সংকটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

সংকট
সংকটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়  © ফাইল ছবি

২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপ করায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। করোনাকালে এমনিতেই অর্থ সংকটে পড়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে। অর্থ সংকটে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা ও ভবন ভাড়া প্রদান অনেক ক্ষেত্রেই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থপ্রাপ্তির একমাত্র উৎস হলো শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি। করোনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ থাকায় টিউশন ফি পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে বহু অভিভাবক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

আয় কমে গেছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ গরিব হয়ে গেছে। ফলে তারা তাদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় নির্বাহে হিমশিম খাচ্ছেন। অন্যদিকে এইচএসসি পরীক্ষা সময়মতো না হওয়ায় শিক্ষার্থী সংকটও দেখা দিয়েছে।

আরো পড়ুন ১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে ইউজিসির সতর্কতা

অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি’র ওপর অর্থছাড় দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। এমন সংকটকালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর কর আরোপ করায় অনুমোদিত নতুন বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই করারোপ নয়, বরং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সরকারি প্রণোদনাসহ বিভিন্ন সহায়তা প্রয়োজন।

করোনাকালে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। দীর্ঘ প্রায় ১৫ মাস ক্লাসরুমে তালা। শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন থেকে বহু দূরে। করোনার কারণে গত বছর এসএসসির চূড়ান্ত পরীক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব না হওয়ায় শতভাগ শিক্ষার্থীকে অটোপাশ দেওয়া হয়েছে। অটোপাশের পর দীর্ঘসময় হয়ে গেলেও দেশের পাবলিক বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সময়মতো ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করতে পারেনি।

শিক্ষার্থীরা অপেক্ষায় আছে। ফলে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই শিক্ষার্থীদের ভর্তির বিষয়টি দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে এক বড় চ্যালেঞ্জের জন্ম দিয়েছে। সঙ্গতভাবেই বলা যায়, দেশের ১০৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এদিকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে ৪৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা এখনো শুরুই করা যায়নি। আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও কবে শেষ করা যাবে তা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শেষ না হওয়ায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চরম শিক্ষার্থী সংকট দেখা দিয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসাবে ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০’ অনুযায়ী ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হয়ে থাকে। এদিকে বিদ্যমান ট্রাস্ট আইন-১৮৮২ অনুযায়ী ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত অলাভজনক প্রতিষ্ঠান করযোগ্য নয়।

অথচ প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স আরোপ করা হয়েছে। প্রায় ১৯ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ১৮/১৯ লাখ মানুষের টিন সার্টিফেট আছে। এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে ট্যাক্সের বাইরে রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর করারোপ অগ্রহণযোগ্য। সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি ও অর্থ সহায়তা দিয়ে থাকে।

বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়ে থাকে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নামমাত্র খরচে লেখাপড়ার সুযোগ পায় শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোনো সরকারি বরাদ্দ না পাওয়ায় তাদের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি’র ওপর নির্ভর করতে হয়।

একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র হিসাবে সরকার যেখানে মেধা সৃষ্টির লক্ষ্যে সর্বস্তরের শিক্ষা খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি দিয়ে থাকে, সেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর কর আরোপ করা হলে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তা ব্যাপক বৈষম্য সৃষ্টি করবে। বর্তমানে দেশে ১০৭টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করে। এছাড়া দেশে-বিদেশে বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন উদ্যোক্তা ও পেশাজীবী তৈরিসহ বিশাল জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।

লেখক: ড. মোহাম্মদ হাছানাত আলী, অধ্যাপক, আইবিএ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

তথ্যসূত্র: দৈনিক যুগান্তর


মন্তব্য