণ মানুষের অনেকেই ছেলেমেয়েদের আর গ্রামে পড়ায় না। মোটামোটি সামর্থ্য থাকলে স্ত্রী সন্তানরা থাকে ঢাকায়। সেখানে থেকে স্কুল কলেজে পড়াশুনা করে। ফলে এরা না শিখে সামাজিক হতে, না পায় তারা মাটির স্পর্শ, মাটির গন্ধ। না তারা বাংলার আসল সৌন্দর্য দেখতে পায়। এরা একটা cage বা খাঁচায় বড় হয়।

উপরে উল্লেখিত দুটি বিষয়ের কারণে এই দেশে দেশপ্রেমিক মানুষের সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। একটি এক্সপোর্ট কোয়ালিটির ছেলেমেয়ে তৈরী হচ্ছে যাদের কাছে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত, বাউল, ভাটিয়ালি, পল্লীগীতি অপরিচিত। শুধুই কি ইংরেজি মাধ্যম বা ইংরেজি ভার্সন? আরো আছে। আছে কওমি মাদ্রাসা, মাদ্রাসা, ইংলিশ মিডিয়াম মাদ্রাসা।

এর ফলে শেকড়হীন একটি প্রজন্ম গড়ে উঠছে। এত বছর ধরে ইংরেজি মাধ্যম চালু আছে তবুও এখনো দেশের প্রায় সব কবি, সাহিত্যিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী বাংলা মাধ্যমের। আমি দেখেছি ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়াদের মধ্যে অনেকেই অসম্ভব মেধাবী। এই মেধাবীদের প্রায় সকলেরই আসল গন্তব্য আমেরিকা, কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়া।

যেই মধ্যবিত্তের একটি অংশটি দেশের সংস্কৃতির কথা ভাবতো, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতো তাদের একটি অংশ বিদেশে। আর যারা দেশে আছে তারাও বড় বেশি আত্মকেন্দ্রিক। তারা দেশের শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষদের ভাষা বুঝে না। এদের অনেকেই ঊনপঞ্চাশ কত জানেনা। বাংলা দৈনিক পড়ে না। বন্ধু বান্ধবদের সাথে আড্ডা দিলে বিদেশী ভাষায় কথা বলে। লন্ডনের নাপিতও পারফেক্ট ইংরেজি বলতে পারে। ইংরেজি কেবল আরেকটি ভাষা। ইংরেজিকে জ্ঞানের সমার্থক ভাবা বোকামি। জাতিগতভাবে এই ভুলটিই আমরা শত বছর ধরে করে আসছি। এই নতুন প্রজন্ম বড় ডিসকানেক্টেড।

ফলে দেশ সংকটে পরলে এরা প্রতিবাদ করে না। এইজন্যই দেশে যখন কোন অন্যায় হয় প্রতিবাদ নাই। দেশে যেহেতু অন্যায় বেড়ে গেছে তাই দেশের অনেকেই দেশে থাকতে এবং নিজেদের সন্তানদের বড় করতে নিরাপদ বোধ করে না। শুধুই কি নতুন প্রজন্ম তৈরী হচ্ছে না। একই সাথে অনেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমরা এক বিশাল শূন্যতার মধ্যে বসবাস করছি।

৫০ বছর হয়ে গেল দেশ স্বাধীন হয়েছে অথচ এখনো আমাদের নীতিনির্ধারকরা এই কথাটিই বুঝলো না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গর্বের ধন সত্যেন বোস অনেক আগেই বলে গেছেন যে আমাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। আমার শিক্ষক অধ্যাপক হারুন অর রাশিদ স্যারও সব সময় এই কথাটি বলেছেন। তিনি বাংলায় পদার্থবিজ্ঞানের অনেকগুলো বইও লিখেছেন। অর্থাৎ মুখের কথাকে কাজে পরিণত করে দেখিয়ে গেছেন। Irony কি জানেন? বাংলাদেশই এক মাত্র দেশ যারা মাতৃভাষার জন্য আন্দলোন করেছে। বুকের রক্ত আর প্রাণের বিনিময়ে মাতৃভাষাকে রক্ষা করেছে। সেই দেশে আজ মাতৃভাষা, দেশীয় সংস্কৃতি আজ চরমভাবে অবহেলিত।

লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির দাবি ফের নাকচ ইরানের
  • ০১ এপ্রিল ২০২৬
ফেনীতে দুই বেসরকারি হাসপাতাল বন্ধের নির্দেশ দিল স্বাস্থ্য ব…
  • ০১ এপ্রিল ২০২৬
তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত, সিলেটের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ
  • ০১ এপ্রিল ২০২৬
রুয়েটে ‎ক্যান্টিনে বসা নিয়ে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ
  • ০১ এপ্রিল ২০২৬
অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি, জানতে চাইলে ছাত্রদলের দুই নেতাকে …
  • ০১ এপ্রিল ২০২৬
দৌলতদিয়া বাসডুবি: তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল
  • ০১ এপ্রিল ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence