র‌্যাগিং কোনো শিক্ষা নয় কেবলই নির্যাতন

র‍্যাগিং বুঝানোর জন্য প্রতীকী ছবি দেয়া হয়েছে
জিসান তাসফিক   © ফাইল ফটো

র‌্যাগিং একটি ইংরেজি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ গোলমাল বা হট্টগোল। র‌্যাগিং নিয়ে কথা বলা আগে আরেক শব্দের কথা বলি সেটি হল ম্যানার (manner) যার বাংলা প্রতিশব্দ ভদ্র আচরণ। র‌্যাগিং আমাদের শিক্ষা সমাজে এখন প্রচলিত একটি শব্দ। এটা বলতে আমরা বুঝি শিক্ষা প্রাঙ্গণে সিনিয়র কতৃক জুনিয়র শাসন করা বা নির্যাতন করা। একজন শিক্ষার্থী প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় আসে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় কিছু সিনিয়রা ম্যানার এর নামে শাসন, অপদস্ত এমনকি শারীরিক নির্যাতন ও করে থাকে।

কেউ কেউ মনে করেন র‍্যাগিং সংস্কৃতির উদ্ভব হাল আমলে। কারণ সেই খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম বা অষ্টম শতক থেকেই র‍্যাগিংয়ের অস্তিত্ব বিদ্যমান। তখন এটি অন্তর্ভুক্ত ছিল গ্রিক সংস্কৃতির। কোনো ক্রীড়া সম্প্রদায়ে নতুন খেলোয়াড় বা শিক্ষার্থীদের আগমন ঘটলে, তার ভেতর কতটুকু একতা রয়েছে তা ঝালাই করে নিতে, এবং তার মধ্যে 'টিম স্পিরিট'-এর বীজ বপন করে দিতে, প্রবীণরা মিলে তাকে নানাভাবে উপহাস করত, তার নানা পরীক্ষা নিত, তার শারীরিক ও মানসিক শক্তি যাচাই করত।

সময়ের সাথে সাথে এই প্রক্রিয়ায় অনেক পরিবর্তন আসে। একপর্যায়ে সৈন্যদলগুলো এই পদ্ধতিটি অনুসরণ শুরু করে, যেখান থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে এটির প্রবেশ ঘটেছে। 

এটি বর্তমানে আমাদের দেশে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথা হিসেবে চলে আসছে। কিন্তু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃংখলা আইনে বা রাষ্ট্রীয় আইনে এর অনুমোদন নেই বরং নিষিদ্ধ। এটা এক অপসংস্কৃতির ফল প্রতি বছর প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা পেয়ে থাকে।

যখন প্রথম বর্ষের একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশ করে তখন তার কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ একদম নতুন হয়ে থাকে। কিছু সিনিয়র শিক্ষার্থীরা এই সুযোগের ব্যবহার করে বিভিন্নভাবে অপদস্ত করে যেমন রাতের বেলায় মাঠে হাটানো, সবার সামনে কান ধরে উঠবস করানো ইত্যাদি। বলিউডে একটি জনপ্রিয় মুভি যার নাম table no 21, এই মুভিতে চরম পর্যায়ের র‌্যাগিং এর বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে।

নিউজ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ সালে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন র‍্যাগিংয়ের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রচারের ফলে আলোচনায় এসেছিল। শাবিপ্রবিতে ছয় নবীন শিক্ষার্থীকে র‌্যাগিংয়ের নামে অর্ধনগ্ন করে শৌচাগারে সেলফি তুলতে বাধ্য করার অভিযোগে সাময়িক বহিষ্কার করা হয় পাঁচ শিক্ষার্থীকে।

আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক নবীন শিক্ষার্থী 'বড় ভাইদের' হাতে এতটাই শারীরিক ও মানসিক নিগ্রহের শিকার হয়েছিল যে, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল সে; চিনতে পারছিল না এমনকি নিজের নিজের বাবা ও আত্মীয়স্বজনদেরকেও। এগুলো সব প্রকাশিত ঘটনা কিন্তু এমন অনেক ঘটনা আছে যেগুলো আজীবন অপ্রকাশিতই থেকে যায়।

আইনের দৃষ্টিতে র‌্যাগিং একটি অপরাধ: র‌্যাগিং এর জন্য আলাদা কোনো আইন নেই কিন্তু বাংলাদেশ দন্ডবিধি এর ৩৭৪ ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে কোনো ব্যক্তিকে বেআইনীভাবে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো শ্রম করাতে বাধ্য করলে সেই ব্যক্তি যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ড যার মেয়াদ এক বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারে।

এছাড়াও দন্ডবিধিতে আরও অনেক ধারার বর্ণনার সাথে র‌্যাগিং বাস্তবতা মিলে যায়। র‌্যাগিং একজন অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর অভিযোগ যখন প্রমাণিত হয় তখন এইসব দন্ডতো আছেই তারও সাথে আছে বিশ্ববিদ্যালয় হতে বহিস্কার হওয়া। যেটা একজন শিক্ষার্থীর সব থেকে বড় অর্জন ছিল সেটাই বঞ্চিত হওয়া। র্যাগিং এর জন্য অনেক শিক্ষার্থীই শিক্ষাজীবন হারিয়েছে যার ফলে সে তার উজ্জল ভবিষ্যতে হারিয়েছে। এমন অনেক নিদর্শন আছে যার জন্য স্থায়ী বহিস্কার হয়েছে।

শিক্ষাজীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান হল বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী অনেক আশা ভরসা থাকে। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা য‍দি উচ্চ শিক্ষাজীবনে প্রথম হোচট খায় তবে তার সপ্ন ভেঙে যায় । বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে সিনিয়র জুনিয়র সম্পর্ক র‌্যাগিং এ নয় বরং ভালোবাসা আর আদর্শ হতে পারে।

 

লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