‘উই রিভোল্ট’ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক মিথ্যাচার 

০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:০৭ PM , আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:০৮ PM
লেখকদ্বয়

লেখকদ্বয় © টিডিসি সম্পাদিত

একথা আজ সকলেই জানেন যে, ‘উই রিভোল্ট’ প্রসঙ্গটির প্রেক্ষাপট ৮ম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চে এই ৮ম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ ছাড়া আরো বেশ ক'জন বাঙালী অফিসার ছিলেন—এঁদের মধ্যে মেজর মীর শওকত আলী, ক্যাপ্টেন খালিকুজ্জামান চৌধুরী, ক্যাপ্টেন সাদেক হোসেন, লেফটেন্যান্ট মাহফুজুর রহমান অন্যতম।

ক্যাপ্টেন  খালিকুজ্জামানের ভাষ্যে সে রাতের কথা বর্ণিত হয়েছে—বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা হিসেবে সে রাতে জিয়াউর রহমানের স্ফুরণ ঘটেছিলো,  ‘সেনানায়ক’ থেকে ‘রাষ্ট্রনায়ক’ হবার যাত্রা নিজের অজান্তেই শুরু হয়েছিলো সেই রাতে।

এক.
প্রথম ‘উই রিভোল্ট’: ঢাকায় ইপিআর সদরদপ্তরে পাকিস্তানি হামলার ঘটনা শুনে তাৎক্ষণিকভাবে—অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমানের অন্তরের দেশপ্রেম তীব্রভাবে জেগে উঠে। আর, ঘটনাবহুল সেই ২৫ মার্চ রাতেই তিনি পাদপ্রদীপের আলোয় চলে আসেন।

এদেশের সাধারণ মানুষ হত্যার জন্য নিয়ে আসা গোলাবারুদ যা ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করা সোয়াত জাহাজ থেকে খালাস করার জন্য রেজিমেন্টের অধিনায়ক লে. কর্নেল আবদুর রশিদ জানজুয়া ক্যাপ্টেন চৌধুরী খালেকুজ্জামানকে আদেশ দেন। পরে মত বদলে জিয়াকে বন্দরে যেতে বলেন। খালেকুজ্জামানের বর্ণনা মতে---জানজুয়া বললেন, 'জিয়া, ইউ গো ফার্স্ট। খালিক উইল ফলো ইউ।' আমাকে অনেকেই প্রশ্ন করেছে, হোয়াই ডিড হি এগ্রি টু গো? …এটা আর্মিতে ট্রুপস হ্যাভ টু ওবে, ইউ ক্যান্ট রিফিউজ। জিয়া গাড়িতে উঠলেন সঙ্গে দু'জন অফিসার, সে. লে. হুমায়ুন এবং সে. লে. আজম। আমি ওপাশে গেলাম। 

জিয়া বললেন, খালেকুজ্জামান, কিছু শুনলে জানিও। দ্যাট ওয়াজ আ মেসেজ ফ্রম আল্লাহ থ্রু হিম। গাড়ি চলে গেল। জানজুয়া বাসায় চলে গেলেন। …অলি চলে গেল ওপরে। আমি এখন চিন্তায় পড়ে গেলাম। তখন ওপর থেকে বলল, স্যার আপনার একটা ফোন আসছে। আমি গেলাম। বাই দ্যাট টাইম ওলি হ্যাজ টকড। ফোনে ছিলেন সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অব স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক আবদুল কাদের। খুব স্নেহ করতেন আমাকে, চাচার মতো। বললেন 'ঢাকায় তো ইপিআরের ওখানে ফায়ারিং শুরু হয়ে গেছে। আর্মি হ্যাজ রেইডেড দা ক্যাম্পাস, তোমরা কী করছ …। আরও কিছু বললেন, আমাকে এক্সাইটেড করলেন। আমি ওলিকে বললাম, আই অ্যাম গোয়িং টু গেট ব্যাক আওয়ার বস জিয়া। দিস ইজ, আল্লাহ হ্যাজ ইনফিউজড সামথিং ইন মি। পিকআপ আসলো। রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়ানহাট ওভারব্রিজের সামনে ওখানে আল্লাহর রহমতে ওইটা (ব্যারিকেড) ছিল।

জিয়া লাইক এ ড্যান্ডি ম্যান, স্মার্ট, হাতে ফিল্টার উইলস, দ্যাট ফেমাস উইলস। সিগারেট খাচ্ছে বললেন, 'ইয়েস খালিক, হোয়াট হ্যাপেন্ড?' আই সেইড ফায়ারিং হ্যাজ স্টার্টেড। ইপিআর ক্যাম্প হ্যাজ বিন অ্যাটাকড, ব্লা ব্লা ব্লা। উনি তখন চিন্তা করলেন। 'খালিকুজ্জামান, খালিকুজ্জামান'। উনি শাউট করলে আমি আস্তে কথা বলি। সেম টোনে বলি না। বললাম, স্যার, স্যার।

জিয়া---হোয়াট শ্যাল উই ডু?
আমি--- ইউ নো বেটার।
জিয়া---ইন দ্যাট কেইস উই রিভোল্ট অ্যান্ড শো আওয়ার এলিজিয়েন্স টু দ্য গভর্নমেন্ট অব বাংলাদেশ।

দুই.
দ্বিতীয় বার ‘উই রিভোল্ট’: পুরো রেজিমেন্টসহ— পুরো বাংলাদেশের তখন কোনো খবর নাই। লিডার হ্যাজ টু টেক লিডারশিপ, ফিরে এসে...হুমায়ুন আর আজম গাড়িতে বসা ছিল। তাদের 'কোয়ার্টার গার্ডে' নেওয়া হলো। দে অয়‍্যার স্টান্ট। জিয়া বললেন, 'খালিক লেট মি গো অ্যান্ড গেট দিজ বাস্টার্ড (জানজুয়া)। (খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সাক্ষাৎকার, বিএনপি সময়-অসময়, মহিউদ্দিন আহমেদ)

২৫ মার্চের মধ্যরাতে জিয়ার নেতৃত্বে অষ্টম বেঙ্গলের বাঙালি সদস্যরা বিদ্রোহ করলেন। এর আগে জিয়া সবার কাছে আনুগত্য চেয়েছিলেন। মেজর শওকতকে জিয়া ঘুম থেকে ডেকে তুলেছিলেন। ইউনিট লাইনে শওকতকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'আই হোপ, ইউ আর উইথ আস? ...ইট ইজ বেটার টু সেটল দ্য ডিল বিফোর উই আর ইন অ্যা সিরিয়াস গেম।' ওখানে কনফিউশন, কেউ কিছু বলে না।

খালেকুজ্জামান শওকতকে বলেছিলেন, 'স্যার বলেন না মেজর জিয়া টু আই সি উইল টেক ওভার লিডারশিপ?' শওকত বললেন, 'ভাইসব, আপনারা শোনেন, এখন টু আই সি বলবেন।' ক্যাপ্টেন খালিকুজ্জামানের বর্ণনা অনুযায়ী: 'এ লিডার মাস্ট বি সিন অ্যান্ড হার্ড। খালি পর্দার পেছন থেকে লিডার যদি বলে, ইফেক্ট ইজ নট দ্য সেম। ড্রামটা (তেল জাতীয় কিছু রাখার ড্রাম) ফেলে দিলাম। 

জিয়া তো মানুষ ছোটখাটো। ওনাকে কেউ ধরেটরে ওপরে দাঁড় করিয়ে দিল। দেন হি কুড স্ট্যান্ড। ইট ইজ অ্যা ফ্যাক্ট দ্যাট হি ডেলিভার্ড। উই আর বিইং লেড। ওয়ান হু ইজ বিইং লেড, তার অত চিন্তা আসে না। লিডার টেকস দ্য রেসপনসিবিলিটি। লিডারের চিন্তা বেশি। সো হি ওয়াজ অ্যাংগশাস। (খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সাক্ষাৎকার, বিএনপি সময়-অসময়, মহিউদ্দিন আহমেদ)

একটা চরম মুহূর্তে জিয়াউর রহমান সিদ্ধান্তটি নিতে পেরেছিলেন। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে মেজর মীর শওকত আলী, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান, ক্যাপ্টেন অলি আহমদ, ক্যাপ্টেন সাদেক হোসেন, লে. সমশের মুবিন চৌধুরী, লে. মাহফুজুর রহমান এবং অষ্টম বেঙ্গলের অন্যান্য বাঙালি সদস্য ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন।

তিন.
মেজর জিয়া ও ‘৭১: “কোন যুদ্ধ বা বিপ্লবের পরে রাজনীতিবিদের প্রথম দায়িত্ব জনগণকে পুরো ঘটনা সত্য বলা, যদি নিজেদের স্বার্থে রাজনীতিবিদেরা সত্য গোপন করে তাহলে এর পরিণাম নির্মম"— ফিদেল ক্যাস্ট্রো।

কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এবং কর্ণেল জুলফিকারের কমান্ডো টিম এই তিন দিক সামলেছেন,  ৪ মার্চ তেলিয়াপাড়ায় সেক্টর গঠন থেকে অযোগ্য প্রবাসী সরকার আর সম্ভ্রান্ত বন্দী (মেজর জলিল তার বইয়ে এই শব্দ লিখেছেন) ওসমানী (মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে নয় দিনেও ফিল্ডে যাননি)-কে খুঁজে বের করে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক করেছিলেন। 

জিয়া একাত্তরের সবচেয়ে কৃতিত্বপূর্ণ অন্ততঃ ডজন খানেক লড়াই করেছেন। আবার কলকাতায় গিয়ে ১৯৭১ এর জুলাই মাসে সর্বাধিনায়ক জেনারেল  ওসমানীকে তাজউদ্দীন পদত্যাগে  বাধ্য করানো নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছিল তা-ও মেজর জিয়া সেখানে দুইদিন নিজে থেকে তা সমাধান করেন। ১৯৭১ সালে তাজউদ্দীন তাঁর নিজের ক্যাবিনেটকে না জানিয়ে যেই গোপন চুক্তি করেছিলো ১৯৭১ এর নভেম্বর মাসে, জিয়া তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানান। তাজউদ্দীনকে সত্য স্বীকার করতে বলেছিলেন, "স্যার আপনি যদি ব্লাকমেইল বা প্রেসারে এটা করে থাকেন, …খুলে বলতে পারেন ...প্রয়োজনে যেকোনো আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে আমরা এক হাজার বছর লড়াই করবো। এই ছিলো জিয়ার  মনোবলের দৃঢ়তা।

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম ব্রিগেড জেড ফোর্সের অধিনায়ক। ১৯৭১ এ ভারতের মাটিতে সদরদপ্তর করার বিরুদ্ধে মত দিয়েছিলেন আমাদের প্রায় সব সেক্টর কমান্ডার।  জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ এর অগাষ্ট মাসে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের আডমিনিস্ট্রেশন প্রতিষ্ঠা হয় কুড়িগ্রামের রৌমারিতে।

জিয়াউর রহমানকে তাঁর দেশ প্রাপ্য সম্মান দেয়নি। তাঁর দল দিয়েছে কিনা, তা তারাই ভালো বলতে পারবে। কিন্তু এই জগতের রব—সন্মানিত মানুষকে সম্মানিত করেন, ধীরে হলেও করেন।

চার.
১৯৭১ কে দেখার জন্য  কেমন চোখ থাকা চাই: ১৯৭১ সালের পুরো মুক্তিযুদ্ধের সময়কালেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব গভীর শূন্যতায় ছিলো।  ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের যেসকল অফিসার, সৈনিক, ইপিআর অফিসার অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন—তাদের লেন্সেও ‘৭১-কে দেখা উচিত। না দেখলে আমাদের ভুল পথে হাঁটার সম্ভাবনা বেড়ে যায় বহুগুণ। রাজনীতিতে একটা ঘটনার বহুমাত্রিক ব্যবহার হয়। বিস্তৃত কার্যক্রমের জটিল এবং মুল্যবান অংশগুলোর বেশিরভাগ হয় কিন্তু পর্দার আড়ালে।

১৯৭১ সালে রাজনীতিবিদদের যে কাজ ছিলো—সত্য বলা, আওয়ামী লীগ ও জামায়াত দুটি দল‌ই তা করেনি। না করার পেছনে দুই দলের ছিল আলাদা আলাদা কারণ। ভাগ্যিস যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা যোদ্ধারা এই দেশের লোকদের জন্য কিছু লেখা রেখে গেছেন। কিংবদন্তী মুক্তিযোদ্ধা কর্ণেল জিয়াউদ্দিন ‘দ্য হলিডে’ পত্রিকায় ১৯৭২ সালে একটা আর্টিকেল লেখেন, "দ্য হিডেন প্রাইজ"  নামে।

প্রথমে অবশ্য মুজিব এই পত্রিকার লেখাকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা মৃত্যুদণ্ড-যোগ্য শাস্তির কথা বলছিলেন। পরে মুক্তিযুদ্ধের অবদানের কথা বিবেচনা করে মুজিব তাকে লিখিতভাবে ক্ষমা  চাইতে বলেন। কর্ণেল জিয়াউদ্দিন জানিয়েছিলেন, তিনি কিছুই তো মিথ্যা লেখেননি। তাই ক্ষমা চাইবেন না। তিনি সফিউল্লাহ-র সঙ্গে মুজিবের কাছে আসার আগে রিজাইন করে এসেছিলেন।

লেখাটি খুব মূল্যবান এবং এর শেষ অংশে খুবই মূল্যবান একটা কথা লিখেছিলেন ‘দেশ রসাতলে যাচ্ছে’। এখন একতার দরকার। দরকার মর্যাদা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার। এই মর্যাদা আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম ২৬ মার্চ। 

'গোপন চুক্তির' মধ্যে হারিয়ে গেছে আমাদের মর্যাদা। যারা এটা (এই চুক্তি) সই করেছে, তাদের এই মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে হবে। এই অর্জন জনগণের প্রাপ্য। এই চুক্তির ব্যাপারটা যারা জানে, জনগণের কাছে তাদের এই বেইমানির কথা বলতে হবে। যদি তারা এটা স্বীকার না করে, তাহলে তারা হবে জনগণের শত্রু। জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের এটা চাওয়ার অধিকার আছে। ...আমরা তাঁকে (মুজিব) ছাড়াই যুদ্ধ করেছি এবং জিতেছি। যদি আবার দরকার পড়ে, আবার যুদ্ধ করব। কেউ আমাদের হারাতে পারবে না। আমরা ধ্বংস হতে পারি, কিন্তু পরাজিত হব না। কর্ণেল মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন (বীর উত্তম) ~হিডেন প্রাইজ/হলিডে (২০ অগাস্ট/১৯৭২)।

শুধু শেখ হাসিনা না, ভারত ১৯৭১ সালের জুলাই মাস থেকেই মেজর জিয়া যে স্টেটসেন্ট্রিক জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক তা তারা জানতো। বাংলাদেশকে তাবেদার রাষ্ট্র বানানোর চেষ্টা সম্পর্কে এবং ভারতের প্রতি আমাদের ইস্টবেঙ্গল, ইপিআর এর সামরিক অফিসারদের ধারণা ইত্যাদি সব প্রমাণ তাদের লেখনিতেই আছে। এসব বিষয় ভারত আমাদের জানাতে চায়না। এইসব পরিকল্পনা ১৯৭১ থেকেই তারা পরিকল্পিতভাবে করে আসছে।

