ফলাফল নয়, নিজের মনোবলই নির্ধারণ করে তুমি কত দূর যেতে পারবে

২১ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:২৮ PM
এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন

এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন © টিডিসি সম্পাদিত

কয়েকদিন আগে আমাদের ছোট ভাইবোনদের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। কারও জীবনে এসেছে আনন্দ আর উচ্ছ্বাস, আবার কেউ ডুবে আছে হতাশা আর অনিশ্চয়তায়। একই ফলাফলভিত্তিক সমাজে, যেখানে নম্বরই সবকিছু নির্ধারণ করে, সেখানে অনেক তরুণের মন আজ দোটানায় ভরা। কেউ আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, কেউ বা ভাবছে “আমি কি ব্যর্থ?”

ফল প্রকাশের পর এই সময়টা শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থার জন্য খুব সংবেদনশীল। পরীক্ষার চাপ শেষ হলেও শুরু হয় অন্য এক চাপ সমাজ, পরিবার আর নিজের প্রত্যাশা পূরণের দায়। অনেকেই ভাবে, ফলাফলই জীবনের সবকিছু। বাস্তবে বিষয়টা এত সরল নয়। প্রতিটি মানুষ আলাদা, সবার যাত্রাপথও ভিন্ন। কিন্তু আমাদের সমাজে এই বৈচিত্র্যটা বোঝার জায়গাটা এখনও তৈরি হয়নি।

যাদের ফল ভালো হয়েছে, তাদের জীবন এখন নতুন পরিকল্পনা, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ ভাবনায় ভরপুর। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা, নতুন শহরে পড়াশোনা সবকিছুই এক ধরনের উত্তেজনা ও আশার এক মহা আয়োজন। কিন্তু যাদের ফল প্রত্যাশামতো হয়নি, তারা অনেক সময় নিজেকে একাকী ও ডিপ্রেশনে দিন যাচ্ছে। বন্ধু বা আত্মীয়ের তুলনায় পিছিয়ে পড়া তাদের আত্মমর্যাদাকে নীচে নামিয়ে দেয়। অনেক সময় তারা নিজের যোগ্যতা নিয়েই সন্দেহ করতে শুরু করে।

এখানেই পরিবার আর সমাজের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলাফল খারাপ মানেই ব্যর্থতা নয়, কিন্তু এই সাধারণ কথাটিই অনেক সময় ভুলে যাই আমরা। অভিভাবকরা সন্তানকে দোষারোপ না করে পাশে থাকলে, তাকে বোঝালে, তার মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়। “তুমি পারবে” এই তিনটি শব্দই কখনও কখনও সবচেয়ে কার্যকর ওষুধ হতে পারে। পাড়া প্রতিবেশী যারা আছি দয়া কটুকথা বলবে না, কারণ এতে তাদের মনোবল নষ্ট হয়ে যায়। 

এই সময়ের মানসিক চাপ অনেক কিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত। শিক্ষার্থীরা একদিকে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগে, অন্যদিকে সামাজিক তুলনা তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় “আমি এই ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম” টাইপ পোস্টগুলো অনেক সময় অন্যদের মনে অজান্তেই হীনমন্যতা সৃষ্টি করে। অথচ সবাই জানে না, সাফল্য মানে শুধু ভালো ফল নয়; বরং দীর্ঘ সময়ের ধৈর্য, অধ্যবসায় আর নিজের পথ ধরে এগিয়ে যাওয়ার সাহসই প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠি।

যাদের ফল প্রত্যাশামতো হয়নি, তাদের জন্য এখন সবচেয়ে দরকার নিজের ওপর আস্থা রাখা। একটা পরীক্ষার ফল জীবনের গল্প শেষ করে দেয় না। বরং এখান থেকেই শুরু হয় নতুন অধ্যায়। হয়তো তোমার পথটা অন্যরকম, কিন্তু সেটাও হতে পারে সঠিক পথ। পৃথিবীতে অসংখ্য সফল মানুষ আছেন, যারা ছাত্রজীবনে মাঝারি ফল করেছিলেন। কিন্তু তারা নিজেদের থামতে দেননি, নিজেদের পথ নিজেরাই বানিয়েছেন।

শিক্ষার্থীদেরও বুঝতে হবে, এই সময়টা শুধু পড়াশোনার নয়, মানসিকভাবে পরিণত হওয়ারও সময়। যত বেশি চাপে পড়বে, তত বেশি দরকার ইতিবাচক মনোভাব। নিজের পছন্দের কাজে মনোযোগ দেওয়া, নিয়মিত রুটিন মেনে চলা, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলা এই ছোট বিষয়গুলোই মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

অভিভাবকদেরও উচিত সন্তানকে শুধুমাত্র নম্বর দিয়ে বিচার না করা। একটা খারাপ ফলাফল কখনও একজন মানুষের সম্পূর্ণ চিত্র নয়। হয়তো সে ভালো লেখে, ভালো আঁকে, সংগীতে দক্ষ, কিংবা মানুষের সঙ্গে ভালোভাবে মিশতে পারে এই গুণগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এই দিকগুলোতে উৎসাহ দেওয়া হয় না, অথচ এগুলোই ভবিষ্যতের সমাজ গঠনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

সবশেষে, এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল জীবনযাত্রার একটি ধাপ মাত্র। কেউ হয়তো এখনো নিজের জায়গা খুঁজে পায়নি, কিন্তু সময়ই তাকে ঠিক জায়গায় নিয়ে যাবে যদি সে নিজের প্রতি সৎ থাকে। জীবন একদিনের নয়; এটি এক দীর্ঘ পথচলা, যেখানে সাফল্য আর ব্যর্থতা দুটোই দরকার হয় পরিপূর্ণ মানুষ হতে।

তাই যারা আজ খারাপ ফল দেখে মন খারাপ করে বসে আছে, তাদের বলি—হাল ছাড়ো না। আজ যে ব্যর্থ মনে হচ্ছে, কাল সে-ই হয়তো অন্যভাবে জিতে যাবে। মনে রেখো, ফলাফল নয়, তোমার মনোবলই নির্ধারণ করে তুমি কত দূর যেতে পারবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ
ইমেইল: [email protected]

ট্যাগ: মতামত
বেরোবিতে আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে হামলার অভিযোগে নিন্দা ছাত্রশ…
  • ০৪ আগস্ট ২০২৬
স্ত্রীর কাছে ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবির অভিযোগে স্কুলশিক্ষক গ্…
  • ০৪ আগস্ট ২০২৬
জামায়াত আমিরের নেতৃত্বে ১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক, ৫-৬ আগস্ট নতুন…
  • ০৪ আগস্ট ২০২৬
কলাবাগানে মা-মেয়েকে ছুরিকাঘাতে হত্যা, জামাতার দোষ স্বীকার
  • ০৩ আগস্ট ২০২৬
৫ আগস্ট সরকারি ছুটি, কারা পাবেন— কারা পাবেন না
  • ০৩ আগস্ট ২০২৬
সমকামিতার বিরুদ্ধে ঢাবিতে ছাত্রদল নেতা মাছুম বিল্লাহর নেতৃত…
  • ০৩ আগস্ট ২০২৬