মেজর শরিফুল হক ডালিম,  মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে কম বয়স্ক বীর উত্তম,  তিনি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে  এসে যুদ্ধে অংশ নেন। আমাদের সেক্টর কমান্ডার বা সামরিক বাহিনীর সাথে তাদের দূরত্ব তৈরির প্রেক্ষিত কী! কেন বদরুদ্দীন উমরের মতো প্রাজ্ঞ মানুষ বলেন, ১৯৭১ এর লিখিত ইতিহাস মিথ্যা, যা ভারতের তৈরি এবং বাংলাদেশকে গেলাতে চায়। যা আওয়ামী পন্থীরা গিলে বাংলাদেশের মানুষের কাছে বেঈমান হয়ে গেছে, কর্ণেল জিয়াউদ্দিন বীর উত্তম তার লেখায় ঠিক এভাবেই তো বলেছিলেন।

ক্যাপ্টেন ডালিম, মেজর মতিউর, ক্যাপ্টেন নূর প্রথম পালিয়ে আফগান, কাশ্মীর হয়ে বহু কষ্টে দিল্লি পর্যন্ত এসে নানান হেনস্তার স্বীকার হয়েছিলেন ভারতীয় ইন্টিলিজেন্স দ্বারা। এই লেখার অংশ সেই সময়ের, অর্থাৎ জুলাই ১৯৭১ এর।

মেজর শরিফুল হক ডালিম বীর উত্তম তাঁর "যা দেখেছি, যা বুঝেছি, যা করেছি" বইতে বিস্তারিত লিখেছেন, "কয়েক দিনের মধ্যেই বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ এবং সামরিক বাহিনীর প্রধান কর্ণেল এম এ জি ওসমানী আসেন। তাজউদ্দীন তাঁদের বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, তাঁদের আরও দুই সপ্তাহ দিল্লিতে থাকতে হবে। এই সময়ে ভারতীয় কয়েকটি সংস্থা তাঁদের মুক্তিযুদ্ধ সম্বন্ধে ধারণা দেবে এবং তাঁদের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হবে। এটা শুনে তাঁদের মনে হলো, এটা একটা ষড়যন্ত্র এবং বাংলাদেশ সরকার চলছে ভারতের নির্দেশে, ভারত এই মুক্তিযুদ্ধ সম্বন্ধে তার নিজস্ব ধারণা তাঁদের গেলাতে চায় এবং বাংলাদেশকে একটা তাঁবেদার রাষ্ট্র বানাতে চায়।'

তখন থেকে পরবর্তী সময়ে ভারতের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কৃত্রিম ধারণা আগ্রহের সাথে ‘গিলেছে’ আওয়ামী লীগ, সিপিবি, জাতীয় পার্টি, সহ বেশিরভাগ বাম ও কালচারাল সংগঠন। 

পাঁচ.
১৯৭১ নিয়ে রাজনৈতিক দায়: ইতিহাসের কাঠগড়ায় জামায়াত ও আওয়ামী লীগ 

মুক্তিযুদ্ধের সময়ের রাজনৈতিক দল কেন ও কিভাবে মিথ্যা বলেছেন সেটা জিয়াউদ্দীন আর ডালিম - এই দুই বীর উত্তমের বইয়ে পরিষ্কার করে লেখা হয়েছে।  আওয়ালীগের লোকজন দেশে বা দেশের বাইরে কলকাতার থিয়েটার রোড ঘুরে এসে ভারতের গেলানো সেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটাই বলবে—এটাই স্বাভাবিক।

আরও একটা কারণ আছে—ভারত আর আওয়ামী লীগের একই ধরণের মিথ্যা প্রপাগান্ডার ব্যবসা করার। উভয়েই জানে মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী বা শেখ মুজিবের এক জাররাও অবদান নাই। ১৯৭১ এ রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ ভারতের আজ্ঞাবহ আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে আনার জন্য মুক্তিযুদ্ধের নকল পোষাক পরতে হয়। আওয়ামী লীগে আছে দুই ধরণের মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের বইগুলোতে এমনই ক্যাটাগরি। এক, হাজি মুক্তিযোদ্ধা (যারা কলকাতায় হিজরত করছিলো, যুদ্ধ না করে, ভয়ে পালায় গেছিলো) এরাই দেশে ফিরে মুজিব আমলে ধান্দা করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছিল। আরেক গ্রুপ হলো সিক্সটিন্থ ডিভিশন—যারা ১৬ ডিসেম্বরের পরে মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে। খুব অল্প হলেও আরেকটি শ্রেণি আছে, যারা দালাল গোছের। যদিও তাদের আওয়ামী লীগ মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করে, তবে তারা আসলে ভারতের নির্লজ্জ দালাল শ্রেণির।

জিয়াউর রহমানকে নানাভাবে ছোট করার চেষ্টা হয়েছে। তাঁর কবর নিয়ে, তাঁর খেতাব নিয়ে, এমনকি পাকিস্তানের সিএমএইচ-এ বাচ্চা প্রসব করানো নিয়েও বাজে মন্তব্য করা হয়েছে। হাসিনা এই বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানকে রাজাকার বলেছিল। ভাতা নেওয়া আওয়ামী দালালরা প্রতিবাদ করেনি, করেনি কারণ তারা নিজেরাই মুক্তযোদ্ধা না এবং সম্ভবত তারা রাজাকার‌ই ছিলো।

পাশাপাশি এই সময়ের আরেকটা দল জামায়াতে ইসলামীর একাত্তরে ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ,  যেই প্রশ্ন আর সন্দেহ থেকে তারা এখনও মুক্ত হতে পারেনি। বাংলাদেশের মানুষকে সত্য ইতিহাস না বলে প্রতারণার যে রাজনীতি করেছে, '৭১ সালের রাজনৈতিক ও নৈতিক ঘটনা ছেড়ে দিলেও তো তারা ইতিহাসের  দায় থেকে মুক্ত হতে পারবে না। জামায়াতে ইসলামী সব সময় রাজনীতি করেছে আলো-অন্ধকারে, ধোঁয়াশা বা কুয়াশায়।

শেষ কথা.
অবশ্য দুনিয়ায় কে কাকে কি সম্মান দিতে পারে এই নশ্বর দুনিয়ায়। এতে কিছুই যায় আসে না। বাংলাদেশে বিভাজনের রাজনীতির বিয়োগান্ত শিকার হয়েছেন যে কয়েকজন, জিয়াউর রহমান তাঁদের একজন। সামরিক অফিসার হিসাবে জেনারেল জিয়া তার বক্তব্য ও ব্যবহারে  সকল দেশপ্রেমিক বাংলাদেশ-পন্থী রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কে ইতিবাচক কথা বলতেন। 

কিন্তু বাংলাদেশের নষ্ট রাজনীতিতে জিয়ার রাজনৈতিক  প্রতিপক্ষ তাঁকে তাঁর প্রাপ্য  সম্মান দেয়নি। 'আমরা বীরের সম্মান দিতে জানি না। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে বাংলাদেশের একজন মাত্র মুক্তিযোদ্ধার ছবি আছে, বুকের ওপর দু-হাত আড়াআড়ি করে দাঁড়ানো।' (সেক্টর কমান্ডাররা বলছেন: মুক্তিযুদ্ধের স্মরণীয় ঘটনা, মওলা ব্রাদার্স) 

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরে ওয়াশিংটন পোষ্টের একটা রিপোর্টের ঘটনা প্রণিধানযোগ্য। উইলিয়াম ব্র্যানিগিন, ওয়াশিংটন পোস্ট (৩জুন, ১৯৮১) এ "Bangladeshi Villagers Despair at Loss of President"-নামক আর্টিকেলে একজন গ্রামের সাধারণ বৃদ্ধের মন্তব্য দিয়ে তার রিপোর্ট শেষ করছেন। সেই বৃদ্ধের মন্তব্যের ঐতিহাসিক সম্পর্ক দেখতে পারবো, মিলাতে পারবো আমরা, আর বুঝবো কেন জিয়া বাংলাদেশে আজও এতো জনপ্রিয় এবং বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে যুগে যুগে অনুভব করবে।

উইলিয়াম ব্র্যানিগিন লিখছেন, "...৮৫ বছর বয়সী শাহাজাদ আলী, গ্রাম প্রবেশপথের বাজারের স্টলে বসে বললেন, “আমরা বিশ্বের গরিব ও দুস্থ মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলাম। কিন্তু জিয়ার কারণে আমাদের মর্যাদা বেড়েছে। ভাগ্য ভালো হলে আমরা তাঁর মতো আর একজন পাব। ভাগ্য খারাপ হলে, অনেক কষ্ট ভোগ করব।”

এই যে প্রান্তিক মানুষ হিসেবেও একজন বাংলাদেশীর মর্যাদাবোধ, নাগরিক হিসেবে সম্মান, এটার কথাই কর্ণেল জিয়াউদ্দিন ১৯৭২ সালে তার 'হিডেন প্রাইজে', লিখেছিলেন। "দেশ রসাতলে যাচ্ছে। এখন একতার দরকার। দরকার মর্যাদা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার। এই মর্যাদা আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম ২৬ মার্চ। গোপন চুক্তির' মধ্যে হারিয়ে গেছে আমাদের মর্যাদা।"

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সবচেয়ে উত্তাল ও রক্তাক্ত সময়ে দেশের দায়িত্ব নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাঁর অর্জন নিয়ে বাংলাদেশে কম আলোচনা হলেও, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অনেক বিশেষজ্ঞ এবং রাষ্ট্রপ্রধান যথাযোগ্য মূল্যায়ন করেছেন। আমাদের বিবেচনায় জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ত্ব,  বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে মর্যাদাবোধ ও দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে দেশের মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলেছিলেন। আজকের বাংলাদেশ দেখে, অনুভব করে, বুঝে গ্রামের সেই মুরব্বির কথা কতটা সত্য! ১৯৭১ এর পরে প্রায় ৫৪ বছর পার হয়ে এসেও একজন 'জিয়ার মতো' নেতার অভাবে বাংলাদেশ স্থির হতে পারেনি, শান্ত হয়ে শান্তি ও উন্নয়নের পথে যেতে পারেনি।

নিকট ভবিষ্যতে জিয়ার মতো তেমন‌ই একজন মহৎপ্রাণ, দূরদর্শী, দেশপ্রেমিক নেতার আবির্ভাব ঘটবে যিনি দেশ এবং দেশের মানুষকে অসাধারণ এক উচ্চতায় পৌঁছে দিবেন—এমন মোনাজাত‌ই এখন জারি রয়েছে সমাজের সকল অংশে।

লেখকদ্বয় : উপাচার্য এবং ট্রেজারার, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাইরেক্টর, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন

ট্যাগ: মতামত
জাইমা রহমান চেলসির নারী দলে গোলকিপার হিসেবে সুযোগ পেয়েছিলেন
  • ২২ মার্চ ২০২৬
‘ঈদের নতুন জামা লুকিয়ে রাখতাম’
  • ২২ মার্চ ২০২৬
হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি ইরানের
  • ২২ মার্চ ২০২৬
ব্যক্তিগত জীবন বাদ দিয়ে হলেও শিক্ষায় মনোনিবেশ করতে হবে আমাক…
  • ২২ মার্চ ২০২৬
বিরক্ত হয়ে অনেকে সাংবাদিক পরিচয় দিতে লজ্জা পান: তথ্যমন্ত্রী
  • ২২ মার্চ ২০২৬
ঢাবিতে ছাত্রলীগের বিক্ষোভ, ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে আলটিমেটাম
  • ২২ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence